kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এপার-ওপার

স্বপ্নের সমাধি সিঙ্গুরে

অমিত বসু

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



যেখানে যা, সেখানে তা। প্যারিসে প্রেম, হলিউডে অ্যাকশন।

মার্শাল আর্টে জ্যাকি চ্যান অস্কার জিতলেও প্যারিসের রাস্তায় পা রাখতে নারাজ। জানেন, সেখানে তাঁর জারিজুরি খাটবে না। ১৯৬৭ সালে বাঙালি পরিচালক শক্তি সামন্ত শাম্মী কাপুর শর্মিলা ঠাকুরকে প্যারিসে নিয়ে গিয়ে ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’-এর শুটিং করেছিলেন। ছবি সুপার ডুপার হিট। প্যারিসে প্রেম। মার খাওয়ার চান্সই নেই। সে কথা মাথায় রেখে করণ জোহর, রণবীর কাপুর-আনুশকা শর্মাকে নিয়ে ‘আই দিল হ্যায় মুশকিল’ ছবির শুটিং সারলেন প্যারিসেই। ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’-এর রিমেকই বলা যেতে পারে। কুশীলব কেবল আলাদা। শাম্মীর জায়গায় তাঁর নাতি রণবীর। নায়িকা ক্রিকেটার বিরাট কোহলির প্রণয়ী আনুশকা শর্মা। আনুশকা জানিয়েছেন, ছবিতে রণবীরের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করাটা যে সত্যি নয়, কোহলি জানে। তাহলে আর কী। ল্যাঠা চুকেই গেল। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। কোনো মহিলা ফ্যান কোহলির কাছে ঘেঁষলে আনুশকা কিন্তু ছেড়ে কথা বলেন না। কোহলির সব লজিক ছুড়ে ফেলে মারমুখী হয়ে ওঠেন। ওভার পজেসিভ হলে যা হয় আর কি। ঠিক একই রকম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তুলনাহীন দখলদারি। এক সেন্টিমিটার জমি ছাড়তে নারাজ। আনুশকার মানবজমিন কোহলি, মমতার সিঙ্গুর। মা মাটি মানুষের, স্লোগানে মাটিতে আধিপত্য। শিল্পায়ন শিকেয়। টাটার মোটর কারখানা ন্যানোতে নয়। গাড়ি হতে হতেও হলো না। ফিরে এলো চাষবাস। ন্যানোর জায়গায় ধান। সঙ্গে আলু, করলা, লাউ, ঢেঁড়স। চাষিদের মাথায় হাত। ভেবেছিল, সিঙ্গুর শিল্পনগরী হবে। টাটার কারখানায় কাজ পাবে তাদের ছেলেরা, কাদামাটি মেখে মাঠে মাঠে জীবন কাটবে না। খড়ের চালের বাড়ি ভেঙে পাকা বাড়ি উঠবে। সচ্ছলতায় ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হবে। তাদের সন্তানরাও স্যুট পরে কাচের ঘরে বসবে। গাড়ি ছুটিয়ে যাবে শপিং মলে। চুটিয়ে মার্কেটিং করে কেনাকাটার আশ মেটাবে। মমতা জানিয়ে দিলেন, এসব স্বপ্ন দেখা পাপ। চাষার আবার আশা কিসের। চাষির ছেলে চাষি হবে। ফসল হলে খাবে, নইলে না খেয়ে মরবে। পয়সা থাকলে ঘর ছাইবে। নয়তো ঘরে বসে বৃষ্টিতে ভিজবে। অসুখ করলে হেলথ সেন্টারে যাবে। ওষুধ পেলে ভালো। না পেলে বাঁচা-মরাটা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেবে। কী করবে বলো। জন্মেছ চাষির ঘরে। জ্বালা যে পেতেই হবে।

ন্যানো কারখানা চোখের সামনে সিঙ্গুর ছেড়ে উড়ে গেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাটের সানন্দায়। গাড়ি তৈরি হতেই বাজারে। সব রাজ্যের রাস্তায়ই ন্যানো। সিঙ্গুরেও ঘুরপাক খাচ্ছে। গ্রামবাসী ভাবছে, আহা, এটা তো আমাদেরই তৈরি করার কথা ছিল। যদি করতাম, গাড়ির মতোই গতি পেত আমাদের জীবন। আর্থসামাজিক ছবিটা পাল্টাত। সিঙ্গুরের বৈভবে কলকাতাও লজ্জা পেত।

সিঙ্গুরে ভোট চাষে সফল তৃণমূল। ২০১১ সালে জিতেছে। ২০১৬ সালেও জয় এসেছে। নির্বাচিত বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য জিতেও চিন্তিত। মানুষকে ভুল বুঝিয়ে বেইমানি করা হলো না তো। শিল্পায়ন হলে তাদের জীবনধারা যে অন্য খাতে বইত, সেটা তো নিশ্চিত। মনের কথা মুখ ফুটে বলতে পারছেন না মমতার ভয়ে। ঘনিষ্ঠদের শুধু চুপি চুপি বলছেন, শিল্পায়নের দরকার ছিল। দেয়ালেরও কান আছে। মমতার কানে সে কথাও পৌঁছেছে। মন্ত্রিসভা থেকে বাদ রবীন্দ্রনাথ। শিক্ষকজীবনে ছাত্রদের শাস্তি দিয়েছেন। নিজে কোনো দিন শাস্তি পাননি। এবার পেলেন। কৃষকদের উন্নতির কথা ভাবার শাস্তি।

