kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এপার-ওপার

কাশ্মীর জ্বলছে জ্বলছেন ওমরও

অমিত বসু

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কুমিল্লার রসমালাইয়ের চেয়ে রসাল সংলাপ। আলাপে কাঁটা ছাড়া গোলাপের কোমলতা।

মুহূর্তের বিরহে বিহ্বলতা। এমনিভাবেই চলেছিলেন দুজনে। দুজনার বন্ধনে বেহেশতের পবিত্রতা। পরিবার-পরিজনের বিরূপতা তুচ্ছ করে দুর্বার প্রেমের রথ। পথ এক, গন্তব্য অভিন্ন। বাধা বাবা ফারুক আবদুল্লা। পোড়খাওয়া রাজনীতিক। তিনি বারবার জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী। প্রেমিকা পায়েলকে নিয়ে ছেলে ওমরের পাগলামো জানতে পারেননি। বলেছেন, ঘোরলাগা চোখে ঘর বাঁধার স্বপ্ন ছাড়ো। বাস্তবের মাটিতে পা রেখে ভবিষ্যৎ ভাবো। ওমরের পাল্টা জবাব, আমাদের প্রেমও শাহজাহান-মমতাজের মতো গভীর। আমার তাজমহল গড়ার দরকার হবে না। মমতাজের অকালমৃত্যুতে, স্মৃতিতে তাজমহল। পায়েল যাবে না। চিরদিনের সঙ্গী হবে আমার। চলার পথে সুখে-দুঃখে থাকবে পাশে।

পুত্রের কথায় সন্তুষ্ট হননি ফারুক। তিনি জানতেন, আর পাঁচজনের মতো ছেলেমেয়ে, বউ নিয়ে সংসার করে দিন কাটবে না। ওমরের কাশ্মীরের হাল ধরতে হবে। রাজনীতির রাস্তার অনেক কাঁটা মাড়িয়ে এগোনো সহজ নয়। রক্তাক্ত পায়েও চলা ছাড়া উপায় নেই। ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ ভুলে মানুষের ডাকে সাড়া না দিলে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের দফারফা। পায়েলের বাবা আর্মি জেনারেল। যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা আছে। জীবনযুদ্ধ তাঁর থেকে আলাদা, সেটি জানতেন না। প্রেমের মাতামাতিতে মেয়ের সঙ্গে তিনিও খুশি। বন্ধুর মতো কন্যার পাশে থেকে প্রেমের গল্প শুনতে ভালোবাসতেন। সেনাবাহিনীর কর্কশ জীবন থেকে ছুটি নিতেন নিশ্চিন্তে। এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিতেন মেয়েকে। কেন দেবেন না। সৈনিকজীবনে প্রেমের পদধ্বনি শোনেননি কোনো দিন। যা কিছু সম্পর্ক বিয়ের পর। তাতে অসুবিধা হয়নি। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখের সংসার। প্রেম করলে কী সেটা হতো। রবীন্দ্রনাথ যে বলেছিলেন, ‘সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মিলে না। ’ তাই তো হলো পায়েলের। এত প্রেম কোথায় গেল। কচি কলাপাতার মতো জীবন এখন শুকনো শালপাতা। নতুন খাতায় আবার নতুন করে অঙ্ক কষা।

শুরুটা ভালোই ছিল। বাবা ফারুকের কথার তোয়াক্কা না করে ওমরের বিয়ে পায়েলকে। কাশ্মীর ভূস্বর্গ হলেও ঘরের রাজ্য। মন চেয়েছে, মধুচন্দ্রিমায় দূরে কোথাও যেতে। সুইজারল্যান্ড মন্দ নয়। বলিউডের ছবির শুটিং এখন কাশ্মীর ছেড়ে সেখানেই। বাংলা ছবির পরিচালকদের কাশ্মীরে অরুচি। বিদেশে ফোকাস। নায়ক-নায়িকার নাচগানের পছন্দের জায়গা কম নেই। উদ্দাম প্রেমে ভাসতে ভাসতে অন্য দেশে ওমর-পায়েল। দেশ থেকে দেশান্তরে পায়েলের ঝঙ্কারে মুগ্ধ ওমর। রং শুধু চোখে নয়, মনেও। ফিরে এসে সুখের ঘরে খুশির ঝরনা। বাবা ফারুকের মনে তবুও উদ্বেগের মেঘ। ঘরপোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। এবার টেনশন থেকে মুক্তির সিদ্ধান্ত।

