kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপি কি ঘুরে দাঁড়াবে?

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপি কি ঘুরে দাঁড়াবে?

বর্তমান সরকারের মেয়াদের অর্ধেকের বেশি সময় এর মধ্যেই পার হয়ে গেছে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সরকার ভালোভাবেই সময় পার করছে।

বলা যায়, বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিদ্যমান। তত্ত্বগতভাবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একটি দেশের কার্যকর রাজনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক হয়। আর সে কারণেই আমাদের প্রত্যাশা, সরকারের বাকি মেয়াদের পুরোটাই যেন স্থিতিশীলতায় কাটে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদের ইস্যু ব্যতীত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আর কোনো উল্লেখযোগ্য কারণ চোখে পড়েনি। তবে বর্তমান সরকার খুব সফলতার সঙ্গে জঙ্গিবাদ তথা উগ্রবাদকে মোকাবিলা করতে পারায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রমাগত উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার বিষয়টিও সর্বমহলে সুনাম অর্জন করেছে।

এই মুহূর্তে আগামী নির্বাচন ইস্যুটি আলোচনায় আসতে শুরু করেছে। অবশ্য সরকারের মেয়াদ অর্ধেক পার হওয়ার পর নির্বাচনের ইস্যু সামনে আসা স্বাভাবিক একটি বিষয়। বিগত কয়েক বছর বিএনপি নানা ইস্যুতে, বিশেষত নির্বাচনের দাবিতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও পুরোটাই বুমেরাং হয়েছে। আর সে কারণে দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি সহজেই আন্দোলনে যাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিএনপির এখন আন্দোলনভীতি রয়েছে—এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। আন্দোলনে যাওয়ার মতো সব প্রস্তুতি শেষ করতে না পারলে কোনোভাবেই তারা আন্দোলনের পদক্ষেপ নেবে না। সে ক্ষেত্রে বিএনপির নীরব থাকার সুযোগে আওয়ামী লীগকেও আগামী নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। যদিও এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ ছাড়া আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখ বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে বিধায় নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে থেকে যাচ্ছে। উল্লিখিত বিভিন্ন কারণে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ইস্যুটি এখন সবার সামনে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষে নতুন যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে সেটি সব রাজনৈতিক দলের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওই কমিশনের অধীনেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনে ‘সার্চ কমিটি’ গঠনের আভাস দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রপতি সব সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিলেও ২০১২ সালে সর্বশেষ কমিশন গঠন করা হয় সার্চ কমিটির মাধ্যমে। সে সময় প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসেন তত্কালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। এবারও সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের আভাস দিয়েছেন সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। আগেরবার ‘সার্চ কমিটি’র আহ্বানে আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল নতুন নির্বাচন কমিশনের জন্য তাদের পছন্দের ব্যক্তির নামের তালিকা জমা দিলেও বিএনপি দেয়নি। কিন্তু এবার এই ইস্যুতে বিএনপি পিছিয়ে থাকতে চায় না বলে তাদের বক্তব্যে মনে হচ্ছে।

বিভিন্ন কারণেই বিএনপিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রকৃতি ও কৌশল পরিবর্তন করতে হচ্ছে। বিএনপির এখনকার আন্দোলন হচ্ছে জনসংযোগের মধ্যে দলকে ধরে রেখে সংগঠনগুলো গোছানো ও শক্তিশালী করা। অতি দ্রুত সংগঠনগুলো গুছিয়ে গণসংযোগের মাত্রা বাড়াতে না পারলে বিএনপি আরো ভঙ্গুর অবস্থায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দল গোছানো কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রায় এক বছর আগে দলের সাংগঠনিক জেলাগুলোর কমিটি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিএনপির হাইকমান্ড স্বাক্ষরিত চিঠি পাঠানো হলেও এ পর্যন্ত মাত্র ১০টি জেলার কমিটি পুনর্গঠিত হয়েছে। এ অবস্থাকেও দলের জন্য অত্যন্ত শোচনীয় বিবেচনা করা যায়।

এখন নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুটি অনেক পেছনে। বিএনপিও বুঝে গেছে অযথা এমন দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করলে শক্তি অপচয় ছাড়া কিছু হবে না। কাজেই একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে যে স্বাধীন ও স্বচ্ছ নির্বাচন কমিশনের অধীনেই বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে হবে। কারণ ২০১৪ সালের মতো গোঁ ধরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকলে বিএনপির কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। অন্যদিকে সংসদের ভেতরে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি দ্রুত নির্বাচনের বিষয়ে মুখ না খুললেও নির্বাচন কমিশন গঠনে বিএনপির দাবির সঙ্গে একমত।

এখন সবার মনে একটি প্রশ্ন, ইসি পুনর্গঠনের পরও কি বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে রয়েছে। শুধু তাই নয়, সাংগঠনিকভাবে তারা এখন আর ‘শক্তিশালী’ নয়। তাদের এ অবস্থার শুরু মূলত ২০০৭ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর বিএনপি নেতাদের জেল-জরিমানা হয়। নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে দলের মাঝারি ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। এর পরও বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা-মামলার শিকার হন রাজনৈতিকভাবে। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপি প্রতিহত করার ঘোষণা দিলেও আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে নির্বাচন করতে সক্ষম হয় এবং আবার সরকার গঠন করে। সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া বিএনপি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে ‘জামায়াতের সঙ্গে’ আগুন-সন্ত্রাস শুরু করে। লাগাতার অবরোধের নামে নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালায় দলটি। এতে দলটির ভিত আরো নড়বড়ে হয়ে যায়। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট না করায় জনসমক্ষে স্বাধীনতার চেতনায় নিজেদের মাথা উঁচু করতে পারেনি।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ গত সাড়ে সাত বছর ক্ষমতায় থাকাকালে যেসব সংকট ও সমস্যা অতিক্রম করেছে, বিএনপি এর কোনোটিই কাজে লাগাতে পারেনি। বিএনপির এ দুর্বলতায় সরকার সেসব সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। সর্বশেষ জঙ্গি নিয়ে সংকটে পড়ার পরও কৌশলী সরকার সেটি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে বিএনপির যে অবস্থা, তারা এখন বিবৃতি, প্রেস রিলিজসর্বস্ব একটি রাজনৈতিক দল। শীর্ষ নেতৃত্বের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত বিএনপিকে দুর্বল, ভঙ্গুর ও পরমুখাপেক্ষী রাজনৈতিক দলে পরিণত করেছে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো বিএনপির জন্য কঠিন। তবু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় শরিক হয়ে নিজেদের অবস্থান মজবুত করা এবং দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এ জন্য বিএনপির হঠাৎ এমন কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না যা তাদের জন্য স্থায়ী সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইসি গঠন করা এবং সেই ইসির অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকেই এখন বিএনপির লক্ষ্য হওয়া উচিত। দেশের সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে স্বাধীন নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন মেনে নেওয়ার যে আশ্বাস বিএনপি দিয়েছে তা বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনীতির ধারায় অত্যন্ত ইতিবাচক।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com


মন্তব্য