kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাঠানকোট যেন ফিরে এলো উরিতে

অনলাইন থেকে

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



রবিবার কাশ্মীরের বারামুল্লা জেলায় উরির সেনা ছাউনিতে চার আত্মঘাতী পাকিস্তানি জঙ্গি নিকেশ হলো বটে, কিন্তু তার আগেই তাদের গুলি-গ্রেনেডে ভোরে শহীদ হয়ে গেলেন ১৭ জন সেনা। কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার না করলেও সেনার দাবি, চার জঙ্গি জইশ-ই-মুহাম্মদের সদস্য।

নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে, এই ফিদায়েঁ হামলায় ফের দিল্লির কাঠগড়ায় ইসলামাবাদই। পাকিস্তান অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সেই সঙ্গে বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি পাঠানকোট থেকে কোনো শিক্ষাই নেয়নি ভারতীয় সেনা? না হলে সন্ত্রাসবাদী হামলার সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও কেন জোরদার করা হয়নি সেনা ছাউনির নিরাপত্তা? সদুত্তর কিন্তু মেলেনি রবিবার রাত পর্যন্ত।

ঠিক কী ঘটেছিল রবিবার ভোরে?

তখনো আড় ভাঙেনি ভূস্বর্গের। ভোর সাড়ে ৫টা। ছাউনির ভেতরে অঘোরে ঘুমাচ্ছেন জওয়ানরা। হঠাৎই ভোরের স্তব্ধতা খান খান করে কান ফাটানো গ্রেনেডের শব্দ। সঙ্গে অ্যাসল্ট রাইফেলের মুহুর্মুহু গুলি। সেনাসূত্রে খবর, সশস্ত্র চার জঙ্গি চুপিসারে সেনা ছাউনিতে ঢুকেছিল ভোর ৫টা নাগাদ। একটি সূত্রের দাবি, অফিসারদের মেস তাদের আক্রমণের লক্ষ্য হলেও শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বদলে ব্যারাকে হামলা চালায় তারা। সংগৃহীত ডিজেল ‘ডাম্প’ লক্ষ্য করে চলে গ্রেনেড হানা। মাত্র তিন মিনিটে ১৭টি গ্রেনেড চার্জ। ১৫০ মিটার এলাকার সব কিছু ভস্মীভূত করে দিতে সেটাই যথেষ্ট ছিল। সেই এলাকায়ই ছিল একাধিক তাঁবু। ডোগরা রেজিমেন্টের হাত থেকে চার্জ হ্যান্ডওভারের আগে সেখানে ঘুমাচ্ছিলেন ৬ বিহার রেজিমেন্টের জওয়ানরা। সংবিৎ ফিরে পেয়ে জওয়ানরা যখন পাল্টা গুলি চালালেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চার জঙ্গির গ্রেনেডের আগুন গ্রাস করেছে ব্যারাকের বেশ কয়েকটি তাঁবুকে। ঘুমের রেশ কাটার আগেই জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মৃত্যু হলো ১৩ জন সেনার। যাঁরা বেরোতে গেলেন, তাঁদের মধ্যেও চারজন ঝাঁঝরা হয়ে গেলেন জঙ্গিদের গুলিতে। আহত অন্তত ২০, যাঁদের মধ্যে অধিকাংশেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক।

এর পরও ঘণ্টা তিনেক চলেছে গুলির লড়াই। সাড়ে ৮টা নাগাদ অপারেশন শেষ বলে ঘোষণা করেন সেনারা। সেনাদের তরফে জানানো হয়েছে, আক্রমণকারী চার জঙ্গিকেই নিকেশ করা গেছে। সেনা সূত্রে খবর, জঙ্গিদের কাছ থেকে চারটি একে-৪৭ রাইফেল, চারটি আন্ডার ব্যারেল গ্রেনেড লঞ্চারসহ রীতিমতো অস্ত্রভাণ্ডার উদ্ধার হয়েছে, যার অধিকাংশেই রয়েছে পাকিস্তানি ছাপ্পা। মিলেছে পশতু ভাষায় লেখা একটি ম্যাপও।

একটি সূত্রে শোনা যাচ্ছে, তিনটি দলে ভাগ হয়ে ফিদায়েঁ জইশ জঙ্গিরা নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে ভারতে ঢুকেছে। প্রথম দলটি ঢুকেছে পুঞ্চে, দ্বিতীয়টি হামলা চালিয়েছে উরি সেক্টরে, তৃতীয় দলটির গতিবিধির কোনো খোঁজ নেই এখনো।

