kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উরি হামলায় দেয়ালে পিঠ পাকিস্তানের

অনলাইন থেকে

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ভারতে উরিতে জঙ্গি হামলার পর আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের দেয়ালে পিঠ ঠেকার মতো দশা হয়েছে। পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করতে ইতিমধ্যে বিল পাস করেছে মার্কিন কংগ্রেস।

উত্তেজনা কোন পর্যায়ে রয়েছে তা বোঝা যায় বিভিন্ন ঘটনায়। জানা যায়, উরি হামলার পর ২০ সেপ্টেম্বর সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। বৈঠকে হাজির ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাও। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে পাওয়ার পয়েন্ট করে বোঝানো হয় ভারত কিভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত করতে পারে। কিভাবে পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে সাময়িকভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে জঙ্গি ঘাঁটি কিংবা পাকিস্তানি সেনার ঘাঁটি, সব বড় পর্দায় বোঝানো হয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে।

জানা যায়, যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারে ভারত এমন আশঙ্কা কাশ্মীরের ওপারে ভালোভাবেই ছিল। ভারতীয় সেনার আক্রমণের আশঙ্কায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা পিআইএ অধিকৃত কাশ্মীরের গিলগিট, স্কার্দু ও চিত্রল এলাকায় সেবা স্থগিত করে দিয়েছিল। ইসলামাবাদ ও পেশোয়ারের মধ্যে জাতীয় মহাসড়কের কিছু অংশও বন্ধ রাখা হয়।

সরাসরি হামলা যদিও চালানো হয়নি, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে তারা ঢুকে জনাবিশেক জঙ্গিকে ঘায়েল করেছে। কংগ্রেসে পাকিস্তানবিরোধী বিল, আত্মবিশ্বাস—সব কিছু মিলিয়ে বল ভারতেরই কোর্টে। তবে বিশেষজ্ঞ মহলের ভাষ্য হচ্ছে, এই সন্ধিক্ষণে প্রতিটা পদক্ষেপ সুচিন্তিত হওয়া কাম্য। তখন কোনো যুদ্ধ ছাড়াই হয়তো কুঠারাঘাত করা যাবে সমস্যার শিকড়ে। বেপরোয়া রক্তপাতে মেতে ওঠা কিছুতেই উচিত হবে না।

জম্মু-কাশ্মীরের উরিতে জঙ্গি হানার পর কূটনৈতিক যুদ্ধে পাকিস্তান হেরেই বসে আছে। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র উরি হামলার কড়া নিন্দা করেছে। রাশিয়া-ফ্রান্স যৌথভাবে পাকিস্তানের অবস্থানকে তুলাধোনা করেছে। পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদে মদদকারীর তকমা দিয়ে সব ধরনের মার্কিন সাহায্য বন্ধের দাবি উঠছে ডেমোক্র্যাট আর রিপাবলিকান দুই দলের পক্ষ থেকেই। প্রস্তাব এনেছেন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা টেড পো। তিনি বলেছেন, ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়া থেকে হক্কানি নেটওয়ার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা—সব কিছুতেই পাকিস্তানের হাত রয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তানের সঠিক অবস্থান ঠিক কী, তা বোঝার জন্য প্রচুর তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। পাকিস্তানকে সাহায্য বন্ধের দাবিও তোলেন প্রভাবশালী এই কংগ্রেস সদস্যরা।

