kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ট্যানারি ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট.

ইসহাক খান

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ট্যানারি ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট.

রাজপথে প্রায় একটি কমন স্লোগান শোনা যায়, ‘অমুকের চামড়া তুলে নেব আমরা। ’ এবার ট্যানারির মালিকদের স্লোগান ছিল, ‘পশুর চামড়া নেব না আমরা।

ঈদুল আজহায় কোরবানি হওয়া পশুর চামড়ার দাম গতবারের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমে মিলেছে। গতবার খুচরা ব্যবসায়ীরা একটি গরুর চামড়া এক হাজার ৩০০ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পেরেছেন। এবার তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। কোনো কোনো স্থানে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে তা মাটির গর্তে পুঁতে রেখেছেন কোরবানিদাতারা।

এ রকম একটি ঘটনা ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের মুরাদপুর গ্রামে। ওই গ্রামে এবার ৬২টি গরু কোরবানি হয়েছে। অথচ ঈদের দিন সেখানে চামড়া কিনতে কোনো ক্রেতা যায়নি। পরদিন একজন ক্রেতা গেলেও যে দাম তিনি দিতে চেয়েছেন, তাতে বিক্রির বদলে সব চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলাকেই যৌক্তিক ভেবেছে মুরাদপুরবাসী। তারা করেছেও তাই। ঈদের পরদিন মাটিতে গর্ত করে সব চামড়া পুঁতে ফেলেছে। [সূত্র : কালের কণ্ঠ]

ফরিদপুরের অনেক ব্যবসায়ী চামড়া বিক্রির জন্য চামড়া আড়তে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত বিক্রি করতে পারেননি। কেউ কেউ সেগুলো বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন, কেউ মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করে দিয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বালুবাগান মহল্লার জনৈক আসলাম মিয়া ৯ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে একটি ছাগল কিনে কোরবানি করেছেন। তিনি নিজেই ছাগলের চামড়াটি রিকশায় করে নিয়ে গিয়েছিলেন নিমতলী ফকিরপাড়া চামড়ার আড়তে। তিনি ওই চামড়া মাত্র ৩০ টাকায় বিক্রি করতে পেরেছেন।

এভাবে সারা দেশে চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কোরবানিদাতারা চামড়া বিক্রির টাকা এলাকার এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিংসহ গরিব-দুস্থ মানুষের মধ্যে বিতরণ করে থাকেন। এবার ট্যানারি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়ে মোটা দাগের কারসাজি করেছেন। ট্যানারি পল্লী স্থানান্তরে সরকারের নির্দেশনা ও উচ্চ আদালতের জরিমানার অর্থ উসুল করতে ট্যানারি মালিকদের এই কারসাজি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

রাজবাড়ীর একজন চামড়ার ফড়িয়া ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঈদের আগেই ঢাকার ট্যানারি ব্যবসায়ীরা আমাদের বলে দিয়েছেন, কোনো মতেই ছাগলের চামড়া ৪০ টাকা এবং গরুর চামড়া ২০০ টাকার বেশি দিয়ে কেনা যাবে না। ফলে আমরা বেশি দামে চামড়া কিনতে পারছি না। ’

কথা হলো, এই ব্যাপারটা সরকারের ভাবা উচিত ছিল। ব্যবসায়ীরা যে তাঁদের মুনাফার জন্য নিজের চামড়াও খুলে নিতে পারেন, সেটা তাঁদের কারসাজিতে পরিষ্কার। তাঁরা কিছুতেই ট্যানারি স্থানান্তরের পক্ষে ছিলেন না। তাঁরা দূষিত বর্জ্য দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীকে হত্যা করতে উদগ্রীব। বুড়িগঙ্গা নদী নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা নেই। তাঁরা পরিবেশের কথাও ভাবেন না। তাঁরা শুধু তাঁদের মুনাফার কথা ভাবেন। তাঁরা নিজেরা দামি ফ্ল্যাটে থাকেন। তাঁদের বাসার আশপাশের পরিবেশ ঝকঝকে তকতকে। কিন্তু তাঁরা অন্য মানুষের জীবনমানের কথা ভাবেন না। ভাবলে তাঁরা এমনটি করতে পারতেন না। সরকার তাঁদের সাভারে জায়গা দেওয়ার পরও সেখানে না যাওয়ার জন্য নানাভাবে গড়িমসি করতে থাকেন। সরকার যখন তাঁদের ট্যানারি স্থানান্তরের সময়সীমা বেঁধে দেয়, তখন তাঁরা নানা অজুহাত দেখাতে থাকেন। অবশেষে আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত তাঁদের জরিমানাসহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে ট্যানারি স্থানান্তরের নির্দেশনা দিলে তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে কোরবানির চামড়া নিয়ে এই কারসাজি শুরু করেন।

