kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বদলে যাওয়া জীবনধারা

ড. হারুন রশীদ

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বদলে যাওয়া জীবনধারা

প্রযুক্তির চরম উত্কর্ষের এ যুগে বিশ্বে যেমন সব কিছু দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তেমনি এই বদলের হাওয়া লেগেছে গ্রাম পর্যন্ত। এখন সেই গ্রাম আর নেই।

শিক্ষাদীক্ষা, মানুষের চিন্তাচেতনা, আচার-অনুষ্ঠান, রাজনীতি—সব কিছুতেই পরিবর্তনের একটা ঢেউ লেগেছে। চোখে পড়ার তো বিষয় হচ্ছে গ্রামীণ জীবনযাত্রা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নাগরিক মানুষ যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে গ্রামে বসেও এখন তার অনেকটাই ভোগ করা যাচ্ছে অনায়াসে। বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ, টেলিভিশন, তাতে ডিশ লাইন। ফ্রিজ আছে প্রায় সবার বাড়িতেই। রান্না হচ্ছে রাইস কুকারে বিদ্যুতের মাধ্যমে। টিউবওয়েলের মধ্যে মোটর লাগিয়ে ট্যাংকে পানি ওঠানো হচ্ছে। সেখানেও বিদ্যুৎ। এখন টিপ দিলেই পানি পড়ে। কষ্ট করে টিউবওয়েল চাপতে হয় না। বলতে গেলে জীবনযাত্রা অনেকটাই সহজ হয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে বিদ্যুতের ব্যবহার। আগে শুধু বাতি জ্বালতেই বিদ্যুতের ব্যবহার ছিল। এখন বিদ্যুৎ নানা কাজে ব্যবহূত হচ্ছে। এই জন্য বর্তমান সরকারের আমলে রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উত্পাদন করেও কুলানো যাচ্ছে না। দিন যত যাচ্ছে মানুষের সব রকম চাহিদার সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে এবং এটাই স্বাভাবিক।

মানুষ এখন অনেক বেশি রাজনীতিসচেতন। বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন তো আছেই, হাটবাজারের দোকানে, এমনকি চায়ের স্টলে ডিশের লাইনসহ টেলিভিশন। চা খাওয়ার পাশাপাশি টিভি দেখে সময় কাটায়। বেশির ভাগই সিনেমার দর্শক। তবে এর মধ্যে বিশাল একটি অংশ আবার টিভি টক শোর দারুণ ভক্ত। রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কী সবই তাদের জানা চাই, বোঝা চাই। সর্বশেষ খবর জানার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত জেগে অনেকেই টিভি দেখেন। জঙ্গি তত্পরতা, মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে কি না, যুদ্ধাপরাধের বিচার শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, জামায়াত নিষিদ্ধ হবে কি না, বিএনপি কি শেষ পর্যন্ত জামায়াতকে ছাড়বে, কবে আন্দোলনে যাবে বিএনপি, এরশাদ কী করবেন শেষ পর্যন্ত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ান তাঁরা।

ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন শুভেচ্ছা পোস্টারে ছেয়ে গেছে চারদিক। দলের মূল নেতার ছবি এক কোনায় দিয়ে নিজের ছবি বড় করে দিয়ে ছাপানো রঙিন পোস্টার দেখলে মনে হয় দেশে নির্বাচনী আমেজ বইছে। নির্বাচন অনেক দেরিতে থাকলেও এরই মধ্যে নির্বাচন নিয়ে নানা হিসাব শুরু হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দলের নেতারা মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে থাকার জন্য গণসংযোগ শুরু করে দিয়েছেন। সংসদের বাইরের বিরোধী দল বিএনপির নেতাকর্মীরা মাঠ দখলের চেষ্টা করছেন।

