kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য

ভেনিজুয়েলায় সংকট মানে কিন্তু ‘পতন’ নয়

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ভেনিজুয়েলা। নিউ ইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, সিএনএনসহ বিশ্বের তাবৎ করপোরেট মিডিয়া ও বিভিন্ন দেশে তাদের সহোদররা মারাত্মক চিন্তিত শাভেজের দেশকে নিয়ে।

তারা ও তাদের ক্যামেরা ভেনিজুয়েলার ঘরে ঘরে নাকি খুঁজে পাচ্ছে একবেলা খেয়ে থাকার গল্প। অর্ধসত্য, যা মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর।  

ভেনিজুয়েলার চলতি আর্থিক সংকট নিয়ে চালানো হচ্ছে বিকৃত প্রচার। বিরোধী দক্ষিণপন্থী ও নেপথ্যে থাকা ওয়াশিংটন যার মূল হোতা। এ কথা ঠিকই যে মুদ্রাস্ফীতি, মাঝেমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্রয়োজনীয় জোগানের অভাব, সুপার মার্কেটগুলোর সামনের লম্বা লাইন ও নিয়ন্ত্রিত মূল্যের জিনিসপত্রের কালোবাজারির ফলে ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকট হয়েছে এবং যাকে কেন্দ্র করে বিরোধীরা সরাসরি দায়ী করতে চেষ্টা করছে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর সরকারকে। কিন্তু এই সংকটগুলোর মানে এই নয় যে দেশে ‘ভয়ানক দুর্ভিক্ষ’, ‘মানুষজন আধপেটা খেয়ে রোজ মৃত্যুর দিকে ঝুঁকছে’, ‘চিড়িয়াখানার পশুরা না খেতে পেয়ে মরে যাচ্ছে’! এগুলো হলুদ সাংবাদিকতার নিদর্শন।

গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা পেয়ে এখন বিরোধীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভেনিজুয়েলায়। ১৬ বছর পর শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তনের সুযোগ ব্যবহার করে দেশকে অস্থিরতার অন্ধকারের আবর্তে আবার টেনে আনতে তারা সচেষ্ট। লক্ষ্য মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে, ভেনিজুয়েলাকে লাতিনের মূলধারার স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে তেলসমৃদ্ধ এই দেশকে লুট করা।

শাভেজের শেষ নির্বাচনের সময় থেকেই দেশে অনেক অস্থিরতা ছিল। শাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরোর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের সময়ও দেশে বিভিন্ন জটিলতা ছিল। ওয়াশিংটনের লাগাতার চেষ্টা যেমন ছিল তেমনি সরকারি কিছু ব্যর্থতাও দায়ী ছিল প্রেসিডেন্ট পদে মাদুরোর ভোট কমার পেছনে। আমলাতন্ত্রের জটিলতা ও দুর্নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। ক্ষোভ ছিল লাগাতার দুষ্কৃতকারীদের অপরাধের বাড়বাড়ন্তেও। প্রতিবছর শুধু কারাকাসেই খুনের ঘটনার গড় ছিল প্রায় ২০ হাজার। উল্টো দিকে এগুলোর সঙ্গে সঙ্গে দেশের সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির জেরে এক ধাক্কায় দারিদ্র্যও কিন্তু নেমে এসেছিল ৫ শতাংশে।

আর এখন বর্তমানের মূল সংকট অর্থনৈতিক। তার সঙ্গে প্রশাসনিক।  

দেশে উত্পাদনের প্রায় ৭৫ শতাংশেরই মালিকানা এখনো ব্যক্তি নিয়ন্ত্রিত সংস্থার। করপোরেট নিয়ন্ত্রিত সংস্থা বিশেষ কয়েকটি পণ্যের জোগান প্রায়ই কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে এগুলোর চাহিদা হয়ে উঠছে আকাশছোঁয়া। আর তার দায় চাপানো হচ্ছে মাদুরো সরকারের ওপর। যাতে দেশে তৈরি করা যায় অস্থিরতা, এমনকি হিংসারও বাতাবরণ। বছরতিনেক আগে যখন শাভেজ দুরারোগ্য অসুখে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি, ঠিক তখনই দুধ, চিনি, কর্নফ্লাওয়ার ও পুষ্টিকর কয়েকটি খাবার প্রায়ই উধাও হতে দেখা যেত। কয়েক দিন টানা বাজারে থাকার পর হঠাৎ দেখা দিত অমিল। সে থেকেই এ ষড়যন্ত্রের শুরু।

