kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সাদাকালো

অব্যাহত সাম্প্রদায়িকতা ও বাস্তুত্যাগীদের কাফেলা

আহমদ রফিক

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



অব্যাহত সাম্প্রদায়িকতা ও বাস্তুত্যাগীদের কাফেলা

শৈশবে মায়ের মুখে শুনেছি, রায়েরবাজারের মৃিশল্পের সুখ্যাতি। ঢাকা শহরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত রায়েরবাজার ছিল কুমোরদের পাড়া।

পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট নদী। হয়তো এই এলাকার মাটির বৈশিষ্ট্য দেখেই মৃিশল্পের কারিগররা এখানে বসতি স্থাপন করে। সময়টা নিঃসন্দেহে ইংরেজ আমল, তবে তা মোগল আমল হলেও অবাক হব না। কারণ একটি বিশেষ পেশায় খ্যাতিমান জনগোষ্ঠী গড়ে উঠতে বেশ সময় লাগে। মা বলতেন, ‘রায়েরবাজারের হাঁড়ি, কলসি, গামলা, সরার কোনো তুলনা নেই। এগুলো ভাঙতে জানে না। ’ কোথায় ঢাকার রায়েরবাজার, আর কোথায় ত্রিপুরা জেলার অন্তর্গত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেঘনাতীরের প্রত্যন্ত গ্রাম শাহবাজপুরে রায়েরবাজারের কুমোরদের গুণকীর্তন। এ কথকতার সময় ১৯৩৫-৩৬ খ্রিস্টাব্দ।

সেই রায়েরবাজারের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে। দাঙ্গাবিধ্বস্ত রায়েরবাজার পাড়ায় গিয়েছিলাম আমরা কয়েকজন সেখানকার পালদের বাস্তুত্যাগ ঠেকাতে। পারিনি। এ ঘটনা সংগত উপলক্ষে একাধিকবার লিখেছি। রায়েরবাজার তখনো সম্পন্ন এলাকা, এদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার মন্দ নয়। স্থানীয় স্কুলের মাস্টারমশাইর প্রশ্ন এখনো কানে বাজে; ‘বাপ-ঠাকুরদার ভিটা ছাইড়া কে যেতে চায়, কিন্তু জীবনের, সম্ভ্রমের নিরাপত্তা দিতে পারবেন?’

কথাটা ঠিক। পাকিস্তানি আমলে রক্তাক্ত দেশ বিভাগের ধারাবাহিকতায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রকাশ পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সমাজ বন্ধ করতে পারেনি। এ সমাজের অন্তর্গত সম্প্রদায়বাদী দুর্বৃত্তরা দাঙ্গার আগুন জ্বেলেছে, ঘরবাড়ি পুড়েছে, মানুষ মরেছে, নারীর ইজ্জত নষ্ট হয়েছে, শুরু হয়েছে ব্যাপক বাস্তুত্যাগ, দেখা গেছে উদ্বাস্তুদের কাফেলা। ঢাকার সমাজ সচেতন ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, পেশাজীবীদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদী স্লোগান উঠেছে ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে পৌঁছে: ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ সংবাদপত্রের পাতায় মোটা অক্ষরে শিরোনাম আর দেয়ালে লাল বর্ণমালায় অনুরূপ পোস্টার।

এ বাস্তুত্যাগ শুরু ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ সালের ভয়াবহ দাঙ্গার সময় থেকে, পরে ষাটের দশকে ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে। পেছনে শাসকশ্রেণির মদদ, মাঠে, রাজপথে, গলিতে ‘সমাজবিরোধী বাঙালি’ মুসলমান দুর্বৃত্ত এবং বিশেষভাবে বিহারিকুল—প্রতিহিংসায় উন্মাদ। মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও অন্যান্য এলাকা থেকে, গোটা পূর্ব পাকিস্তানের এলাকা বিশেষে মাটি রক্তে ভিজেছে। পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক লক্ষ্য যে ছিল পূর্ব বাংলা হিন্দু জনতাশূন্য করা সে গূঢ় অভিপ্রায় তখন বোঝা যায়নি, তা প্রকাশ পেয়েছে একাত্তরের ৯ মাসে।

না, মাস্টার মশাইদের দেশত্যাগ ঠেকানো যায়নি। তাঁরা সীমান্ত অতিক্রম করেছেন আরো অনেকের সঙ্গে। পাকিস্তান আমলে দফায় দফায় এভাবে পূর্ব বাংলা থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রায়ের বাস্তুত্যাগের ঘটনা অব্যাহত ধারায় চলেছে, এখনো মাঝেমধ্যে তা চলে নানা উপলক্ষে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়। সে উপলক্ষ কখনো সামাজিক, কখনো রাজনৈতিক।