ছেলে ওমরের ঘাড়ে রাজনীতির জোয়াল চাপিয়ে ছুটি। বাবা ফারুকের জায়গায় কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ছেলে ওমর। রাজ্যে মেঘ-রোদ্দুরের খেলা। এই উজ্জ্বলতা তো পরক্ষণেই ধূসরতা। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে প্রতিনিয়ত চাপ বাড়াচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান। কাশ্মীরের শান্তি মানেই তাদের পরাজয়। জঙ্গি ঢোকাও। তরুণদের মগজ ধোলাই করে ট্রেনিং দাও। যাতে শক্তপোক্ত সন্ত্রাসী হতে পারে। কাশ্মীরকে অগ্নিগর্ভ রাখাটাই লক্ষ্য। ওমর পড়লেন ফাঁপরে। জীবন যেন রক্তাক্ত গোলাপ। কোমল পাপড়ির নিচে নিষ্ঠুর কণ্টক। রাজ্য নিয়ে নাজেহাল, পায়েলকে সময় দেবেন কখন! টানাপড়েনের মধ্যেই সন্তান এলো সংসারে। একে একে দুই। দুই সন্তানের পিতা হয়ে প্রথমটায় আহ্লাদে আটখানা। চোখেমুখে সন্তোষের ছাপ। নাতি পেয়ে ফারুকও খুশি। তাঁর মনে পড়ল বাবা শেখ আবদুল্লার কথা। ওমর হওয়ার পর হাতে যেন ঈদের চাঁদ। বাঁধভাঙা আনন্দের বন্যা। বন্যার জল পলি রেখে যায়। জমি উর্বর হয়। সংসারও তাই। উচ্ছ্বাসে সমৃদ্ধির আশ্বাস, সমস্যা হচ্ছে, সময় শুধু দেয় না, নেয় অনেক কিছু। সময়ের ঘূর্ণিপাকে দিন-রাত্রির মতো আলোর পর অন্ধকারও ছড়ায়।

বাবা শেখ আবদুল্লার পর ফারুক কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে রাজ্য সামলেছেন রাজনৈতিক চালে। মানুষের সঙ্গে সংযোগ রাখাটা ছিল ক্ষমতার বাইরে। এলিট ক্লাসের লোক তিনি। গজদন্ত মিনারে থাকাটাই অভ্যাস। সেখান থেকে নেমে রাস্তার ধুলোয় পা রাখা অসম্ভব। তাঁর দল ন্যাশনাল কনফারেন্স সেই কারণে মানুষের দল হয়ে উঠতে পারেনি। কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করে টিকে থাকা। ধীরে ধীরে প্রতিদ্বন্দ্বী দল মুফতি মোহাম্মদ সাঈদের পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি বা পিডিপির উত্থানে বিপদের গন্ধ পেলেন ফারুক। তাদের ঠেকালেন কোনো রকমে।

ওমর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর পিডিপি আরো শক্তিশালী হলো। ২০০৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে চাপে পড়লেন ওমর। বিধানসভার ৮৭ আসনে ওমর পেলেন মাত্র ২৮টি। পিডিপি ২১। মাত্র সাতের ব্যবধান। ২০১৩ সালের নির্বাচনে ছবিটা একেবারে উল্টে গেল। ওমর মুখ্যমন্ত্রিত্ব হারালেন। হতাশার প্রভাব পড়ল ঘরে। দুই সন্তান আর স্ত্রী পায়েলের দিকে নজর দেওয়া দূরের কথা, বিবাদ-বিসংবাদে জড়ালেন। সামান্য কারণে তুমুল ঝড়। ধাক্কাটা আস্তে আস্তে ভিতটাই নাড়িয়ে দিল। বিবাহবিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে উঠল। আদালতে বিচ্ছেদ ঠেকাতে চেয়েছেন পায়েল। ওমর ভিন্ন হতে মরিয়া। পায়েল কাশ্মীর ছেড়ে দিল্লির আকবর রোডে সরকারি বাংলোয় থাকলেও তাঁকে বাংলো ছাড়ার নির্দেশ দিলেন আদালত। ওমর মুখ্যমন্ত্রী নন, তাই সেই বাংলোয় থাকার অধিকার নেই তাঁর বা পরিবারের কারোরই। পায়েল বাপের বাড়ি চলে গেলেন। মাঝেমধ্যে বন্ধুদের কাছেও আশ্রয় নিলেন। সেটাও চলল না। নিরাপত্তার অভাব। পায়েলের জন্য জেড প্লাস নিরাপত্তা। তিনি সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী। যেখানে-সেখানে থাকাটা মোটেও নিরাপদ নয়।

পায়েল আদালতে খোরপোশের দাবি জানালেন। পরিমাণটা কম নয়। মাসে ১৫ লাখ টাকা। পায়েলের যুক্তি, নিরাপদ আশ্রয় আর সন্তানদের মানুষ করতে এর চেয়ে কম টাকায় হয় না। ওমর বেঁকে বসেছেন। টাকা তিনি দিতে পারেন, কিন্তু কেন দেবেন। পায়েল এখনো তাঁর স্ত্রী হলেও মন থেকে দূরে। তাঁর জন্য এত টাকা খরচের কী মানে। সন্তান তো বিদেশে পড়াশোনা করবে। তাদের খরচা দেওয়া যেতে পারে। আদালতে শুনানি ২৭ অক্টোবর। পায়েল বিচ্ছেদ ঠেকাতে লড়ছেন। আদালতকে জানিয়েছেন, তাঁদের আলাদা হওয়ার কোনো কারণ নেই। ঝগড়াঝাঁটি কোন সংসারে না হয়। জনসমক্ষে পায়েলের স্পষ্ট উচ্চারণ, ওমরকে এখনো ভালোবাসি। ওমর কথাটা অস্বীকার করে কিছুতেই বলতে পারছেন না, আই ডোন্ট লাভ হার।

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য