kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় নির্বাচন

মুনির আহমদ

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রাণ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতার পালাবদল হয়।

এটি একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে সরকার উত্খাত কিংবা বন্দুকের নলের জোরে ক্ষমতা গ্রহণের যেমন সুযোগ নেই, তেমনি যেনতেনভাবে ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার অনৈতিক পন্থাও সমর্থনযোগ্য নয়। নির্বাচন হতে হয় অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক—যাতে জনগণের প্রকৃত সম্মতি ও রায় মেলে। এর ব্যতিক্রম হলে সরকারের বৈধতা নিয়ে সংকট তৈরি হয়। গণতন্ত্রের সোপান হয় নড়বড়ে। রাষ্ট্রশাসনে জনগণের অধিকার হয় দুর্বল। ক্ষমতায়নের পথ হয় বন্ধুর।

বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতার পালবদল হচ্ছে। ১৯৯১ সালের আগে জাতীয় নির্বাচনগুলো দলীয় সরকারের অধীনে হয়েছে। ওসব নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরাই জিতেছে। তাদের পরাজয়ের নজির নেই।

১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এ সংকট দূর হয়। তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ দেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ‘কেয়ারটেকার’ সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সরকার ছিল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও নির্দলীয়। এই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। নির্বাচনে দেশের সব দলই অংশগ্রহণ করে। সম্পূর্ণ সন্ত্রাসমুক্ত ও ভয়ভীতিহীন পরিবেশে উৎসবমুখর আমেজে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনই ছিল অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য।

জাতীয় সংসদের মাগুরা ও ঢাকার মিরপুর আসনের উপনির্বাচনে তখনকার ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার ব্যাপক অনিয়ম করায় নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ প্রতিষ্ঠার দাবি জনসমক্ষে চলে আসে। বিএনপি সরকার তা অগ্রাহ্য করায় তখনকার বিরোধী দলগুলো তীব্র আন্দোলন ও গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয় ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বর্জন করায় তা পরিণত হয় প্রহসনের এক বিতর্কিত নির্বাচনে। ভোটারবিহীন এ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি আবার সরকার গঠন করেই ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে প্রতিস্থাপন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। বাংলাদেশ সংবিধানের ২ক পরিচ্ছেদে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ শিরোনামে অনুচ্ছেদ ৫৮খ, গ, ঘ, ঙ সমন্বয়ে আইনটি গৃহীত হয়। এই আইনে নির্বাচিত নয়, কিন্তু নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে কিছুসংখ্যক মনোনীত ব্যক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পরে নির্দলীয় সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয় দেশের সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিধান চালু করে। শুরু হয় সরকারবিরোধীদের সহিংস আন্দোলন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, ধ্বংস হয় দেশের অর্থনীতি। বিনষ্ট হয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি। নতুন নিয়মে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে দেশের ৪১টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ১২টি অংশ নেয়। বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচন বয়কট করে।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটের আগে বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে যান ১৫৪ জন জনপ্রতিনিধি। সহিংসতা, নাশকতা ও প্রাণহানির ঘটনাও ছিল বিষাদময়। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত মারা যায় ১২৩ জন। নির্বাচনের দিন ১৯ জন, যার ১৫ জনই মরে পুলিশের গুলিতে। সহিংস ঘটনায় ভোটগ্রহণ স্থগিত হয় ৫৩৯টি কেন্দ্রের। বিরোধী দলগুলোর ভাষায় ‘গণতন্ত্র হত্যার’ ও জনগণের মূল্যায়নে ছিল ‘একতরফা’ নির্বাচন। সরকারি দল বলেছিল ‘নিয়ম রক্ষার নির্বাচন’।

জনগণের পছন্দসই প্রতিনিধি বাছাই যদি নির্বাচনের উদ্দেশ্য হয়, দশম সংসদ নির্বাচন সে লক্ষ্য পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ ছিল, ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং তফসিল থেকে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে ছিল স্বচ্ছতার ছাপ। ছিল না রাজনৈতিক সহিংসতা, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা। ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতা অপব্যবহারের প্রবণতা। সফল বা আদর্শ নির্বাচনের উপাদান খুুঁজে পাওয়া যায় লোকসভা নির্বাচনের প্রতিটি বাঁকে।

ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো ভারতেও ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের হারার রয়েছে অসংখ্য নজির। ১৫তম লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপি হেরেছিল। জিতেছিল কংগ্রেস ও তার নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। ১৬তম নির্বাচনে কংগ্রেস হেরেছে, জিতেছে বিজেপি ও তার নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। ক্ষমতার এই পালাবদলগুলো ছিল শান্তিপূর্ণ, নিয়মতান্ত্রিক ও সংবিধানসম্মত। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলো আস্থার সংকটে ভোগে না। ভোট কারচুপি বা ফলাফল জালিয়াতি হতে পারে এমন সন্দেহও পোষণ করে না। আস্থার প্রতীক হয় স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, যার রয়েছে অদম্য শক্তি ও সাহস। কারো রক্তচক্ষু কিংবা হুংকার তার সততা ও নিষ্ঠায় দিতে পারে না সামান্যতম আঁচড়। ভয়ভীতি ও শঙ্কামুক্ত থেকে কমিশন দৃঢ়চিত্তে নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে। কমিশনের এমন ভাবমূর্তি অর্জনের পেছনে সহায়ক থেকেছে সেখানকার গণতান্ত্রিক নিয়মনীতি, মূল্যবোধ ও উন্নততর রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাজনীতিবিদদের ইতিবাচক ভূমিকা। ভারতের জনগণ সামরিক শাসনের ফোঁড়ও অবশ্য কখনো খায়নি। তবে জরুরি অবস্থার তিক্ত এক অভিজ্ঞতা তাদের আছে। ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধী ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করায় জনগণের মৌলিক অধিকার খর্ব হয়। সংবাদপত্রের কণ্ঠ হয় রোধ। বিরোধী নেতাদের ওপর চলে নির্যাতন ও নিপীড়ন। সাধারণ নির্বাচন থাকে স্থগিত। সেই কষ্ট ও যন্ত্রণার ক্ষত শুকিয়ে ভারত আজ উন্নত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির এমন এক দেশ, যেখানে কে জাতির পিতা, কে স্বাধীনতার ঘোষক; এ-জাতীয় প্রশ্ন তুলে কেউ খামাখা রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করে না। জাতীয় নেতাদের অসম্মানিত করে কেউ কথা বলে না। জাতীয় নির্বাচন কার অধীনে হবে তা নিয়ে কেউ অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করে না। জনগণের দেওয়া রায়ের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, সংবিধানের প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস, দেশাত্মবোধ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার রাজনীতি সুপ্রতিষ্ঠিত বলে ভারতে গণতন্ত্র পেয়েছে সুমহান এক মর্যাদা।

নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে কমিশন হবে স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ, যার ক্ষমতা হবে অসীম ও মনোবল হবে দৃঢ়। অথচ তার বিপরীতে আমাদের নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা হয় দীনতা ও বশ্যতার, সক্ষমতার বিপরীতে অক্ষমতার। বিচারপতি আব্দুর রউফ কমিশন ও আজিজ কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা তো সবার জানা। মাহিন্দ্রা দেশাপ্রিয়া শ্রীলঙ্কার নির্বাচন কমিশনার। রাজাপাকসের শাসনামলে তাঁর নিয়োগ হলেও দেশাপ্রিয়া রাজাপাকসের অন্যায় সব আবদার উপেক্ষা করে সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করে শক্ত হাতে শ্রীলঙ্কার ঐতিহাসিক নির্বাচন সম্পন্ন করে দেখালেন সাংবিধানিকভাবে পাওয়া দায়িত্ব কিভাবে পালন করতে হয়। তাঁর দৃঢ়চেতা ভূমিকায় পাল্টে যায় শ্রীলঙ্কার নির্বাচনব্যবস্থা। নির্বাচনে রাজাপাকসে জয়ী হলেও তাঁর দল হয় পরাজিত। দলের পরাজয় মেনে নিয়ে তিনি বিবৃতিও দেন। আমাদের নির্বাচন কমিশন কিন্তু দেশাপ্রিয়াদের মতো মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে না বলেই দেশের গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, হোঁচট খাচ্ছে, থাকছে অবরুদ্ধ। রাজনীতি হয়ে ওঠে সহিংস।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সাফল্যমণ্ডিত করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, যা নিশ্চিত করবে নির্বাচন কমিশন। কাজেই আমাদের লক্ষ্য হতে হবে একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন। কমিশনকে সার্বভৌম ক্ষমতায় দেখতে চাই আমরা।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা)


মন্তব্য