kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনের গন্তব্য

ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনের গন্তব্য

২৩ জুন ২০১৬ তারিখ ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা-না থাকা নিয়ে যে গণভোট হয়ে গেল তাতে না থাকার পক্ষ ৫১.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়লাভ করে। ১৯৫৭ সালে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আবির্ভাব হলেও ব্রিটেন এর সদস্য হয় সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে অর্থাৎ ১ জানুয়ারি ১৯৭৩ সালে।

কমিউনিটি থেকে কমন মার্কেট হয়ে ইউনিয়নে রূপান্তরিত হয়েছে, একক মুদ্রা ইউরো হয়েছে। অথচ ব্রিটেন এর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও একক মুদ্রা গ্রহণ করেনি, নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে অর্থাৎ পাউন্ড-স্টার্লিং বিলুপ্ত করেনি। সদস্য সংখ্যা ৬ থেকে ২৮ হয়েছে, যার মধ্যে ২৭টি দেশই নিজস্ব মুদ্রা বিলোপ করে ইউরোকে গ্রহণ করেছে। একমাত্র যুক্তরাজ্য তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অর্থাৎ তারা ইউরোপীয় ইন্টিগ্রেশনে বিশ্বাস করে না। তারা ইউনিয়ন চায়, অথচ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চায়, যা ইউনিয়নের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ব্রিটেনের এক ধরনের অবিশ্বাস তথা আস্থার সংকট কখনো মুছে গেছে বলে মনে হয়নি।  

অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাজ্য অদূর ভবিষ্যতে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সার্বিকভাবে যুক্তরাজ্যের প্রস্থানে সবারই ক্ষতি, তবে এককভাবে ব্রিটেনের ক্ষতি অনেক বেশি হবে। কারণ স্বাভাবিকভাবে ব্রিটেন প্রস্থানের পরে আর অবাধ বাণিজ্যের সুবিধাসহ উন্মুক্ত শ্রমবাজারের সুবিধা পাবে না। ব্রিটিশরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় কাজ করছে জার্মানিতে। ওখানে কর্মরত ব্রিটিশরা ইতিমধ্যেই উদ্বেগের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বলা যায়। অন্যদিকে ব্রিটেনের কৃষি, শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে কর্মরত ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের, বিশেষ করে নতুন সদস্য হওয়া ১৩টি দেশের নাগরিকরা বেশ শঙ্কার মধ্যে আছে। লন্ডনের ‘দি ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’-এর গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে আগামী চার বছরে যুক্তরাজ্যে মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদন ৬ শতাংশ হ্রাস পাবে এবং বেকারত্ব বর্তমানের ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে। এমনিতেই যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের, বিশেষ করে জার্মানি ও ফ্রান্সের শিল্পজাত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছিল না, তার মধ্যে ব্রেক্সিট তার শিল্পের জন্য অশনিসংকেত দিচ্ছে। সার্বিক বিচারে যুক্তরাজ্য অর্থনৈতিকভাবে একা হয়ে গেল।

অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবেও ব্রিটেন একা হয়ে যাবে। কারণ এমনিতেই সে অন্যদের অনাস্থায় আছে। দীর্ঘমেয়াদে এর আরো অবনতি হবে। ইউনিয়নের জন্মলগ্ন থেকে ব্রিটেনের আচরণ অন্য সদস্যদের মধ্যে অনাস্থার জন্ম দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপে অনাস্থা ও অবিশ্বাসকে পেছনে ফেলে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ১৯৫৭ সালে ঐতিহাসিক রোম চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হয়। শার্ল দ্য গলের মৃত্যুর পর ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য পদ লাভে সমর্থ হয়। রাজনৈতিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইস্যুকে ব্যবহার করে ডেভিড ক্যামেরন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হলেন বটে, কিন্তু মেয়াদ পূর্তির আগেই তাঁকে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট ছাড়তে হলো। তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন, এমপি পদও ছাড়ছেন। অক্টোবরে নতুন প্রধানমন্ত্রী আসবেন। ক্ষমতার লড়াইয়ে অপকৌশল প্রয়োগ করে ক্যামেরন শুধু নিজের সর্বনাশ ডেকে আনেননি, তিনি বিভক্ত ব্রিটেনকে আরো একবার বিভক্ত করেছেন। স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ড স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে বিগত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকে আবির্ভূত উগ্র জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল, অভিবাসীবিরোধী শক্তি ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ইউনিয়নের অন্যান্য দেশেও তা ছড়িয়ে পড়বে। অভিবাসীবিরোধী আন্দোলনসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

লেখক : সাবেক সভাপতি, অর্থনীতি বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য