kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


১০ টাকা কেজির চাল যেন দরিদ্ররাই পায়

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



১০ টাকা কেজির চাল যেন দরিদ্ররাই পায়

কোরবানি ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে ৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুড়িগ্রামের চিলমারীতে অনুষ্ঠিত এক সুধীসমাবেশের মাধ্যমে হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে ১০ টাকা মূল্যে পরিবারপ্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল বিক্রির একটি কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। সরকার দরিদ্রদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটি চালু করেছে।

দেশের ৫০ লাখ পরিবারের মধ্যে বছরে সাড়ে সাত লাখ টন চাল ১০ টাকা কেজিতে বিক্রির যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এটি দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে একটি চমৎকার কার্যক্রম। বছরে দুবার অর্থাৎ মার্চ-এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর-নভেম্বর মিলিয়ে মোট পাঁচ মাস দরিদ্র পরিবারগুলো এই সুবিধা পাবে। প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী, বিধবা এবং নারীনির্ভর দরিদ্র পরিবারগুলো এই সুবিধা লাভে অগ্রাধিকার পাবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের এই কর্মসূচির সাফল্যের ওপর বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনের অগ্রযাত্রা দ্রুততর হওয়া নির্ভর করছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আবার ব্যর্থতার মতো কিছু ঘটলে উল্টো প্রতিক্রিয়াও ঘটতে পারে। সে কারণে শুরু থেকেই সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে, পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সফল হবে—সেটিই সবার কামনা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে ইতিবাচক কিছু দিকের ওপর দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, যে সময়টি ১০ টাকা মূল্যে চাল বিতরণের জন্য নির্ধারণ করেছে সরকার, সেটি যথার্থ হয়েছে। কোরবানির ঈদের আগে মাত্র ১০ টাকা দরে ৩০ কেজি চাল ঘরে তুলতে পেরে পরিবারগুলো নিশ্চয়ই দারুণভাবে উপকৃত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বেশ কিছু অঞ্চলে চালের দাম একটু বাড়ন্ত থাকে, একইভাবে মার্চ-এপ্রিলে বোরো ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তেও চালের দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকে। সে সময় এসব পরিবার মাত্র ১০ টাকা কেজিতে চাল কিনতে পারলে পরিবারগুলোর হাতে যে অর্থ সাশ্রয় হবে তাতে তারা অনেকটাই উপকৃত হবে। তৃতীয়ত, যে  অঞ্চলটিকে দিয়ে চাল বিক্রি শুরু করা হয়েছে তাকে একসময় মঙ্গাপীড়িত অঞ্চল বলা হতো। গত সাত বছর ‘মঙ্গা’ শব্দটিই দেশে শোনা যায়নি। অথচ এর আগে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়িত মানুষের কষ্টের কথা পত্রপত্রিকায় এই সময় এতটাই উঠে আসত যে অনেক সময় রিলিফ বিতরণেরও প্রয়োজন দেখা দিত। সেই মঙ্গাপীড়িত এলাকায় এখন দুর্ভিক্ষ নেই সত্য, তবে বেশ কিছু দরিদ্র পরিবার এই অঞ্চলে এখনো রয়েছে, যাদের জীবন-জীবিকার উন্নতি আগের চেয়ে ভালো হলেও দারিদ্র্য দূর হয়ে গেছে এমনটি দাবি করা যাবে না। নানা আর্থিক টানাপড়েনে বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং নারী শ্রমনির্ভর পরিবারগুলোকে চলতে হয়। দেশের অন্য অঞ্চলে পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি ঘটলেও কিছু কিছু হতদরিদ্র মানুষ তো সেখানেও বসবাস করছেই। বিশেষত প্রতিবন্ধী, বিধবা এবং নারী শ্রমনির্ভর পরিবারগুলোতে অভাব-অনটন থাকা মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। বাংলাদেশে ২৩ শতাংশ মানুষের জীবনে এখনো দারিদ্র্য রয়েছে, আমরা তাদের জীবন থেকে এই অভিশাপ দূর করতে পারিনি। অথচ বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে এরই মধ্যে