kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


স্বাধীন রাষ্ট্রে ‘বিজয় শিশুরা’ কেন অবহেলার শিকার

সাব্বির খান

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



যুদ্ধ পৃথিবীর প্রাচীনতম বিবাদের মধ্যে একটি। এতে ক্ষয় হয় ‘সভ্যতা আর মানবতা’।

মানুষ জন্ম নেয়, সেই সঙ্গে অবধারিত হয় তার মৃত্যু। স্বাভাবিক মৃত্যুকে মেনে নেয় সবাই। অস্বাভাবিক মৃত্যু কষ্ট দেয় আজীবন, দগ্ধ করে মনের অচিন গহিনে, নিভৃতে; এটাই রীতি। যুদ্ধের মৃত্যু অথবা ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকা হয় অত্যন্ত অস্বাভাবিক মাত্রার পীড়াদায়ক। যারা যুদ্ধে মারা যান, তাঁরা শহীদ হন। আর যাঁরা যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকেন, তাঁরা হাজারবার ‘শহীদ’ হন প্রতিদিন-প্রতিনিয়ত!

১৯৭১ সালে পাকিস্তান সামরিক জান্তার চাপিয়ে দেওয়া দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশে শহীদ হয়েছিলেন ৩০ লাখ নিরীহ বাঙালি, ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন প্রায় পাঁচ লাখ অসহায় নারী। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছিলেন নিরপরাধ হাজার হাজার শিশু, যাঁরা ‘যুদ্ধশিশু’ নামেই পরিচিত। তাঁদের অনেককে দত্তক হিসেবে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তখন। অনেকে রয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের এখানে-সেখানে। তাঁদের যুদ্ধ আজও থামেনি; জীবনের যুদ্ধ, বেঁচে থাকার যুদ্ধ, একাত্তরের অধিকারের যুদ্ধ!

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একজন বিজ্ঞ প্রসিকিউটর। অত্যন্ত মেধাবী ও তুখোড় প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজের সঙ্গে কথা হচ্ছিল এক সন্ধ্যায়। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার পথ ধরেই বলছিলেন ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিভিন্ন কাজকর্মের কথা যে খুব সহজ নয়, তা আগেই জেনেছিলাম। কিন্তু তা কতটা কঠিন, বোঝা গেল তাঁর সঙ্গে আলাপ করে।

পৃথিবীতে যত যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছে, তার বেশির ভাগ হয়েছে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার খুব কাছাকাছি সময়ে। সে কারণে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধাপরাধের সাক্ষ্য, তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলেও কোনো যুদ্ধশিশুকে আজ অবধি কোনো বিচারের সাক্ষী হতে দেখা যায়নি। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়েছে যুদ্ধের প্রায় ৪০ বছর পরে। সময়ের এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে এই প্রথমবারের মতো প্রসিকিউটর তুরিন চেয়েছিলেন অন্তত একজন যুদ্ধশিশু খুঁজে বের করে তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ করতে। ঠিক এমন সময়েই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের মামলায় বাদীপক্ষের একজন কৌঁসুলি হিসেবে। তুরিন বলেন, সৈয়দ কায়সারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ১৪টি প্রমাণিত অভিযোগের মধ্যে দুজন নারীকে ধর্ষণের ঘটনাও ছিল। তাঁদের একজন মাজেদা এবং তাঁর গর্ভে জন্ম নেওয়া ‘যুদ্ধশিশু’ সামছুন নাহার, যিনি এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। অনেক খোঁজ করে, যোগাযোগ করে, নানাভাবে বুঝিয়ে ব্যারিস্টার তুরিন এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। সেই সঙ্গে প্রথমবারের মতো পৃথিবীও শুনেছিল একজন যুদ্ধশিশুর ভাষ্য!

যুদ্ধাপরাধী কায়সারের মামলায় ক্যামেরা ট্রায়ালের পিনপতন নিস্তব্ধতায় সাক্ষীর মঞ্চে দাঁড়ানো ৪২ বছর বয়সী এক সামছুন নাহার। সংকুচিত, মলিন, বিবর্ণ, ক্লান্ত একজন মানুষ, সবার অগোচরেই একটু একটু করে বেড়ে উঠেছিলেন অনাদরে আর অবহেলায়, আমাদের এই সমাজেই। পারিবারিক, সামাজিক আর মানসিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষটি চোখ তুলে তাকাতে পারেননি সেদিন। যেন অদৃশ্য শৃঙ্খলের শাসনাবদ্ধ প্রতীকী এক মানবসন্তান!

মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে তুরিন বলেছিলেন, ‘১৯৭২ সালে যুদ্ধশিশু সামছুন নাহারের জন্ম হয়েছিল। অথচ ঠিক একই সময়ে জন্ম নেওয়া অন্য শিশুরা পরিবারবদ্ধ হয়ে মাথা উঁচিয়ে ঘুরে বেড়ায় আজ, গর্ব করে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে। যুদ্ধশিশু সামছুন নাহার তা কখনোই পারেননি। যেন জন্মই তাঁর আজন্ম পাপ!’