যাই হোক, এলাকার ছাত্রদের একটা বিরাট অংশ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকেই আবার কলেজের গণ্ডিতেই এখনো পা রাখেনি। স্কুলজীবন থেকেই রাজনীতির খাতায় নাম লিখিয়েছে। দলে দলে মোটরসাইকেল নিয়ে তারা ঘুরে বেড়ায়। চুলে বিশেষ ধরনের ছাঁট। পোশাকে একটা আলট্রামডার্ন ভাব। নেতারা তাদের মাঠে নামিয়ে দিয়েছেন। যতটা রাজনীতির দিকে তাদের আগ্রহ, ঠিক ততটাই অনাগ্রহ পড়াশোনার দিকে। এলাকার সার্বিক পড়াশোনার মান ভালো নয়। বিশেষ করে স্কুলগামী ছাত্ররা রাজনীতির খাতায় নাম লেখানোয় পড়াশোনায় ভাটা পড়েছে। বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতে নানা ধরনের সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু দূষিত রাজনীতির বিষবাষ্প অনেকটাই সেই সাফল্য ম্লান করে দিচ্ছে। অন্যভাবে বলতে গেলে এই সাফল্য আরো বেশি হতে পারত যদি ছাত্ররা অধ্যয়নকেই তপস্যা হিসেবে নিত। কিন্তু নেতার নামে স্লোগান দিলে টুপাইস পাওয়া যায়। এলাকার টেন্ডার, চাঁদাবাজিতে ভাগ বসানো যায়—এসব কারণে এ ধরনের ছাত্ররা এখন পড়ালেখার চেয়ে রাজনীতির দিকেই বেশি আগ্রহী। তারা কোনো আদর্শ দ্বারা তাড়িত নয়। নগদ প্রাপ্তির আশায় তারা রাজনীতি করে, দলবাজি করে। তরুণ প্রজন্মের একটা বিশাল অংশকে এই সর্বনাশা প্রবণতা থেকে ফেরাতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ আরো জটিল-কঠিন হয়ে উঠবে। এ ছাড়া মাদক একটি বিরাট সমস্যা। এলাকায় মাদকবিরোধী প্রশাসনিক তত্পরতা থাকলেও মাদকের বিস্তার থেমে নেই। অনেক রাঘববোয়ালই নাকি এর সঙ্গে জড়িত। ফলে শর্ষেতে ভূত থাকলে ভূত তাড়ানোর সম্ভাবনা কম। তাই এ বিষয়ে প্রশাসনিক তত্পরতা আরো বাড়াতে হবে। যত প্রভাবশালীই হোক না কেন মাদকের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না।

রাজনীতির মূল বিষয় হচ্ছে মানুষের কল্যাণচিন্তা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম সব সময় সমাজের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর থাকে। কিন্তু এখনকার তরুণদের মধ্যে যারা রাজনীতি করে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, তাদের অনেকের মধ্যেই এই প্রতিবাদী মানসিকতা নেই। ১০০ ছেলে মিলে এক নেতার পক্ষে স্লোগান দিতে লোকের অভাব হবে না। কিন্তু একটা ভালো কাজে একজনকেও খুঁজে পাওয়া ভার। তারা পড়াশোনার প্রতি দারুণভাবে উদাসীন। ক্লাব, সমিতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিতেও তাদের আগ্রহ কম। একটা লাইব্রেরি চালাতে গিয়ে দেখেছি হাতের কাছে বই পেয়েও খুব কম ছেলেমেয়েই তার সুযোগ নিচ্ছে। অথচ ছোটবেলায় একটি গল্প-উপন্যাসের বইয়ের জন্য আমরা উন্মুখ হয়ে থাকতাম।

আরেক যন্ত্রণা মোবাইল ফোন। তাতে ক্যামেরা থাকায় সেটি আরো বাড়তি বিড়ম্বনার কারণ হয়েছে। অনেকেই এর অপব্যবহার করছে। তরুণদের জীবনের মূল্যবান সময়ের একটা বিশাল অংশ কেড়ে নিচ্ছে মোবাইল ফোন, ফেসবুক, ইন্টারনেট। এর সঙ্গে পয়সাও যাচ্ছে। যে তরুণ এক পয়সাও রোজগার করতে পারে না সে মাসে শত শত টাকা ব্যয় করছে ফোনে, ইন্টারনেটে। আবার প্রায় প্রত্যেকেই মোটরসাইকেল চালায়। সেটা আবার বাবার পয়সায়। বাবা না হয় মোটরসাইকেলটা কিনে দিলেন, কিন্তু তেল কেনার জন্য আবার ওই দলে ভিড়তে হয়। যে দল যত বেশি তেল দেবে সেই দলেই সুড়সুড় করে ভিড়ে যাবে মেরুদণ্ডহীন তারুণ্য।    