পদার্পণ করেছে। আগামী চার-পাঁচ বছরে পুরোপুরি মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। সে ক্ষেত্রে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচের দিকে রেখে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশের ধারণা পরিহাস সূচকই মনে হবে। এ ছাড়া ২০৩০ বা ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণেও আমরা সফল হব না, যদি আমাদের সমাজের নিচের অংশে থাকা হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবস্থান নাজুক থেকে যায়। সে কারণেই দ্রুত সমাজের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। সুখের বিষয়, শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি বর্তমান সময়ে ধরতে বা উপলব্ধি করতে পেরেছেন, দরিদ্রবান্ধব একটি কার্যক্রমের অধীনে ৫০ লাখ মানুষকে মাত্র ১০ টাকা কেজিতে চাল কেনার সুযোগ করে দিয়েছেন। বাজারে যে চাল ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি হয়, তা যদি দরিদ্র মানুষগুলো মাত্র ১০ টাকায় কিনতে পারে, তাহলে তাদের পরিবারে নগদ অর্থ সাশ্রয় করার একটি ব্যবস্থা থাকবে, উদ্ধৃত্ত অর্থ দিয়ে কাপড় কেনাসহ খাদ্যসামগ্রী তথা মাছ, মাংস, শাকসবজি খাওয়ার সুযোগ ঘটবে। তাতে তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সুতরাং সরকার পুরো বিষয়টি অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করেই গ্রহণ করেছে তা স্পষ্ট বোঝা গেল। এখানেই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ১০ টাকা কেজি চালের কার্যক্রম স্বচ্ছ থাকবে কি? তা আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে অনেকের মনেই কিছু সন্দেহ এবং শঙ্কার জন্ম নিতে শুরু করতে পারে। সেই দোষ তাদের দিয়ে লাভ নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, এ ধরনের গরিববান্ধব অনেক কর্মসূচিই শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। না পারার কারণ হচ্ছে দুর্নীতি। আমলা বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং তাদের চারপাশে যাঁরা থাকেন, তাঁরা প্রায়ই দরিদ্রের হকে ভাগ বসাতে দ্বিধা করেন না। গরিবের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ অথবা খাদ্যদ্রব্য ওজনে কম দেওয়া বা মোটেও না দেওয়ার মতো ঘটনা কোথাও কোথাও ঘটেছে। সরকার অনেক মহৎ উদ্যোগ নিলেও স্থানীয় প্রশাসন, দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই লুটপাট করা, নয়ছয় করার নানা ছলচাতুরী করে থাকে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষমতা ও অর্থবিত্ত নেই। তাই তাদের বঞ্চিত করার মানসিকতা প্রশাসন ও ক্ষমতাবানদের মোটেও কম নয়। সেখানেই মস্ত বড় বিপদ। এখানে যেহেতু কম মূল্যে চাল বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে, তাই স্থানীয় পর্যায়ে ডিলারসহ নানা গোষ্ঠীর লোলুপদৃষ্টি হয়তো পড়েও যেতে পারে। যেন তা ঘটতে না পারে সেটি কড়া নজরদারিতে রাখা অপরিহার্য। তা ছাড়া প্রকৃত প্রতিবন্ধী, বিধবা এবং নারী শ্রমনির্ভর পরিবারগুলোকে বাদ দিয়ে কেউ যেন নিজেদের পরিচিত অথবা টাকার বিনিময়ে রেশন কার্ড দেওয়ার চেষ্টা না করতে পারে সেদিকে সতর্ক নজর রাখতে হবে। প্রকৃতই যারা এই কর্মসূচির আওতায় আসার জন্য যোগ্য, তাদেরই কেবল রেশনের কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে—এটি নিশ্ছিদ্র করতে হবে। দল, মত, ধর্ম, জাতিগত ও সম্প্রদায়গত পরিচয় যেন কারো অধিকার কেড়ে না নিতে পারে, প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত না করে সেদিকে নজর দিতেই হবে। আমাদের সমাজে মিথ্যায় অভ্যস্ত মানুষের সংখ্যা মোটেও কম নয়। এখানেও যেন সেই অপশক্তি ঢুকতে না পারে, লুটপাটের কোনো সুযোগ না পায়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট মহলকে দৃষ্টিতে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, সরকারের এমন কর্মসূচি সফল হলে ৫০ লাখ পরিবারে কম করে হলেও দুই থেকে তিন কোটি মানুষ রয়েছে, যারা সরাসরি উপকৃত হতে পারবে।