সিঙ্গুর বিচারে সুপ্রিম কোর্টের ডিভিএম বেঞ্চের দুই বিচারপতি ডি গোপাল গৌড়া, অরুণ মিশ্র দ্বিধান্বিত। ভাবনায় ব্যবধান। ৩১ আগস্ট ঘোষিত রায়ে বিচারপতি গৌড়া জানিয়েছেন, টাটা মোটরসকে জমি দেওয়াটা জনস্বার্থ হতে পারে না। বিচারপতি মিশ্রের মত, সিঙ্গুরে কারখানা হলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতো। পশ্চিমবঙ্গ সরকার মানে আগের বামফ্রন্ট সরকার বড় ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প গঠন করতে চাইছিল, যাতে আরো শিল্প সংস্থা চলে আসে। অন্যান্য রাজ্যেও এই পথ নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন এ লক্ষ্যেই জমি অধিগ্রহণ করেছে। সুতরাং ‘জনস্বার্থে’ ওই জমি অধিগ্রহণ হয়েছে বলাই চলে। বিচারপতি মিশ্র যুক্তির সমর্থনে অসংখ্য রায়েরও উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রায়ও আছে। মিশ্রের মন্তব্য, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের উপকারই হতো। স্বাভাবিক  কাজের পরিস্থিতি না থাকায় প্রকল্পটি অন্য রাজ্যের হাতে চলে গেছে। তাই জমি ফেলে না রেখে সংবিধানের ১৪২ ধারা অনুযায়ী জমির মালিকদের সেটা ফেরত দেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

এ ছাড়া উপায়ই বা কী। অধিগৃহীত জমি এখন  ধু ধু মরুভূমি। এলাকাটাও তো কম নয়। ৯৯৭.১১ একর। জমি মালিকদের সবাই না হলেও বেশির ভাগই টাকা নিয়ে জমি দিয়েছিলেন। ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট ভোটে জিতে ক্ষমতায় ফেরার পরই জমি নেওয়া শুরু। চাষের জমি ভরাট করে কারখানার শেড বানিয়ে প্রাথমিক কাজও চালু হয়ে যাওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আন্দোলনে নামেন। ধর্মতলায় ২৬ দিন অনশন করেন; যদিও সেটা সম্পূর্ণ উপবাস ছিল না বলে তৃণমূল দলছুটদের দাবি। মমতার অনশন মঞ্চের পেছনে একটি ঘর করা হয়েছিল। মমতা মঞ্চ থেকে নেমে বারবার সেখানে যাচ্ছিলেন। কী করেছেন জানার উপায় নেই। ঘটনা যা-ই হোক, সিঙ্গুরে শিল্পায়ন বন্ধের আন্দোলন যে সফল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শিল্পায়ন হলোই না জমি আর পড়ে থাকে কেন, সুপ্রিম কোর্ট রায়ে জানিয়েছেন, জমি ফেরত দিতে হবে মালিকদের। সে কাজটি ইতিমধ্যে মহা আড়ম্বরে সম্পন্ন করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের রায় থেকে কতটা রাজনৈতিক ফায়দা তোলা যায় তা-ই নিয়ে তৃণমূল ব্যস্ত। এই রায়কে ঐতিহাসিক বলে বিজয় উৎসব শুরু করেছে। বিষয়টিকে স্কুলের সিলেবাসে ঢোকানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে শিশুরাও বুঝতে পারে, শিল্প বন্ধ করে মমতা বাঙালির কতটা উপকার করেছেন। নন্দীগ্রামে শিল্প পরিকল্পনা শুরুতেই শেষ। সিঙ্গুর অনেকটা গড়িয়ে খাদে। দুই জায়গায় জমি-আন্দোলনেই মমতার মাথায় জয়ের মুকুট। মমতা জানেন, শিল্প করা মানেই জমি অধিগ্রহণের দায়িত্ব। বিস্তর জটিলতা। ভোট হারানোর শঙ্কা। তার চেয়ে যেমন আছে থাক। গ্রামজীবন যেমন চলছে চলুক। অনুদান দিয়ে তাদের খুশি রাখলেই হলো।

প্যারিস যেমন প্রেমনগর, সিঙ্গুর তেমন চাষবাসের গ্রাম। পরিবর্তন করতে গেলেই গোলমাল। মমতা শুধু বামফ্রন্ট সরকারের পরিবর্তন চেয়েছিলেন। সেটা হয়েছে। তাঁরা ক্ষমতায় এসেছেন। দ্বিতীয়বার ক্ষমতাতেও ফিরেছেন। আর তো কোনো পরিবর্তনের দরকার নেই। ক্ষমতায় থাকতে শিল্পায়নের স্বপ্ন সমাধিস্থ হলে ক্ষতি কী।

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য