এভাবে রাজনীতি ক্রমেই মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে। অথচ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে আমরা দেখতে পাই ছাত্রজীবন থেকেই কতটা সমাজসচেতন ছিলেন তিনি। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে তিনি দ্বিধা করতেন না। কলেজে পড়ার সময় তিনি তাঁর নিজের রুমটি ছেড়ে দিয়েছিলেন অন্য ছাত্রদের থাকার জন্য। এই ত্যাগী মানসিকতার পরিচয় জীবনে তিনি বহুবার বহুভাবে দিয়েছেন। এভাবেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তিনি। বর্তমান প্রজন্ম ত্যাগ স্বীকার করতে ততটা প্রস্তুত নয়। আসলে সর্বত্র রাজনৈতিকীকরণের নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতিতে রাজনীতিই হয়ে উঠেছে সব কিছুর নিয়ন্ত্রক। এ জন্য গ্রামের একটি স্কুলপড়ুয়া ছাত্রও রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর নেতারাও তাকে সানন্দে দলে ভিড়িয়ে নেন দল ভারী করার জন্য।

আমাদের রাজনীতিও কি সঠিক পথে চলছে? ‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ’র মতো রাজনীতিও কি তার পথ হারায়নি? নইলে এত রক্ত, এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত একটি দেশের রাজনীতিকরা কেন অযথা হিংসা-হানাহানিতে লিপ্ত। কেন দেশের কল্যাণচিন্তার চেয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে। রাজনীতিকে কেন ব্যবহার করা হয় ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে। বঙ্গবন্ধু তো রাজনীতির জন্য মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। এই ৪৫ বছরে আর একটিও উদাহরণ কেন পাওয়া গেল না?

কেন আজ রাজনীতিকদের মধ্যে ক্ষমতালিপ্সু মানসিকতা—এ প্রশ্ন সবার মধ্যেই। রাজনীতি থেকে আদর্শবাদ প্রায় লুপ্ত হতে বসেছে। পরমতসহিষ্ণুতা, সমঝোতার রাজনীতি আজ নেই বললেই চলে। এখনো আমাদের রাজনীতি ঘুরপাক খায় কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে—এই কেন্দ্রেই। রাজনীতিবিদরা এতটাই অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার মধ্যে বাস করেন যে তাঁরা নিজেরাও নিজেদের বিশ্বাস করতে পারেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি তো এই অবিশ্বাসেরই ফল। ক্ষমতায় যাওয়া হচ্ছে মানুষের সেবা করার সুযোগ পাওয়া। সেই সুযোগ পেতে এত জোরজবরদস্তি কেন? মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতির প্রচার নিয়ে একটি প্রচলিত কৌতুক আছে। এক লোক কিছুতেই অহিংস নীতিতে বিশ্বাস স্থাপন করছিল না। তো একদল লোক তাকে নানাভাবে বোঝাল। কিন্তু লোকটি অনড়। শেষে একদল সশস্ত্র লোক তার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বলল, ‘বল, তুই অহিংস নীতিতে বিশ্বাস করিস কি না। ’

এটি নিছকই একটি গল্প। আমাদের দেশের রাজনীতির অবস্থা আজ এমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতির মূল লক্ষ্য যদি দেশসেবা হয় তাহলে সেই সেবক হওয়ার জন্য তো এত কূটকৌশলের প্রয়োজন পড়ে না। মানুষই তো তাদের ‘সেবক’ নির্বাচন করবে। এই নিয়মতান্ত্রিকতার পথে চললে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে। তাহলে ‘বল আমাদের সেবক নির্বাচন করবি কি না’—জনগণের ঘাড়ে ভোটের বন্দুক ঠেকিয়ে এ ধরনের জোরজুলুমেরও দরকার হবে না। মানুষজনকেও রাজনীতির কূটকৌশলের জাঁতাকল থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে।

কী পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে কিংবা ক্ষমতায় থাকা না থাকার ইস্যুগুলোই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রাধান্য পাওয়ার ফলে জনস্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে। সমঝোতার পরিবর্তে বৈরিতাই স্থান করে নিচ্ছে রাজনীতিতে। এ অবস্থা দেশকে এক সংকটজনক অবস্থায় নিপতিত করছে। কিন্তু এ অবস্থা কারো কাম্য হতে পারে না। জনকল্যাণের রাজনীতিই সবার প্রত্যাশা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে জনকল্যাণই ছিল মুখ্য বিষয়। তাঁকে হত্যার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে যে বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। হীনস্বার্থ নয়, হরতাল-সংঘাত, সহিংসতা-বৈরিতা নয়। একটি সুখী-সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শুধু দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের রক্তঋণ শোধ করা সম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলোকে এ ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছাতেই হবে।

 

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট   

harun_press@yahoo.com


মন্তব্য