এখন এসব জিনিস উধাও হচ্ছে সেই সময়ের তুলনায় আরো বেশি সময় ধরে। মজার কথা, আগের মতোই ভেনিজুয়েলায় যখন বাজারে দুধ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে ঠিক তখনই বাজারে থাকছে প্রচুর পরিমাণে দই, চিজসহ দুধ থেকে তৈরি সামগ্রী! যত ইচ্ছা কিনতে পারেন। এমন অসংখ্য নজির তুলে ধরা যায়, যা প্রমাণ করছে মাদুরো সরকারের বিরোধিতায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কিভাবে এই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ভেনিজুয়েলায় অস্থিরতা গড়ে তুলতে তত্পর। যেমন—এই জুন মাসেই একজন সমাজকর্মী মারিয়াম গিমেঞ্জ এক সাক্ষাত্কারে বলছেন, ‘গত ডিসেম্বরে শাভেজের দলের সংসদ নির্বাচনে হারের প্রধান কারণ ছিল দেশজুড়ে কালো বিন্সের (সবজি) অভাব। মানুষ হন্যে হয়ে খুঁজেও গোটা দেশে কোথাও এই সবজি পায়নি। আবার নির্বাচনের ফল বেরোনোর পরই এই সবজিতে বাজার ছেয়ে গেল। ‘ আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। গত বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর ভেনিজুয়েলায় ৯ হাজারের বেশি চিকনগুনিয়া রোগী শনাক্ত করা হয়। মশাবাহিত এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিস্তীর্ণ অংশে। এ সময় চিকিৎসার জন্য জরুরি হয়ে ওঠে ‘অ্যাসিটামিনোফেন’ (প্যারাসিটামল)। এ সময়ই চক্রান্ত করে বাজার থেকে এই ওষুধটি সরিয়ে ফেলা হয়। ৭০ শতাংশ করপোরেট নিয়ন্ত্রিত ভেনিজুয়েলার বাজারে জীবনদায়ী ওষুধের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতেও হাত কাঁপেনি বিরোধীদের, যে চক্রান্ত পরবর্তীকালে ফাঁস হয়ে যায়।

শুনতে হাস্যকর লাগলেও ভেনিজুয়েলায় এ রকম নোংরা খেলায়ই মেতেছে ওয়াশিংটনের মদদে বিরোধী দলের জোট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে বলছেন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’। ঠিক এ রকম অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালিয়েই সত্তরের দশকে চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে শেষ করে দিয়েছিলেন নিক্সন ও কিসিঞ্জার। তাই আমেরিকার এই ছক নতুন নয়।   

জীবন ধারণের মৌলিক সামগ্রীর মূল্য ভেনিজুয়েলায় সরকার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বাজারে নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের জোগান স্বাভাবিক রাখাটা সরকারের এক বড় দায়িত্ব। ২০১৩ সালে এই উদ্দেশ্যে ভেনিজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে মূল্য নিয়ন্ত্রণে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অথচ বেসরকারি ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্যের তুলনায় ২০০ শতাংশের বেশি দামে সেই সময় বাজারে জিনিসপত্র বিক্রি করতে শুরু করে। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চক্রান্তও পরে প্রমাণিত হয়। এভাবেই ক্রমাগত মাদুরো সরকারের জনমুখী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে একের পর এক অন্তর্ঘাত।