অন্যদিকে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে যদি বড় ধরনের কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রকৃত হতদরিদ্রদের বঞ্চিত করার অভিযোগ ওঠে, সেটি যদি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে শেখ হাসিনার সরকারের ভাবমূর্তি সমাজের নিম্নস্তরের দিকে বড় ধরনের ধাক্কা খাবে, ধসও নামতে পারে। সুতরাং মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো পরস্পরবিরোধী দুই অবস্থা নিয়ে এই কর্মসূচির সাফল্যের যেমন একটি বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব সমাজজীবনের নিচের দিকে এমনকি ওপরের দিকেও পড়ার সুযোগ রয়েছে, একইভাবে সরকার এবং দলগতভাবে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তিও তাতে উজ্জ্বল হতে পারে, আবার স্খলন ঘটলে সরকারের প্রতি নেতিবাচক প্রভাবও বিস্তার করতে পারে। সরকারের জন্য এই কর্মসূচি সফল করার মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ একই সঙ্গে উপস্থিত হয়েছে। যেহেতু এই হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগের অবস্থান ও বসবাস গ্রামেগঞ্জে, তাই সেখানে ১০ টাকা কেজি মূল্যে চাল বিক্রির কর্মসূচি সফল করা মোটেও সহজ কাজ নয়। স্থানীয় প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব উপলব্ধি করার লোকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সে কারণে নজরদারিটা দায়িত্বশীল প্রশাসনকে তাদের মতো করে একসঙ্গে নিতে হবে, অন্যদিকে দলীয় হাইকমান্ডের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মাঠপর্যায়ের অবস্থা পরিবীক্ষণ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ওঠা এবং প্রমাণিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম কার্যকর করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে ১৯৯৮ সালে দেশব্যাপী ২০ শতকের ভয়াবহতম বন্যা এবং বন্যা-পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সরকার যেভাবে খাদ্য, শস্যবীজসহ নানা ধরনের সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে পৌঁছে দিতে পেরেছিল, সেই অভিজ্ঞতা এবং সাফল্যের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। সেই সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকার যেমন সফল হয়েছিল একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও উপকৃত হয়েছিল। এসব সংকল্প ছাড়াও বৃদ্ধ ভাতা, খাদ্য সহযোগিতা, একটি বাড়ি একটি খামারসহ বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার সরকার অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়েছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীরা তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, তার পরও শেখ হাসিনার তিন মেয়াদের সরকারের সময় দেশের দরিদ্রবান্ধব যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার ফলে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার রাজনৈতিক মিশন-ভিশন অনেকটাই সফল হচ্ছে। বাংলাদেশ এত অল্প সময়ে আর্থিক এবং সামাজিক খাতে অন্যদের রোল মডেল হওয়ার মতো প্রশংসা কুড়িয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতিও অর্জন করেছে। আমার ধারণা, ১০ টাকা কেজিতে চাল কেনার সুযোগটি সফল হলে শেখ হাসিনার হাত ধরে দেশ সামগ্রিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার কৃতিত্বও দাবি করতে পারবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মাঠ প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে কতটা বণ্টন ও নজরদারির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, তা তারাই ভালো বলতে পারবে। একই সঙ্গে গোটা আওয়ামী লীগ এবং তাদের তৃণমূল সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিকে সফল করতে কতটা আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসবে, তার ওপরই এর এবং সরকারের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে। দেশবাসী সেটিই দেখতে চায়, পেতে চায়।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

patwari54@yahoo.com


মন্তব্য