kalerkantho


মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে করণীয়

রিয়াজুল হক

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মানি লন্ডারিং আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় অপরাধ। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম অন্তরায়।

আমাদের দেশে মানি লন্ডারিংয়ের প্রকৃত পরিমাণ কত, সে হিসাব কারো কাছে নেই। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘মানি লন্ডারিং’ অর্থ (অ) নিম্নবর্ণিত উদ্দেশ্যে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত সম্পত্তি জ্ঞাতসারে স্থানান্তর বা রূপান্তর বা হস্তান্তর : ১. অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ প্রকৃতি, উৎস, অবস্থান, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ গোপন বা ছদ্মাবৃত্ত করা; অথবা ২. সম্পৃক্ত অপরাধ (দুর্নীতি ও ঘুষ, মুদ্রা জালকরণ, দলিল-দস্তাবেজ জালকরণ, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, জালিয়াতি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা, অবৈধ মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবসা, চোরাই ও অন্যান্য দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা, অপহরণ, অবৈধভাবে আটকে রাখা ও পণবন্দি করা, খুন, মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি, নারী ও শিশু পাচার, চোরাকারবার, দেশি ও বিদেশি মুদ্রা পাচার, চুরি বা ডাকাতি বা দস্যুতা বা জলদস্যুতা বা বিমানদস্যুতা, যৌতুক, চোরাচালানি ও শুল্কসংক্রান্ত অপরাধ, করসংক্রান্ত অপরাধ, মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থ জোগান, ভেজাল বা স্বত্ব লঙ্ঘন করে পণ্য উত্পাদন, পরিবেশগত অপরাধ, সংঘবদ্ধ অপরাধ বা সংঘবদ্ধ অপরাধী দলে অংশগ্রহণ, ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায় এবং বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কর্তৃক সরকারের অনুমোদনক্রমে গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষিত অন্য যেকোনো সম্পৃক্ত অপরাধ) সংগঠনে জড়িত কোনো ব্যক্তিকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে সহায়তা করা; (আ) বৈধ বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বা সম্পত্তি নিয়মবহির্ভূতভাবে বিদেশে পাচার করা; (ই) জ্ঞাতসারে অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করার উদ্দেশ্যে তা হস্তান্তর, বিদেশে প্রেরণ বা বিদেশ থেকে বাংলাদেশে প্রেরণ বা আনা; (ঈ) কোনো আর্থিক লেনদেন এভাবে সম্পন্ন করা বা সম্পন্ন করার চেষ্টা করা, যাতে এই আইনের অধীনে তা রিপোর্ট করার প্রয়োজন হবে না; (উ) সম্পৃক্ত অপরাধ সংঘটনে প্ররোচিত করা বা সহায়তা করার অভিপ্রায়ে কোনো বৈধ বা অবৈধ সম্পত্তির রূপান্তর বা স্থানান্তর বা হস্তান্তর করা; (ঊ) সম্পৃক্ত অপরাধ থেকে অর্জিত জানা সত্ত্বেও এ ধরনের সম্পত্তি গ্রহণ, দখলে নেওয়া বা ভোগ করা; (ঋ) এ ধরনের কোনো কাজ করা, যার দ্বারা অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করা হয়; (এ) ওপরে বর্ণিত যেকোনো অপরাধ সংঘটনে অংশগ্রহণ, সম্পৃক্ত থাকা, অপরাধ সংঘটনে ষড়যন্ত্র করা, সংঘটনের চেষ্টা অথবা সহায়তা করা, প্ররোচিত করা বা পরামর্শ প্রদান করা।

বিভিন্ন সূত্রমতে, আমাদের দেশে বৈধ বিদেশি সাড়ে ১৬ হাজার আর অবৈধ ১২ লাখের বেশি। তারা অনুমতি ছাড়াই বছরের পর বছর বাংলাদেশে অবস্থান করছে। অপরাধে জড়ানোর পাশাপাশি তারা অবৈধভাবে আয় করে সে অর্থ পাঠাচ্ছে স্বদেশে। ফাঁকি দিচ্ছে কর (২৮-০২-২০১৬, দৈনিক ইনকিলাব)। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) দেওয়া তথ্যমতে, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল এক দশকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে; যার পরিমাণ ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এর আগের বছর পাচার হয় ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে অবৈধ অর্থপ্রবাহ বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। এ ছাড়া ২০০৮ ও ২০০৯ সালেও অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে। ওই দুই বছরে পাচার হয় যথাক্রমে ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ও ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার (১১-১২-২০১৫, দৈনিক জনকণ্ঠ)। দুদকের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, গড়ে প্রতিবছর অর্থপাচার হয়েছে প্রায় ৫৮৯ কোটি মার্কিন ডলার। এর একটি অংশ সুইজারল্যান্ডে জমা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এ ধরনের অর্থপাচার দুর্নীতিকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। ফলে এর প্রতিরোধ জরুরি হয়ে পড়েছে।

