kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে

ফরিদুর রহমান

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে

প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা মানজারেহাসীন মুরাদের অফিসে কয়েক মাস আগে এক সন্ধ্যায় আমাদের পূর্বপরিচিত একজন তরুণ তার সমবয়সী একটি  মেয়েকে নিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ও পাকিস্তান থেকে এসেছে, চট্টগ্রামের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। কথা প্রসঙ্গে সে জানাল, বাংলাদেশে এটিই তার প্রথম সফর—একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সামনাসামনি দেখার খুব ইচ্ছা তার।

ছেলেটির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানজারেহাসীন আমার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, অন্তত একজন মুক্তিযোদ্ধা তো এখানেই উপস্থিত। পাকিস্তানি তরুণীটি কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারপর আমার সামনে দুই হাত জোড় করে বলল, ‘আমি যদি পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি তাহলে কি আমাদের মাফ করে দেওয়া যায় না?’

ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্মিত হয়ে কয়েক মুহূর্ত আমি কথা হারিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর মেয়েটিকে হাত ধরে তুলে বসিয়ে দিয়ে বললাম, ‘তুমি যেমন পাকিস্তানের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করো না, আমিও তেমনি বাংলাদেশের সরকার বা জনগণের প্রতিনিধি নই। আমার মনে হয়, পাকিস্তানের সরকার যদি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা ভিক্ষা করে শুধু তাহলেই বিষয়টির একটি সম্মানজনক সমাধান হতে পারে। ’ 

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে ১১ দিনের দুর্বিষহ বন্দিজীবন শেষে প্রথম একজন পাকিস্তানিকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল ১১ বছর পর। টেলিভিশনের দর্শক মতামত জরিপ সম্পর্কিত একটি কর্মশালায় যোগ দিতে কুয়ালালামপুরে এসেছিল পাকিস্তান টেলিভিশনের অডিয়েন্স রিসার্চ অফিসার সাইফুর রেহমান। শুধু পাকিস্তানি হওয়ার কারণে আমি শুরু থেকেই তাকে একটু অন্য চোখে দেখতাম। দু-তিন সপ্তাহ একসঙ্গে কাটানোর পর অত্যন্ত বিনয়ী সহজ সরল প্রকৃতির সাইফুর রেহমান একদিন বলেই বসল, ‘কান্ট ইউ ফরগেট অ্যান্ড ফরগিভ আস?’ তাকেও বলেছিলাম, আমরা হয়তো ভুলতে পারতাম, কিন্তু তার জন্য উদ্যোগ তোমাদেরই নিতে হবে। পাকিস্তানের সরকার যদি কখনো শর্তহীন ক্ষমা চায় তাহলে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ হয়তো অতীতের হত্যা-ধর্ষণ-লুটপাট ও ধ্বংসের স্মৃতি ভুলে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। ’

পরবর্তী তিন দশকে দেশে ও বিদেশে বহুসংখ্যক পাকিস্তানি সাংবাদিক, বেতার-টেলিভিশনসহ গণমাধ্যম কর্মী, কবি-সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও এনজিও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। দু-চারজন কট্টর বাংলাদেশ বা ভারতবিদ্বেষী ছাড়া প্রায় প্রত্যেকেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যাসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সব অপরাধের জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং একই সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। অনেকেই পাকিস্তান সরকারের অপরিণামদর্শী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং কেউ কেউ যুদ্ধাপরাধের জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিচার হওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন। হতে পারে, পাকিস্তানি সমাজের যে পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ তাঁরা হয়তো তাঁদের ইতিহাস সচেতনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়বদ্ধতা থেকে তাঁদের শাসকগোষ্ঠীর কৃতকর্মের জন্য দুঃখিত, লজ্জিত ও অনুতপ্ত। কিন্তু পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ—যাদের সামনে ১৯৭১ সাল ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পটভূমি কখনোই উন্মোচিত হয়নি, যারা কোনো দিনও ইতিহাসের পাতা উল্টে প্রকৃত সত্য জানতে পারেনি; তাদের কাছে বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের নির্যাতন-নিপীড়ন, গণহত্যা ও ধর্ষণের কোনো তথ্য নেই। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর ফাঁসির পর একজন পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী করাচি থেকে প্রকাশিত ডন পত্রিকায় লিখেছেন, ‘স্কুলের তরুণ পাকিস্তানিদের মধ্যে ব্যাপক বিকৃত ইতিহাস শিক্ষা দেওয়ার যে ধারাবাহিকতা চলে আসছে তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। বাঙালিদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের কাহিনী এখানে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। ১৯৭১ সালের কৃতকর্ম অস্বীকার করা কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেয়ে পাকিস্তানের উচিত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া। ’

শুধু মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর নয়, সব চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও দণ্ড কার্যকর করা নিয়ে পাকিস্তান যে ন্যক্কারজনক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা তাদের পুরনো চেহারাই নতুন করে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যখন ‘গভীর বেদনার সঙ্গে’ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ‘একটি ত্রুটিপূর্ণ বিচার প্রক্রিয়া’র মধ্য দিয়ে একজন ‘ইসলামী চিন্তাবিদ’-এর প্রাণদণ্ড কার্যকর করেছে, তখন আমাদের জন্য তা অবশ্যই নতুন চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। গত চার দশকে ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায্য দেনা-পাওনা ও বাংলাদেশে অবস্থানরত অবাঙালি প্রত্যাবর্তনের মতো দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা ছাড়া বাংলাদেশ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে মন্তব্য করেছে বলে মনে পড়ে না। অথচ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ছিদ্রান্বেষী পাকিস্তানের বিচার, সমাজ কাঠামো, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের সামগ্রিক অব্যবস্থা আড়াই হাজার মাইল দূরে বসেও সহজে অনুমান করা যায়।   

বিভ্রান্তিমূলক ও অকার্যকর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কৃত্রিম রাষ্ট্রটি তার জন্মলগ্ন থেকে যে পর্যায়গুলো অতিক্রম করে এসেছে তা হলো সামরিক একনায়কতন্ত্র ও সাময়িক গণতন্ত্রের মোড়কে ক্ষমতা দখলের লড়াই। এখনো যে দেশে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে বেসামরিক ব্যক্তিদের বিচার সম্পন্ন হয় রুদ্ধদ্বার সামরিক আদালতে এবং তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয় না,  যে দেশে ব্লাসফেমি আইনের নামে তিন দশকে শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়, যে দেশে তথাকথিত শরিয়াহ আইনের নামে আজও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারীদের পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়, যে দেশে ‘অনার কিলিং’-এর অজুহাতে এক বছরে দুই সহস্রাধিক নারী-পুরুষকে খুন করা হলেও প্রশাসন নিশ্চুপ থাকে এবং আইন-আদালত দিবানিদ্রা দেন, সেই দেশ যখন বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ত্রুটি খুঁজে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষাবলম্বন করে তখন তাদের মর্মবেদনার আসল কারণ বুঝতে কারো বাকি থাকে না।

পাকিস্তানকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে, বাংলাদেশ অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ, তাদের ঘৃণ্য দোসর রাজাকার-আলবদরসহ পাকিস্তানের প্রেতাত্মাদের স্বপ্ন পূরণের চারণভূমি নয়। ঔদ্ধত্য সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আগেই এই ব্যর্থ রাষ্ট্রটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কথা নতুন করে ভাবতে হবে।

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান)

বাংলাদেশ টেলিভিশন


মন্তব্য