তবে ব্যাকফুটে থেকেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের আক্রমণাত্মক মেজাজটাই ধরে রাখতে চাইছে পাকিস্তান। জাতিসংঘ অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ হিজবুল মুজাহিদীন জঙ্গি বুরহান ওয়ানিকে আরো একবার শহীদ আখ্যা দেন। এরপর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, ‘জঙ্গি বুরহান ওয়ানিকে শহীদ আখ্যা দেওয়ার মাধ্যমেই প্রমাণ করে দিয়েছেন পাকিস্তানের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বুরহান ওয়ানির মতো জঙ্গির প্রশংসা করে পাকিস্তান নিজেদের আসল চেহারাটাই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। ’ জাতিসংঘ সাধারণ সভার অধিবেশনেও পাকিস্তানকে তুলাধোনা করে ভারত। কোনো রকম রাখঢাক ছাড়া জানিয়ে দেয়, পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে। নওয়াজ শরিফের বক্তব্যের জবাব দিতে উঠে জাতিসংঘে ভারতের পার্লামেন্ট মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ইনাম গম্ভীর বলেন, কোনো দেশের নীতি হিসেবে যখন সন্ত্রাসকে ব্যবহার করা হয়, তখন তা যুদ্ধাপরাধের শামিল। বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া কোটি কোটি টাকার অনুদান দিয়ে পাকিস্তান জঙ্গি সংগঠনগুলোকে প্রশিক্ষণ ও সাহায্য দিয়ে চলেছে।

ভারত আরো এক দফা জঙ্গি হামলার শিকার হওয়ায় সেনাবাহিনীর সমালোচনাও কম হচ্ছে না। আনন্দবাজার পত্রিকা সম্পাদকীয়তে লিখেছে, “একের পর এক ভয়ানক জঙ্গি আক্রমণ কিন্তু নেতৃত্বের ভুলেই সেনাবাহিনীর অন্দরস্থলে ঘটিয়া যাইতেছে। পঠানকোটের সেনা ছাউনির উপর হামলাতেও সেই ভুলের সংকেত স্পষ্টভাবে লেখা ছিল, উরির নিশীথকালীন জঙ্গি হানার মধ্যেও তাহা উজ্জ্বল। নতুবা নিয়ন্ত্রণরেখার এত কাছে সেনা ছাউনিতে নিরাপত্তার হাল কিভাবে এত খারাপ হইতে পারে? যে অঞ্চলে সীমান্ত পারাপার করিয়া জঙ্গি অনুপ্রবেশ আজ অন্তত তিন দশকের নিরবচ্ছিন্ন বাস্তব, সেখানে এতখানি অসাবধানতা কেন? উরি সেনা ছাউনির যেদিকে নিয়ন্ত্রণরেখা, তাহার বিপরীত দিক দিয়া নাকি হানা দিয়াছে সন্ত্রাসীরা, কেননা সেদিক দিয়া প্রবেশ ‘সহজ’। তবে কি প্রতিরক্ষার অন্দরেই গুপ্তচর ছিল, যাহারা এই তথ্য জঙ্গিদের কাছে ফাঁস করিয়াছে এবং তাহাদের প্রবেশ সহজ করিয়াছে?”

নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন নিয়েও। কিছুদিন আগে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে উপত্যকায় যাদের হাতে ল্যাপটপ থাকা উচিত, সেখানে অস্ত্র এবং পাথরের টুকরা উঠে এসেছে। এখন বিশ্লেষকরা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য টেনে বলছেন, তরুণ প্রজন্ম যেভাবে এই আন্দোলনে ক্রমে হিংসাত্মক হয়ে উঠেছে—প্রশাসন এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না। কারণ কাশ্মীরের তরুণ প্রজন্মকে যথার্থ উন্নয়নের দিশা দেখানো এবং উন্নয়নযজ্ঞে শামিল করার দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়।

এ মুহূর্তে তাহলে কী করা উচিত ভারতের? এই প্রশ্ন তুলে দেশটির অনেকেই বলছেন, আবেগে ভেসে তুমুল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে না। যুদ্ধেই মুছে যাবে সব সমস্যা এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে, যুদ্ধ হলো অন্তিম বিকল্প। সেই বিকল্প বেছে নেওয়ার আগেও একাধিক শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে ভারতের হাতে। তার অন্যতম হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন। পাকিস্তান যে সন্ত্রাসের কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো পরোক্ষ মদদদাতা তা আজ বিশ্ববাসী জেনে গেছে। তাই এ লড়াইকে সফল পরিণতি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে এই অস্ত্রটির সফল ব্যবহার করতে হবে।

(ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিবন্ধ অবলম্বনে)


মন্তব্য