দেশের উন্নয়নের গতিধারা ধরে রাখার জন্য মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ প্রয়োজন। সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ এর মধ্যেই নিয়েছে। যে কারণে মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাস ও জঙ্গি অর্থায়ন প্রতিরোধে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় যাওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এপিজির বার্ষিক সম্মেলনের তৃতীয় পর্বের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৪১টি দেশ এপিজির সদস্য। এপিজি প্রতিনিধিদল সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধবিষয়ক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করে থাকে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত ১১টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশ উন্নতি করেছে। শুধু তা-ই নয়, মুদ্রাপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশ নরওয়ের চেয়ে ভালো অবস্থানে। এটা অবশ্যই ভালো খবর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক উন্নত দেশের চেয়েও ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। এতে সন্ত্রাস, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, জঙ্গিবাদ, মুদ্রাপাচারসহ অন্য অপরাধ নির্মূলে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০১২ সালের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু তাদের মধ্যে কাজ পায় মাত্র সাত লাখ মানুষ। এই যখন বাংলাদেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থানের চিত্র, তখন বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে কাজ করে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করছে বিদেশি অবৈধ বসবাসকারীরা। এ ছাড়া সব সম্পৃক্ত অপরাধ দূর করতে হবে। সময় এখন সঠিক পদক্ষেপের। আমাদের এই ছোট ও জনবহুল দেশের টাকা যেন কোনোভাবেই বিদেশে পাচার না হতে পারে ও সম্পৃক্ত অপরাধ ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ।

মানি লন্ডারিং অপরাধ ও দণ্ড সম্পর্কে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বলা হয়েছে, “১. এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, মানি লন্ডারিং একটি অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে; ২. কোনো ব্যক্তি মানি লন্ডারিং অপরাধ করিলে বা মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে তিনি অন্যূন ৪ (চার) বৎসর এবং অনধিক ১২ (বার) বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ বা ১০ (দশ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত, যাহা অধিক, অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন [তবে শর্ত থাকে যে আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত সময়সীমার মধ্যে অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হইলে আদালত অপরিশোধিত অর্থদণ্ডের পরিমাণ বিবেচনায় অতিরিক্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবেন। ]; ৩. আদালত কোনো অর্থদণ্ড বা দণ্ডের অতিরিক্ত হিসাবে দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবেন, যাহা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানি লন্ডারিং বা কোনো সম্পৃক্ত অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা সংশ্লিষ্ট; ৪. কোনো সত্তা এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করিলে বা অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে ধারা ২৭-এর বিধান সাপেক্ষে, উপধারা (২)-এর বিধান অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে এবং অপরাধের সহিত সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির মূল্যের অন্যূন দ্বিগুণ অথবা ২০ (বিশ) লক্ষ টাকা, যাহা অধিক হয়, অর্থদণ্ড প্রদান করা যাইবে এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিলযোগ্য হইবে। তবে শর্ত থাকে যে উক্ত সত্তা আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত সময়সীমার মধ্যে অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হইলে আদালত অপরিশোধিত অর্থদণ্ডের পরিমাণ বিবেচনায় সত্তার মালিক, চেয়ারম্যান বা পরিচালক যে নামেই অভিহিত করা হউক না কেন, তাহার বিরুদ্ধে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবেন। ]; ৫. সম্পৃক্ত অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হওয়া মানি লন্ডারিংয়ের কারণে অভিযুক্ত বা দণ্ড প্রদানের পূর্বশর্ত হইবে না। ”

অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি সব বাধা অতিক্রম করে দেশ একের পর এক সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করায় অনেকের কাছে অনুকরণীয় দেশ এখন বাংলাদেশ। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে সরকারের সাফল্য সবার জন্য ঈর্ষণীয়। উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এখন অন্যতম লক্ষ্য। আর এ জন্যই প্রয়োজন দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ করা। কারণ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের মধ্যেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রবৃদ্ধি নিহিত রয়েছে।

লেখক : উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

riazul.haque02@gmail.com


মন্তব্য