kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আহমদ রফিক শ্রদ্ধাভাজনেষু

করুণাময় গোস্বামী

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আহমদ রফিক শ্রদ্ধাভাজনেষু

আহমদ রফিক ৮৭ বছর পূর্ণ করে ৮৮তে পা রাখলেন। জীবনের যে পথে তিনি এগোলেন, সে পথে তাঁর জীবনকে কেন্দ্র করে শতবর্ষের দিকে এগোচ্ছেন।

আহমদ রফিক সুস্থ আছেন, তাঁর স্মৃতিশক্তি প্রখর, ভাবনাশক্তি উজ্জ্বল, নিজের চিত্তবৃত্তিকে বহুভাবে প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর বিন্দুমাত্র আলস্য নেই, উৎসাহের অভাব নেই, বয়সের ভার বলে একটা কথার প্রচলন আছে, তাঁর বেলায় সেটি একেবারেই ছায়া ফেলতে পারেনি। সে যে আমাদের কত বড় সৌভাগ্য বলে বোঝানের মতো নয়। শতবর্ষের কথা বলছিলাম। আর ১২ বছর পরই আহমদ রফিক শতবর্ষী হবেন। তিনি শতায়ু পার হয়ে আমাদের সামনে উজ্জ্বল বর্তিকা হয়ে থাকবেন, চিন্তার সমুজ্জ্বলতায়। আহমদ রফিক বাংলা ভাষায় একজন শ্রেষ্ঠ লেখক, শ্রেষ্ঠত্বের একটি পরিমাপ তিনি নিজের কাজকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। আহমদ রফিক বলতেই চিন্তার একটি দৃশ্যপট আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়। সেটিই তাঁর পরিমাপ। সেখানেই বিশেষভাবে তাঁকে পাওয়া যায়। সেখানেই তিনি আহমদ রফিক। সেখানেই রয়েছে অখণ্ড মনুষ্যবাদ ও আন্তর্জাতিকতা। সেখানে রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ যে রয়েছেন সেটাই সেখানকার বড় বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়।

যে শতবর্ষ আহমদ রফিকের সঙ্গী, সে এক ভয়ংকর সময় পৃথিবীর ইতিহাসে। অভাবনীয়ভাবে ভয়ংকর। ভয়ংকরতা সর্বকালেই ছিল। মানুষের জীবন গোলাপশয্যা ছিল না কখনো, মানুষের হাঁটাপথ কদাপি কেকওয়েকের মতো ছিল না। এগুলো মানুষের স্বপ্ন থেকে আহরণ করে আনা শব্দ সমারোহ। পথ দেখায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সে পথকে গভীরভাবে প্রসারিত করে। সে হচ্ছে নিষ্ঠুরতার বিশ্বায়ন। এর আগে নিষ্ঠুরতা ছিল আঞ্চলিক। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ হয়েছে তো ইন্দোনেশিয়ায় খবর হয়নি। পলাশীর আমবাগানে যুদ্ধ হয়েছে তো চারপাশের কৃষকদের মধ্যে চঞ্চলতা দেখা যায়নি। বিজ্ঞানের অভাবিত উত্কর্ষ বিশ্বব্যাপী একটি প্রলয়কাণ্ড সূত্র গেঁথে দিয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যবাদের বিশ্বায়ন। মুক্ত বাণিজ্য কারো জন্য মুক্তি, কারো জন্য গলার কাঁটা, মুনাফা করার মতো যাদের কোনো দ্রব্য নেই। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উগ্রবাদ। ধর্ম কোথায় মানুষকে শান্তি দেবে, মানুষকে মিলতে বলবে, মানুষকে কল্যাণে-অকল্যাণে পার্থক্য করতে বলবে, সে না হয়ে কিছু লোক ধর্মের নামে নিষ্ঠুরতার পরাকাষ্ঠা দেখাচ্ছে। মারণাস্ত্র থেকে রেহাই নেই, ছোবল থেকে রেহাই নেই, ঘৃণা থেকে রেহাই নেই, বিবাদের নতুন নতুন অভিব্যক্তি থেকে রেহাই নেই, উগ্রবাদের নতুন নতুন সংক্রমণ থেকে রেহাই নেই, মানুষ এখন কী করবে, কোথায় আশ্রয় তার। আশ্রয়ের সন্ধানে গিয়ে হাজার হাজার মানুষ সাগরে ডুবে মরছে। সে হতবুদ্ধি হওয়ার মতো বিশ্বপরিস্থিতি। আহমদ রফিক এই বিশ্বপরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতটিকে অন্তরে ধারণ করে অগ্রসর হচ্ছেন। শুরুতেই তিনি রবীন্দ্রনাথকে অন্তরে ধারণ করে নিয়েছেন, বিশ্বকবিকে নেবেন, বিশ্বকে নেবেন না সে হতেই পারে না। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক যন্ত্রণা। ভারতবর্ষ ভাগ হলো ১৯৪৭ সালে। দাঙ্গায় দাঙ্গায় ছারখার হয়ে গেল উত্তর ভারত। জন্মভূমিত্যাগী হিন্দু-মুসলমানের আকুল কান্নায় ছাপিয়ে উঠল আকাশ। ১৯৭১ সালে ঘটল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার আরেক ছবি আঁকা হলো দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে। ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করল পাকিস্তানি বাহিনী, অগণিত নারীর সম্ভ্রমহানি করল তারা। এ সবই ধ্বনিত-পুনর্ধ্বনিত হচ্ছে আহমদ রফিকের চিত্তলোকে। রবীন্দ্রনাথ এসবকে পর্যবেক্ষণ করার মতো পথদৃষ্টি দিয়েছেন তাঁকে। তাই তিনি দিয়ে থাকেন।