বাহাত্তরে মাজেদার বাবার বাড়িতে যুদ্ধশিশু সামছুন নাহার জন্ম নেন। এরপর শিশু সামছুন নাহারকে বাবার বাড়িতে রেখেই মাজেদা তাঁর স্বামী আঁতাই মিয়ার বাড়িতে চলে যান। সেখানে তাঁদের আরো সন্তানের জন্ম হয়। মাঝে প্রায় পাঁচ বছর তাঁর সন্তানের সঙ্গে মাজেদার কোনো যোগাযোগ ছিল না। যুদ্ধশিশু সামছুন নাহার তাঁর নানা বাড়িতেই বড় হতে থাকেন। আঁতাই মিয়া সামছুন নাহারের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করতেন। নানা বাড়িতে বড় হওয়ার পর সামছুন নাহারের বিয়ে হয়েছিল। সেই সংসারও টেকেনি তাঁর। তিনি বীরাঙ্গনা মাজেদার সন্তান জানতে পেরে তাঁকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে তাঁর স্বামী আরেকটি বিয়ে করেছিল। সামছুন নাহার সেই থেকে একাই থাকেন, অনেকটা নিভৃতে। যুদ্ধাপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার পর থেকে তিনি এখন আর নিজের বাসস্থানেও থাকতে পারেন না। জীবননাশের হুমকি পেয়ে তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যে মানুষটির কোনো ঘর নেই, দেশ নেই, দেওয়ার মতো কোনো পরিচয়ও নেই, তাঁর পালানোরও কোনো পথ থাকে কি!

একাত্তরে পুরুষ-নারী উভয়েই যুদ্ধ করেছেন। তাঁরা দেশ রক্ষার পাশাপাশি প্রাণ রক্ষার জন্য যুদ্ধ করেছেন। একজন পুরুষ যখন দেশ ও প্রাণ রক্ষায় যুদ্ধরত থেকেছেন, ঠিক একই সময় একজন নারীকে দেশ ও প্রাণের পাশাপাশি সম্ভ্রম রক্ষার জন্যও যুদ্ধ করতে হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সম্ভ্রম রক্ষার চেষ্টাও যুদ্ধের শামিল! সহায়-সম্পদের পাশাপাশি যুদ্ধে প্রাণের হানি হয়, দেহের হানি ঘটে; এমনকি সম্ভ্রমেরও হানি হয়। যুদ্ধ শেষে বিজয়ের মূল্য নির্ধারণে প্রাণহানির হিসাব হয়, সম্পদহানির হিসাব হয়, সম্ভ্রমহানিরও হিসাব হয়। অথচ সম্ভ্রমহানির পরিণতিতে জন্ম নেওয়া অগণিত শিশুর হিসাব আমাদের এই ঘুনেধরা সমাজে আজও হয়নি। হয়নি তাঁদের মূল্যায়ন!

যে শিশুর জন্ম হয়েছিল শত্রুর বর্বরোচিত প্রতিহিংসা থেকে, পিতৃহীন বলে তাঁদের আমরা লজ্জায় গ্রহণ করি না! যুদ্ধ জয়ের পর সব কিছুরই হিসাব হয়েছে। কিন্তু যে শিশু বেদনার্ত জন্মের বিনিময়ে ১৭ কোটি মানুষের আত্মপরিচয় ও আজন্ম ঠিকানার হদিস এনে দিয়েছিলেন, তার হিসাব এ দেশে হয়নি। অত্যন্ত অকৃতজ্ঞের মতো ‘যুদ্ধশিশু’ বলে সমাজের চোখে তাঁকে ‘অবাঞ্ছিত শিশু’, ‘শত্রু সন্তান’, ‘অবৈধ সন্তান’, এমনকি ‘জারজ সন্তান’ নামের অমানবিক পরিচয় লেপ্টে দিতেও কুণ্ঠাবোধ হয়নি।

৩০ লাখ বাঙালির জীবন ও পাঁচ লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত যে স্বাধীনতা, হাজার হাজার বিজয় শিশুর জন্মের বিনিময়েও কি সেই একই স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি! সামছুন নাহার একজন বিজয় শিশু, যাঁর জন্মের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীনতাকে ধারণ করি, লালন করি, বুক ভরে আগলে রাখি প্রতিটি নিঃশ্বাসে। ‘ওরা যুদ্ধশিশু নয়; ওরা আমাদের বিজয় শিশু’—ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের এই অনুভূতিই হোক বাঙালি জাতির অনুভূতি! এভাবেই পূর্ণতা পাক ‘বিজয় আর স্বাধীনতা’!

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

sabbir.rahman@gmail.com

 


মন্তব্য