kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চাষযোগ্য জমির উর্বরতা শক্তি নিয়ে ভাবতে হবে

এ এম এম শওকত আলী

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চাষযোগ্য জমির উর্বরতা শক্তি নিয়ে ভাবতে হবে

গত মৌসুমে বোরো শস্যের উত্পাদন হ্রাস পেয়েছে। এ খবর ১১ সেপ্টেম্বর একটি দৈনিকে প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশে যে তিন ধরনের ধান উত্পাদন করা হয় তার মধ্যে বোরোর অবদানই সর্বাধিক। এক হিসাবে মোট চাল উত্পাদনের ৫৫ শতাংশ। এ খাদ্যশস্যের উত্পাদন হ্রাস পেলে আশঙ্কার কথা। কারণ এর ফলে খাদ্য ঘাটতি হতে পারে। প্রকাশিত সংবাদে অর্থবছর ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ের উত্পাদিত চালের পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে। এ লেখচিত্রে দেখা যায় যে গত বছরের তুলনায় মোট উত্পাদন হ্রাস পায়নি, যদিও বোরো চাল উত্পাদন অর্থবছর ২০১৫ সালের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। সার্বিক উত্পাদন শেষোক্ত অর্থবছরে তিন কোটি ৪৭ লাখ দশমিক ১ ছিল সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের মোট উত্পাদন সমান। এর কারণ আমন চালের উত্পাদন পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও আউশের উত্পাদন অর্থবছর ২০১৫ সালের তুলনায় সামান্য কম হয়। বোরো উত্পাদন অর্থবছর ২০১৬ সালে হ্রাস পাওয়ার মূল কারণ আকস্মিক বন্যা ও বোরো জমির পরিমাণ হ্রাস। তবে হেক্টরপ্রতি গড় উত্পাদন হ্রাস পায়নি। এ ব্যাখ্যা বিবিএসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার। বোরো শস্যের জমি হ্রাস হওয়ার কারণ কৃষকরা অধিকতর লাভজনক শস্য উত্পাদনে আগ্রহী। চালের কেজিপ্রতি মূল্য গত কয়েক বছর থেকেই স্থিতিশীল। সরকারসহ অনেকে এ বিষয়টি কৃষি ও খাদ্যনীতির সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত করে। অন্যদিকে কৃষকরা মনে করে যে চাল উত্পাদন আর লাভজনক নয়। কারণ উৎপাদন খরচ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

খাদ্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে মোট চাল উত্পাদনকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ চাষযোগ্য জমির ৭০ শতাংশেরও বেশি পরিমাণ জমিতে চাল উত্পাদন করা হয়। এ ছাড়া চাল অর্থাৎ ভাত বাংলাদেশিদের প্রধান খাদ্য। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার মতে, আউশের উত্পাদন হ্রাস পাবে। যেমন—বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ। সংবাদে আরো বলা হয় যে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মতে, আমনের চাষ বৃদ্ধি পাবে। কারণ রোপা এখনো শেষ হয়নি। তবে এ অভিমতও সোজা হিসাব বলে গণ্য করা যায়। কারণ কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, সেপ্টেম্বর ১৫ তারিখের পর রোপা আমনের হেক্টরপ্রতি উত্পাদন হ্রাস পাওয়ার কথা। এ অভিমত বিজ্ঞানসম্মতই নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ। হেক্টরপ্রতি উত্পাদন হ্রাস পেলে জমির পরিমাণ বাড়লেও মোট উত্পাদন কম হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এ ছাড়া রয়েছে অন্য একটি নীতিগত প্রশ্ন। তা হলো বোরো উত্পাদন সেচনির্ভর। এ দেশে সেচযোগ্য জমির পানির উেসর বেশির ভাগই ভূগর্ভস্থ। স্মরণ করা যায় যে আশির দশকের মধ্যবর্তী সময় থেকেই অত্যধিক মাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কারণ এর ফলে মরুকরণ দ্রুততর হবে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কৃষকদের জন্যও এ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে। কারণ অগভীর নলকূপের ব্যবহার আগে যত সহজ ছিল তার ঠিক বিপরীত চিত্র দৃশ্যমান হয়। অর্থাৎ এসব পাম্পে যে স্বল্প গভীরতায় সহজে পানি সংগ্রহ সম্ভব ছিল তা আশির দশকের মধ্য ভাগ থেকেই সম্ভব হয়নি। এর ফলে কৃষকদের আরো গভীরে পাম্প বসাতে হয়। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এ বিষয়টি দৃশ্যমান। ওই সময় এ অঞ্চলের বগুড়া ও রাজশাহী জেলায় অনেক অগভীর নলকূপ পানি তুলতে সক্ষম হয়নি। এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়।

সরকার গঠিত এ কমিটির অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে অন্যতম সুপারিশ ছিল দুই ধরনের নলকূপ; অর্থাৎ গভীর ও অগভীর নলকূপের ব্যবহার কার্যকর করার লক্ষ্যে একটি থেকে অন্যটির দূরত্ব সম্পর্কিত আইন করতে। এ লক্ষ্যে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারসংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশের খসড়াও প্রণীত হয়। কিন্তু খসড়াটি অঙ্কুরেই প্রত্যাখ্যান করতে সরকার বাধ্য হয়। কারণ বিভিন্ন বিদেশি সাহায্যদাতা সংস্থা এর তীব্র বিরোধিতা করে। তাদের উন্মুক্ত অর্থনীতিতে অন্ধবিশ্বাস ছিল। এরপর আর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। যা হয়েছে তা হলো, নীতিমালা প্রণয়ন ও কৃষকদের মধ্যে এ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচি।