দেশে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে তেলের দামের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজারে তেলের ঊর্ধ্বমুখী দামের ফলে সরকারি কোষাগারও ভর্তি হয়; আর সেসব লভ্যাংশ থেকে দেশে নানা জনমুখী কর্মসূচি রূপায়ণ করেন শাভেজ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, খাদ্যের অধিকার সুনিশ্চিত হয় দেশে। বর্তমানে অর্থনীতির হিসাবে দেশে তেল বিক্রি থেকে উপার্জন কমেছে ৬০ শতাংশ। যদিও উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিও তখন থেকেই বাসা বাঁধতে শুরু করে, যেটি শাভেজও ঠিকমতো দূর করতে পারেননি। কিন্তু শাভেজের সময় যে দুর্নীতি ছিল একাংশের মধ্যে, সেটি এখন সর্বগ্রাসী হয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। মাদুরোর জয়লাভকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে যে যুক্তিহীন বিরোধিতায় নামে বিরোধী দলের জোট, তারাই এসব কালোবাজারির নেপথ্যে। আর সঙ্গে এ কথাও ঠিক দেশের প্রশাসন এদের রুখতে ব্যর্থ। এখন যে রকম বিক্ষোভ, ধরনা চলছে, ঠিক এ রকম ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতেও ঘটেছিল, প্রায় ৪৫ জনের মৃত্যু হয় সংঘর্ষে। আর প্রতিবারই এ ধরনের বিক্ষোভে আমেরিকা উল্লাস প্রকাশ করেছে এবং সরাসরি বিক্ষোভকারীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কারণ এসব বিক্ষোভের আসল অর্থদাতা ওয়াশিংটনই।

তেলের দাম নিম্নমুখী, অর্থনৈতিক যুদ্ধ, আমেরিকার ষড়যন্ত্র এগুলো ছাড়াও বর্তমান ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকটের আরো একটি প্রধান কারণ হলো, দেশের টাকা ডলারে পরিবর্তনের তিন রকম বিনিময় রেট। ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতি ১০ বলিভারে এক ডলার রেট। এর নাম ‘ডিপ্রো’ রেট। এই রেটের সুবিধা ভোগ করেন খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য আপত্কালীন দ্রব্যাদি আমদানির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা। আবার অব্যবসায়ী সাধারণ মানুষের জন্য এই রেট প্রতি ৬০০ বলিভারে এক ডলার। আর সর্বশেষ রেটটি হলো কালোবাজারির রেট, প্রতি এক হাজার ২০০ বলিভারে এক ডলার। কোথায় ১০ বলিভার আর কোথায় এক হাজার ২০০ বলিভার! দেশের পুলিশ, মিলিটারি ও সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত লোকজনও আবার সরকারি নিয়মে পদাধিকারবলে ১০ বলিভারেই এক ডলার পেতে পারেন। এতে আরো ফুলেফেঁপে উঠেছে কালোবাজারি। কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা, পুলিশ সরাসরি নিজেদের টাকা খুব সহজেই একেবারে ১২ গুণ করে নিচ্ছে এর সাহায্যে। দেশের মুদ্রা নিয়ে কালোবাজারিদের ফুলেফেঁপে ওঠা মানেই দেশের অর্থনীতির ওপর বিপুল চাপ আসে। মুদ্রাস্ফীতির কোনো লাগাম নেই। অর্থনীতি বেহাল। মাদুরোর অতিরিক্ত সেনানির্ভরতার ফলেও এই দুর্নীতিতে ঠিকমতো লাগাম পরানো যাচ্ছে না।    

ওয়াশিংটনের নির্দেশে দেশের বিরোধীরা যে করেই হোক জানুয়ারির আগে দেশে গণভোট করিয়ে দিয়ে মাদুরোকে সরিয়ে ফেলতে উদ্যোগী। তারা ২০১৯ সাল পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে রাজি নয়।

এমনিতেও আমেরিকা ভেনিজুয়েলার দখল চায়। স্বাভাবিক। কারণ ভেনিজুয়েলা মানে শুধু পশ্চিম গোলার্ধের একটি দেশ নয়। ভেনিজুয়েলা মানে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডার। ভেনিজুয়েলা মানে দুনিয়ার বৃহত্তম তেলভাণ্ডার। তাই প্রতি মুহূর্তে প্ররোচনা। দেশজুড়ে হিংসাত্মক প্রতিবাদে প্রায় প্রায়ই পথে নামছে বিরোধীরা। তাই মাদুরোর সামনেও চ্যালেঞ্জ সফল ‘প্রশাসক’ হওয়ার। দেশে সংকট আছে, তবে সেটা সমাধানযোগ্য। সংকট আছে কিন্তু সেই সংকট আদৌ ‘পতনের’ নয়, বরং আরো একবার ঘুরে দাঁড়ানোর।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনীতিবিদ


মন্তব্য