আমি ১৯৬৫-৬৬ সাল থেকে ডা. আহমদ রফিককে জানি। সে জানার শেষ নেই। নতুন নতুন করে জানছি তাঁকে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না। আহমদ রফিককে জানাও ফুরাবে না। বিশেষ করে এত বিস্ময় তিনি রচনা করেন তাঁর অনুধাবনের বিষয়বৈচিত্র্য দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের মতোই, যতই তিনি এগোচ্ছেন নতুন নতুন করে দেখছেন, নতুন নতুন করে ইন্টারপ্রেট করছেন। আহমদ রফিক জীবনসন্ধানী, জীবন যাপনের উপায়গুলো প্রশস্ত করে তোলার পক্ষে নিয়ত কাজ করছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ধর্মই মানুষের মিলনের একমাত্র সেতু নয়। আহমদ রফিক রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সেই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হয়েছেন, যেগুলো আমাদের মিলিত করে, প্রগতির পথ প্রশস্ত করে। তিনি প্রগতিবাদী চিন্তাবিদ। তিনি কবিতা লিখেছেন, গদ্য লিখেছেন। গদ্যই সমধিক। রবীন্দ্রনাথ নিয়েই সমধিক। তাঁর লেখায় সেই রবীন্দ্রনাথ উজ্জ্বলিত হয়ে ওঠেন, যিনি বাসযোগ্য অর্থাৎ নির্মাণে অবিরাম সংগ্রামী। সেই সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করছে তাঁর চিন্তা ও রচনা। সম্প্রতি তিনি রবীন্দ্রজীবন ব্যাখ্যানে প্রবৃত্ত হয়েছেন। আবদুশ শাকুর শুরু করেছিলেন রবীন্দ্রজীবনী, প্রকাশক বাংলা একাডেমি। শাকুর মারা গেলেন দুই খণ্ড লিখেই। আহমদ রফিক তিন খণ্ডে সে কাজ শেষ করে দেবেন বলে বলেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে তৃতীয় খণ্ড এর মধ্যে বের হয়ে গেছে। কাজটি চমত্কার হয়েছে বলে আমি শুনেছি। রবীন্দ্রসাহিত্য, রবীন্দ্রজীবনদর্শন ও রবীন্দ্রচিত্রকলা তত্ত্ব ব্যাখ্যার সঙ্গে রবীন্দ্রজীবনীকার অভিধাটিও আহমদ রফিকের নামের সঙ্গে যুক্ত হলো।

আমি ঢাকা থেকে অনেক দূরে বসে আহমদ রফিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। তিনি শতায়ু পার হোন, আমাদের নতুন নতুন কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করুন। তাঁকে সশ্রদ্ধ নমস্কার জানাই।

লেখক : শিক্ষাবিদ


মন্তব্য