এ ব্যাপারে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, অন্যবারের তুলনায় এবার ট্যানারির মালিকদের সমস্যা বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রক্রিয়াজাত ও চামড়াজাত পণ্যের দরপতন, চামড়া সংরক্ষণে লবণের দামও বেশি এবং ট্যানারি স্থানান্তরের জন্য মালিকদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

তাঁদের বাড়তি অঙ্ক তাঁরা উসুল করতে এবার চামড়া ক্রয়ের ব্যাপারে অনীহা দেখিয়েছেন। এ ছাড়া আরো একটি ব্যাপার রয়েছে, তাঁরা যে আড়তগুলো থেকে চামড়া সংগ্রহ করেন, সেই আড়তগুলোয় অনেক টাকা বকেয়া রেখেছেন। ইচ্ছে করে সেই টাকা পরিশোধ করছেন না। ফলে আড়তদাররা ইচ্ছেমতো চামড়া কিনতে পারেননি।

এর সপক্ষে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন রিটেইল ডিলার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য ভেবে দেখার মতো। তাঁরা সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা নির্ধারিত দামেই চামড়া কিনছি। কোনো মৌসুমি ব্যবসায়ী বেশি দরে চামড়া কিনলে লোকসানে তো পড়তেই হবে। ’ মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাওনা পরিশোধ না করার কারণ হিসেবে তাঁরা বলেছেন, ‘আমরাই ট্যানারির মালিকদের কাছ থেকে পুরো টাকা পাই না। গত বছরের ঈদের প্রায় ৬৫ শতাংশ টাকা ট্যানারির মালিকরা আমাদের পরিশোধ করেননি। এ পর্যন্ত মালিকদের কাছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। ’

দেশে বছরে যে পরিমাণ পশুর চামড়া সংগৃহীত হয়, তার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ চামড়া আসে ঈদুল আজহায়। সবচেয়ে ভালো, সুস্থ, সবল ও দেখতে সুন্দর গরুগুলো কোরবানিতে জবাই হয় বলে এ সময় চামড়ার মান ভালো থাকে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম ও চাহিদা কমে যাওয়ায় গত বছরের ৩০ শতাংশ চামড়া এখনো মজুদ রয়ে গেছে। এই কারণ দেখিয়ে এ বছর চামড়ার দাম কমিয়ে নতুন করে দাম নির্ধারণ করেছিলেন তাঁরা।

কোরবানির তিন দিন আগে ধানমণ্ডির একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সন্মেলন করে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪০ টাকা দরে কেনা হবে বলে জানায় চামড়া খাতের তিন সংগঠন। এ ছাড়া খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০ টাকা, বকরির চামড়া ১৫ টাকা ও মহিষের চামড়া ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

ব্যবসায়ীরা লবণের চড়া দামের কথা উল্লেখ করেছেন। এটা তো বাংলাদেশে কোনো নতুন ঘটনা নয়। কোরবানি ঈদ আসার আগে থেকেই মসলার দাম আকাশচুম্বী হতে থাকে। কাঁচা মরিচ এবং শসার দাম বেড়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। সে সবই ব্যবসায়ীদের কারসাজি। এখানে সাধারণ মানুষ অসহায়। এখন সেই নিজেরা নিজেদের তৈরি কারসাজিতেই ধরা খেয়েছেন। এর মাসুল তাঁদের আরো অনেক দিন গুনতে হবে। এত দিন তাঁরা সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে তামাশা করেছেন। আজ সেই তামাশার জালে নিজেরাই জড়িয়ে পড়েছেন। এসব করেছেন তাঁরা ট্যানারি স্থানান্তর না করার জন্য।

এ ঘটনায় রাষ্ট্রের সামান্য ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে সরকারকে তার সিদ্ধান্তে অটল থাকতে হবে। না হলে ট্যানারির মালিকদের কাছে রাজধানীবাসীকে জিম্মি হয়ে থাকতে হবে। ট্যানারি স্থানান্তর না হলে ধ্বংস হবে পরিবেশ। যে বুড়িগঙ্গা ঢাকার প্রাণ, সেই বুড়িগঙ্গা মানুষের জীবনে মরণফাঁদ হয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে। বিষয়টি সবারই গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। তবে সরকারকে জনগণের জীবনমানের কথা ভেবে তার সিদ্ধান্তে অটল থাকার ব্যাপারটা আগে ভাবতে হবে।

লেখক : গল্পকার, টিভি নাট্যকার


মন্তব্য