বিগত ২০ বছরের ফসল উত্পাদনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বছরওয়ারি উত্পাদনের পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধি হয়। এ ধারা যেমন বোরো ফসলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, একইভাবে অন্যান্য ফসলের প্রতিও প্রযোজ্য। বিভিন্ন কারণে এটা হয়ে থাকে। এক. কোন ফসল ফলানো হবে সে বিষয়ে কৃষকের সিদ্ধান্ত। কৃষক সাধারণত অধিকতর লাভজনক ফসলের জন্য আগ্রহী; দুই. মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ যেমন সার ও বীজের সঠিক মাত্রায় ব্যবহার। প্রয়োজনে পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করা; তিন. নিয়মমাফিক মাঠের ফসলের পরিচর্যা করা; চার. ফসল উত্পাদনের জন্য অনুকূল আবহাওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং পাঁচ. বোরোসহ অন্যান্য শীতকালীন ফসলের উপযুক্ত সেচের ব্যবস্থা করা। আমনের ক্ষেত্রে জমির আর্দ্রতা পরীক্ষা করে প্রয়োজনে সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা করা। সবশেষে বলা যায় যে সত্তরের দশক থেকেই সবাই অধিক ফসল ফলানোর জন্য কথা বলেছেন। দুটি বিষয় এ ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়েছে। এক. বিরামহীন ফসল উত্পাদনের কারণে চাষযোগ্য জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস এবং দুই. কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের জন্য কৃষকবান্ধব প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। এখন সময় এসেছে এ দুটি বিষয়ে যথাযোগ্য গুরুত্ব প্রদান করা।

এসবের সঙ্গে অন্য একটি বিষয়ও জড়িত। ফসল বৈচিত্র্যকরণ। ফসল বৈচিত্র্যকরণের জন্য যে ৭০ শতাংশ জমিতে খাদ্যশস্য উত্পাদন, মূলত চাল করা হয়, তা হ্রাস করতে হবে। হ্রাস করলে চাল উত্পাদনও কমে যাবে। বোরো ও অন্যান্য রবিশস্য প্রায় একই সময়ে চাষ হয়। পরস্পরবিরোধী এ ধরনের বাধ্যবাধকতার জন্যও বৈচিত্র্যকরণের লক্ষ্য ব্যাহত হয়। এ ক্ষেত্রে অন্য বাধা হলো উপযুক্ত উচ্চ ফলনশীল বীজ ও যোগ্য প্রযুক্তির অভাব। অন্যদিকে চাল উত্পাদনের ক্রমবর্ধমান ধারা কিছু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যারও সৃষ্টি করতে পারে। ২০০০ সালে প্রকাশিত এক গ্রন্থে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গত তিন দশকে হেক্টরপ্রতি ফলন বৃদ্ধির কারণেই চাল উত্পাদনের বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে, জমির পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য নয়। বোরোর সঙ্গে একই সময়ে আউশও বোনা হয়। এ ছাড়া রয়েছে পাট। এ দুটি ফসলও বৃষ্টিনির্ভর। আউশের কৃষকরা অধিক ফলনশীল বোরোর প্রতি আগ্রহী হওয়ায় আউশের চাষ হ্রাস পেয়েছে। এ ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীরা একটি শব্দ প্রায়ই বলেন। তা হলো ‘ব্রাউস’। দীর্ঘমেয়াদে বোরো চাষের ধারা অব্যাহত না থাকার অন্য আশঙ্কা হলো ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতি নির্ভরতা। এ উেসর পানির পরিমাণও হ্রাস পাচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরো হ্রাস পাবে। পরিবেশও বিপন্ন হবে।

এসব বাস্তবতা মোকাবিলার জন্য ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৌশল চিহ্নিত করা হয়। এ কৌশল ছিল ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর বোরো এলাকায়, বিশেষত উত্তরাঞ্চলে আউশ ও আমন চাষের এলাকা বাড়াতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষকদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থাও করে। মূলত প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ অনুদান হিসেবে বিলি করা। বাস্তব অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন। আউশের ক্ষেত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি, আর হলেও তা নগণ্য। এ পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে আউশের মোট উত্পাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে মূল বাধা এ ফসলের জন্য উপযুক্ত উচ্চ ফলনশীল বীজের (উফশী) অভাব। এ বিষয়টি সম্পূর্ণ নিশ্চিত না করতে পারলে আউশের ফলন বৃদ্ধি হবে না। তবে আমনের ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। মূল কারণ উফশী বীজের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বাড়ানো হয়েছে। আমনের ক্ষেত্রে উফশী বীজের ব্যবহার অধিকতর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কারণ বোরোর তুলনায় এ খাদ্যশস্যে উফশী বীজের ব্যবহার অনেক কম।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


মন্তব্য