কিন্তু এসবের মধ্যে যে প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে তা হলো, পাঠানকোটের বায়ুসেনা ঘাঁটিতে হামলার পর নিরাপত্তা ও নজরদারির যে ফাঁক সামনে এসেছিল, তার ভিত্তিতে কি আদৌ জোরদার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? উরির সেনা ছাউনিও তো নজরদারির অভাবেরই শিকার। শুধু তাই নয়, কাশ্মীর যখন প্রতিবাদ-বিক্ষোভে জ্বলছে, তখন এমন হামলার সতর্কবার্তা গোয়েন্দাদের কাছে আগেভাগে থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনিও নিরাপত্তার অভাবকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন, ‘এটা নিরাপত্তার ভয়াবহ গাফিলতি। কেন্দ্র পাঠানকোট হামলা থেকে কোনো শিক্ষাই নেয়নি। ’ তবে এসব প্রশ্ন ও সমালোচনা সন্তর্পণে এড়িয়ে ডিজিএমও জানিয়েছেন, গোয়েন্দা বিভাগ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। হামলার খবর পাওয়ার পর পরই সরজমিনে পরিস্থিতি বুঝতে উরিতে পৌঁছে যান সেনাপ্রধান জেনারেল দলবীর সিং সুহাগ। ক্ষণিকের মধ্যে পৌঁছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরও। আহতদের দেখতে শ্রীনগরের হাসপাতালে যান তিনি। খোঁজ নেন প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অশান্ত কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়েও।

তবে এ দিনের ঘটনার পর পাকিস্তানের ভূমিকা ছাপিয়ে গেছে নজরদারি ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থার গাফিলতিকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট করেছেন, ‘উরিতে এই কাপুরুষোচিত হামলা নিন্দনীয়। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এই জঘন্য হামলার পেছনে যারা রয়েছে, তাদের শাস্তি হবেই। ’ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ও পাকিস্তানকে সন্দেহ করে বলেছেন, ‘এ ধরনের হামলার কাছে ভারত মাথা নত করবে না। সন্ত্রাসবাদী ও তাদের মদদদাতাদের অসাধু চক্রান্ত ভারত নস্যাৎ করে দেবে। ’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং অবশ্য এত রাখঢাক করেননি। স্পষ্ট বলেছেন, ‘পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। তাদের চিহ্নিত করে একঘরে করে দেওয়া উচিত। ’ বিজেপি নেতা রাম মাধব তো একটি দাঁতের পরিবর্তে প্রতিবেশী দেশের পুরো চোয়ালটিই উপড়ে নেওয়ার পক্ষপাতী। রাজনৈতিক বিভাজন না রেখে হামলার নিন্দায় একাট্টা হয়েছে সরকারবিরোধী সব পক্ষই। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার, সিপিএমের সীতারাম ইয়েচুরি—সমালোচনায় মুখর হয়েছেন সবাই। এর মধ্যেই আবার মোদি সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছে জোটসঙ্গী শিবসেনা। রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় রাউতের কথায়, ‘এখন আর কথাবার্তা নয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে কড়া পদক্ষেপের সময়। এই হামলা বন্ধ না হলে লোকে এই সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ’ ভারত-পাকিস্তানের এই সম্পর্কে হতাশ জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। তাঁর আক্ষেপ, ‘এই ধরনের হিংসা কাশ্মীরে যুদ্ধের মতো পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। ক্ষতবিক্ষত, অশান্ত ভূস্বর্গ আরো বেশি করে রক্তাক্ত হচ্ছে। ’

পাকিস্তান অবশ্য এই ঘটনায় তাদের কোনো ভূমিকার কথা অস্বীকার করেছে। তাদের বিদেশ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা যুক্ত, তার কী প্রমাণ পেয়েছে ভারত। অকারণে আমাদের কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে। ’ ২১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ জাতিসংঘে বক্তব্য রাখবেন। তার আগে এই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরো ক্ষতিকর হলো বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল। তাদের মতে, যেখানে দুই দেশের কথাবার্তার মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, সেখানে এ ধরনের ঘটনা নিশ্চিতভাবেই বড় বাধা।

 

সূত্র : এই সময় অনলাইন থেকে সংকলিত

 


মন্তব্য