দেশ অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ স্বাধীন হয়েছে একাত্তরে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে গরিষ্ঠসংখ্যক বাঙালির সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে, অনেক অনেক রক্তের বিনিময়ে। গঠিত হয়েছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র’। রচিত হয়েছে সেক্যুলার সংবিধান ১৯৭২ সালেই। কিন্তু সেই গুণে গুণান্বিত সমাজ গড়ে ওঠেনি। তাই পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে দুই জেনারেলের হাতে সংবিধানের সেক্যুলারিত্ব নষ্ট হয়েছে দুই দফায়।

কিছু ব্যতিক্রম বাদে সমাজ অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করতে পারেনি। তাই পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সাম্প্রদায়িকতার চরিত্র সক্রিয় হয়ে সংখ্যালঘুর ভিটা, জমি, ব্যবসা জবরদখলে চেষ্টা চালিয়েছে। আর এ প্রক্রিয়ায় আমার জানা মতে শহর ঢাকার একাধিক মহল্লা থেকে ব্যাপকভাবে সংখ্যালঘুর বাস্তুত্যাগ নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখের সামনে দেখেছি, রায়েরবাজার কিভাবে প্রায় কুমোরশূন্য মহল্লায় পরিণত হয়েছে। সে প্রক্রিয়ায় রায়েরবাজার এখন মুসলমান মহল্লা, টিম টিম করে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে গুটিকয় পাল পরিবার। আমার চেনাজানা বহুসংখ্যক মুসলমান পরিবার এখন রায়েরবাজারের স্থায়ী বাসিন্দা। রায়েরবাজারের প্রসঙ্গ এলেই একধরনের গভীর বেদনা অনুভব করি, সেই সঙ্গে ব্যর্থতার গ্লানিবোধ।

দুই.

সেই পুরনো ব্যথাটা উসকে দিল একটি দৈনিকের ছোটখাটো একটি সংবাদ প্রতিবেদন: ‘সমিতি বেদখল, মুছে গেছে ‘পাল’ (২৫.৮.২০১৬)। রায়েরবাজারের সম্প্রদায়গত পরিবর্তনের ছোট্ট ইতিকথা প্রকাশ পেয়েছে ওই প্রতিবেদনে। তবে পাকিস্তান আমলে অনেক জায়গার মতো, অনেক প্রতিষ্ঠানের বা আবাসনের মতো নামটা পাল্টে যায়নি, এই যেকোনো কারণে হোক ‘রায়েরবাজার’ নামটা এখনো টিকে আছে। হয়তো বা টিকে থাকবে।

তবে ওই প্রতিবেদন সূত্রে দেখা যাচ্ছে, একসময় রমরমা অর্থনৈতিক সুস্বাস্থ্যের অধিকারী পালদের প্রতিষ্ঠিত “রায়েরবাজার পাল সমিতি ট্রাস্টের সাইনবোর্ড থেকে ‘পাল’ শব্দটি বর্তমানে উধাও” দিনদুপুরে ডাকাতি, কারো কিছু বলার সাহস নেই। ওই সংগঠনটি নিবন্ধিত হয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ১৯১৮ সালে, আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ আগে। জানি না কোনোমতে টিকে থাকা কয়েক ঘর পাল এর শতবর্ষ উদ্যাপন করতে পারবে কি না।

আগেই বলেছি, রায়েরবাজারের মৃিশল্পের খ্যাতির কথা, এর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্মারকচিহ্ন ‘রায়েরবাজার পাল সমিতি ট্রাস্ট’। নেপথ্যে রায়েরবাজারের কুমোরপাড়ায় মাটির গড়া ব্যবহার্য সামগ্রী, যেমন হাঁড়ি, কলসি ইত্যাদি নৌকাবোঝাই হয়ে সারা পূর্ব বাংলায় ছড়িয়ে পড়ত এর বাণিজ্যিক সুসময়ের পরিচয় তুলে ধরে।

এখনো ওই সমিতির স্মৃতি ধরে টিকে আছে জীর্ণ, পলেস্তারা খসা ইটের তৈরি নিঃসঙ্গ পাকা দালানটি। বিব্রত পদক্ষেপে ক্বচিৎ কোনো পাল সদস্য এখানে আসে। বেশির ভাগ সময় ঘরটি তালাবদ্ধই থাকে। অথচ একসময় এখানে অনুষ্ঠান হতো, মেলাও হতো। দেশান্তরিত জনগোষ্ঠীর অবশিষ্ট কয়েক পরিবারের পক্ষে কি সম্ভব পূর্ব ঐতিহ্য ধরে রাখা, বিশেষ করে বিরূপ পরিবেশে।

