kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পরিবহন খাতের সাম্প্রতিক দৃশ্যপট

এ এম এম শওকত আলী

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পরিবহন খাতের সাম্প্রতিক দৃশ্যপট

পৃথিবীর সব দেশেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহত হওয়ার বিষয়টি সবাই জানে। তবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে এ ধরনের দুর্ঘটনার মাত্রা সব দেশকে হারিয়ে দিয়েছে।

এসব ঘটনা নিয়ে মিডিয়ায় সব সময়ই ক্ষমতাসীন সরকার ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের প্রতি প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি করা হলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং অনেকের মতে, অবনতির দিকে যাচ্ছে। ঈদের সময় অধিকসংখ্যক শহরে, বিশেষ করে রাজধানীতে বসবাসকারী জনমানুষ সপরিবারে দেশের বাড়িতে এ উৎসব উদ্যাপন করতে যায়। এ সংস্কৃতি বহুদিনের। ১৯৪৭-এর আগে এ চিত্র কিছুটা অন্য রকম ছিল। শোনা যায়, দুর্গাপূজার সময়ই শহরের ধনী ব্যক্তিরা দেশের বাড়িতে আনন্দঘন পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য গ্রামের বাড়ি যেতে অভ্যস্ত ছিলেন। এখন পূজার ছুটির সময় কী হয়, তা অনেকটাই অজানা। এ সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তা হলো, এখন রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে পূজামণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা একটা কারণ হতে পারে। অন্য কারণও রয়েছে। ঈদের সময় ছুটি কাটাতে সব শ্রেণিপেশার মানুষই গ্রামের বাড়িতে যায়। দিনমজুর থেকে শুরু করে চাকরিজীবীরা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও যান। অপেক্ষাকৃত ধনী ব্যক্তিরা কক্সবাজারসহ অন্যান্য পর্যটন অথবা বিনোদনকেন্দ্রেও যান। যাঁরা অধিকতর বিত্তবান, তাঁদের অনেকেই বিদেশে গিয়ে ছুটি উপভোগ করেন। তাঁদের সংখ্যা খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। তবে এসব কারণে পরিবহন খাতে চাপ থাকে অত্যধিক। ট্রেনসহ, স্টিমার ও লঞ্চ এবং সর্বাধিক চাপ থাকে সড়ক পরিবহনের ওপর। এ ছাড়া সদ্য সমাপ্ত ঈদের ছুটি আগের ঈদের তুলনায় বেশি হওয়ায় এ চাপ বেড়েছে।

তবে সার্বিকভাবে অতীতের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, চাপ সব সময়ই বেশি থাকে। এবার হয়তো কিছু বেশি। ঈদের সময় ঘরমুখো জনস্রোতের চাপ সড়ক পরিবহনেই বেশি থাকে। তবে নদীপথসহ রেলপথেও যাত্রীর সংখ্যা কম নয়। আকাশপথের যাত্রীর সংখ্যা খুব একটা দৃশ্যমান নয়। তবে শোনা যায়, বিদেশ ভ্রমণে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের টিকিট পেতে অসুবিধা হয়। ঈদের ছুটির কিছু আগে থেকেই যে চিত্র দৃশ্যমান হয় তা হলো, ঘরমুখো যাত্রীর আগাম টিকিট ক্রয়ের ভিড়। অনেক বিড়ম্বনার চিত্রও গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়। শুরু হয় যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। অন্যান্য ঈদের মতো এবারের ঈদের আগ পর্যন্ত এ দৃশ্য অনেকটা বিরামহীন ছিল। এর সুরাহা কোনো বছরই হয়নি। ভবিষ্যতে হবে কি না বলা মুশকিল। অন্যান্য ঈদের অনুরূপ এবারের ঈদেও যে তথ্যটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল তা হলো, সড়ক দুর্ঘনায় যাত্রীসহ পথচারীদের মৃত্যুর আধিক্য। এ নিয়ে একাধিক পত্রিকায় খবরসহ সম্পাদকীয় প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয় যে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার অত্যধিক—প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে ৮৫ দশমিক ৫। উন্নত দেশে এ হার প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে মাত্র তিন। বিভিন্ন সূত্রের সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত তথ্যের গরমিলও রয়েছে। পুলিশের মতে, এ সংখ্যা তিন থেকে চার হাজার। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এ সংখ্যা ২০ থেকে ২১ হাজারের বেশি। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সংস্থার মতে, ২০১৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আট হাজার ৬৪২ জন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের সংখ্যা এত কম হওয়ার মূল কারণ, এ সংখ্যার ভিত্তি সব থানা থেকেই পাওয়া তথ্য। এটাই স্বাভাবিক যে থানায় সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কে যে তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, সে সংখ্যাই থানার পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠিয়েছে।

অতীতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যে গবেষণা করেছে, সে প্রতিবেদনেও সংখ্যা পুলিশের তুলনায় অনেক বেশি। এ ছাড়া প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয় যে দুর্ঘটনার সংখ্যা সহনীয় মাত্রায় হ্রাস করে জিডিপির প্রবৃদ্ধি উচ্চহারে অর্জন সম্ভব। এ প্রতিবেদনের সুপারিশ সরকারি নীতিনির্ধারকরা আমলে নিয়েছেন কি না জানা নেই। বেসরকারি মহলের সংস্থার মধ্যে যাত্রীকল্যাণ সমিতি ছাড়াও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামে একটি সংস্থা দুর্ঘটনা রোধে প্রতিবছর প্রতিবাদ জানালেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বিষয়টি কি এত জটিল যে এর কোনো সমাধান হবে না। তবে ক্ষমতাসীন সরকার যে একেবারেই কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, সে কথা বলা যাবে না। সৃষ্টি করা হয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ জনপথ দুটি চার লেনে উন্নীত করা হয়। এ সত্ত্বেও এসব জনপথে যানজট হ্রাস পায়নি। সড়ক দুর্ঘটনাও হচ্ছে। চার লেন করার পরও অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ার কারণ অনেকে বলেছেন—সেতুগুলো এখনো দুই লেনের। ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের বড় বাধা উত্তরা থেকে অন্তত গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট। ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কেও একই অবস্থা। টাঙ্গাইল না পৌঁছা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়া যায় না। এবারের ঈদের সময় এসব সড়কে দীর্ঘ ১৬ থেকে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত যানজট ছিল। ঈদের সময় সড়কপথের যাত্রীদের অন্য বিড়ম্বনা হলো ফেরি পারাপার।

এ বছরের ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুসহ আহতদের সংখ্যা অতীতের তুলনায় বেশি। সেপ্টেম্বর ১৩ থেকে অন্তত ৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৭৮ জন। পত্রিকান্তরে আরো জানা যায় যে এ বছর ঈদের ছুটির তিন দিনে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩১ এবং আহতের সংখ্যা ৭৪ জন। গত বছরের একই সময় মৃত্যু হয় ৩০ এবং আহতের সংখ্যা ছিল ৫৪। ২০১৪ সালে ঈদুল আজহার ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় অন্তত ২৬ জনের। আরো জানা যায় যে ২০১৩ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ১০ জন। ২০১২ সালে ৪০ জন এবং ২০১১ সালে ৪৬ জন নিহত হয়। এসব পরিসংখ্যানের সূত্র মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর। সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে সংশ্লিষ্ট পত্রিকায় বলা হয় যে এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় সেতু ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর মন্তব্য ছিল তাত্পর্যপূর্ণ। তিনি অকপটে দায় স্বীকার করে বলেছেন, ‘পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার সক্ষমতার দাবি আমি করি না। মন্ত্রী হিসেবে এ দায়িত্ব আমি এড়াতে পারি না। এসব দুর্ঘটনা বেপরোয়া গতিতে যান চালানোর জন্যই হয়েছে। ’ তিনি আরো বলেন যে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় চলাচলের বিষয়ে আইন মানানো যায়। তবে রাজনীতিবিদসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইন মানতে বাধ্য করা কঠিন। বলা যায় যে তিনি বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এ কথা বলেছেন। তিনি এ বিষয়ে কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর মন্তব্য থেকে জানা যায় যে বেপরোয়া গাড়ি চালানোই সড়ক দুর্ঘটনার একমাত্র কারণ নয়। ইতিমধ্যে জনপথের ১৪২টি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। স্মরণ করা যায় যে কয়েক বছর আগে মানিকগঞ্জের এক দুর্ঘটনার পর একই ধরনের উক্তি ওই সময় প্রকাশিত খবরে জানা গিয়েছিল। যদিও সংখ্যা এত বেশি ছিল না।

বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলে সড়ক দুর্ঘটনা অব্যাহত। সারা বছরই এ বাস্তবতা দৃশ্যমান। হাইওয়ে পুলিশ এ বিষয়ে কিছুই করতে পারছে না। অতীতে এদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে তারা সক্ষমতা দেখাতে পারছে না। এরপর শোনা গিয়েছিল, হাইওয়ে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর অন্য একটি প্রধান কারণও সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। কিছু কিছু মালিক এ ক্ষেত্রে প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যে চালক যত বেশি ট্রিপ করতে পারবে, সে বেশি বাড়তি উপার্জনের যোগ্য হবে। মালিকের আয়ও অবশ্যই বাড়বে। ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি ঈদের আগে ও পরের যে তথ্য দিয়েছে, তা ভয়াবহ। গত ১২ দিনে পরিবহন খাতে ২১০টি দুর্ঘটনার ফলে ২৬৫ জন নিহত হয়েছে। আহতের সংখ্যা এক হাজার ১৫৩ জন।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


মন্তব্য