কথাটা বলছি ওই প্রতিবেদনের সূত্রে এবং বিরাজমান সাম্প্রদায়িক পরিবেশের কারণে, যা নিয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান পরিষদ মাঝে মাঝে মাথা তুলে দাঁড়ায়, প্রতিবাদ জানায় বিবৃতি দিয়ে বা সংবাদ সম্মেলন করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দ্বিতীয়জন বলেন—এই সমিতির নামে ৪৭৬ বিঘা জমি ছিল। এখন প্রায় সবই (বে) দখল। যেটুকু আছে সেখানেও পালরা যেতে পারেন না। ’ অনুরূপ ঘটনা অর্থাৎ জমি জবরদখলের ঘটনার কথা শুনেছি পতিসরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে গড়া রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন নামক হাই স্কুলের জন্য প্রদত্ত জমির ক্ষেত্রে।

আগের উৎস থেকে জানা যায়, “পালদের মধ্যে বড় ব্যবসায়ীরা মিলে এই সমিতি (অর্থাৎ রায়েরবাজার পাল সমিতি) গড়ে তোলেন। পুরনো ভবনটি ছিল ‘হলঘর’, সেখানে সবাই বসতেন। ” সেই সূত্রে ভবনটি ‘গদিঘর’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। সময়ের স্রোতে, ইতিহাসের টানে সবকিছুর পরিবর্তন ঘটে যায়। রায়েরবাজার পাল সমিতির সুদিন আর থাকে না।

প্রতিবেদকের ভাষ্যে বলা হয়েছে : ‘মুক্তিযুদ্ধের পরই পালদের জায়গা দখল হওয়া শুরু হয়। সমিতির কাজও আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায়। ’ তবে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে দুই পাল নাকি চেষ্টা করেছিলেন বছর ত্রিশেক আগে। কিন্তু নানা কারণে এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে তাঁরা সফলকাম হননি। প্রতিবেদক লিখছেন, এরই মধ্যে ‘সাইনবোর্ড’ থেকে ‘পাল’ নামটি মুছে ফেলা হয়েছে। চমৎকার। অথচ  আমরা সগর্বে বলি সাম্প্রদায়িক সম্পীতির কথা।

দেশবিভাগের পরিণাম সংখ্যালঘুদের জন্য এমনই হয়ে দাঁড়ায় ভারতীয় উপমহাদেশের ত্রিধাবিভক্ত ভূখণ্ডে। যার কিছু বাস্তবে দেখা যায়, বাকিটা অনুমানে। দাঙ্গার ও বাস্তুত্যাগের মর্মন্তুদ কাহিনী তথা ইতিহাস পশ্চিমবঙ্গে জনাকয় সুধী গবেষকের চেষ্টায় লেখা হলেও বাংলাদেশে সে চেষ্টা নেই বললেই চলে। তাই দেশ ভাগ ও সাম্প্রদায়িকতার করুণ পরিণাম সংখ্যালঘুদের কতটা, কিভাবে বিপর্যস্ত করেছে সে ইতিহাস এ দেশে রচিত হয়নি বললেই চলে। গবেষকদের এদিকে বড় একটা আগ্রহ লক্ষ করা যায় না।

একইভাবে রায়েরবাজারের পালদের মৃিশল্পবিষয়ক নান্দনিক ইতিহাস যেমন রচিত হয়নি, তেমনি লেখা হয়নি সেই শিল্পী-কারিগর পরিবারগুলোর পিতা, পিতামহদের ঐতিহ্যবাহী বাস্তুভিটা ত্যাগের ট্র্যাজিক ঘটনাবলি। কুমারশ্রেণির শিক্ষিতদের কারো না কারোর সে দায়িত্ব পালন করা উচিত ছিল। আর তা পারেন শ্রমনিষ্ঠ বাঙালি গবেষকরা।

দুই বছর পর অর্থাৎ ২০১৮ সালে রায়েরবাজার পাল সমিতির প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূর্ণ হবে। তাদের সঙ্গে নিয়ে ইতিহাস ও নন্দনশিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী কিছুসংখ্যক ব্যক্তিত্ব এগিয়ে আসতে পারেন রায়েরবাজারের কিংবদন্তিপ্রতিম মৃিশল্পীদের উদ্দেশে একটি সংস্কৃতিসমৃদ্ধ দিনের অনুষ্ঠান উপহার দিতে। উপলক্ষ যদিও রায়েরবাজার পাল সমিতি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উদ্যাপন।

আর এ উপলক্ষে রায়েরবাজারের অবশিষ্ট কয়েকটি পাল পরিবারের দেখভাল করার জন্য, হারানো মৃিশল্প উদ্ধারের জন্য নানা শ্রেণির প্রতিনিধিত্বশীল একটি সংস্থা গঠন করা যেতে পারে। এরা রায়েরবাজারের ঐতিহ্যবাহী মৃিশল্পের পুনর্জাগরণের চেষ্টা চালাতে পারেন। তাতে লোকশিল্প অঙ্গনের লাভ বৈ ক্ষতি হবে না। অন্যদিকে পাল কারিগরদের নিয়ে অংশত হলেও রায়েরবাজারও বাঁচবে।

 

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী


মন্তব্য