kalerkantho


জাল নোট এবং কোরবানির বাজার

কারার মাহমুদুল হাসান

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জাল নোট এবং কোরবানির বাজার

প্রতিবছর কোরবানির ঈদ সামনে রেখে জাল নোটের উদ্ভব, বিকাশ ও তাণ্ডবের ক্রমবিস্তৃতির খবরাখবর পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এবারও একই ধাঁচের আলামত দৃশ্যমান। ঈদকে কেন্দ্র করে মার্কেট, বিপণিবিতান ও পশুর হাটে এরা ভয়ংকর ফাঁদ ফেলে। জানা যায়, এবারের ঈদে রাজধানীতে এসব চক্র প্রায় ১০ কোটি টাকার এবং রাজধানীর বাইরে শতাধিক চক্র প্রায় ৪০ কোটি টাকার জাল নোট বিক্রির টার্গেট নিয়ে মাঠে নেমেছে। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ওই প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের কাছে জাল নোট চলে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও চিন্তিত। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কেউ এ চক্রের সঙ্গে যুক্ত আছে কি না তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর পল্টন, কোতোয়ালি ও লালবাগ থেকে এ চক্রের ১০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে এক কোটি ১৫ লাখ ৭৭ হাজার টাকার জাল নোট উদ্ধার করেছে পুলিশ। খবরে আরো বলা হয়, এই চক্রটি পুলিশকে জানিয়েছে যে এরই মধ্যে তারা দুই থেকে তিন কোটি টাকার জাল নোট রাজধানীর বাজারে ছেড়েছে। আরো সাত থেকে আট কোটি টাকার জাল নোট বাজারে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

সাম্প্রতিক এক খবরে দেখা যায়, গ্রেপ্তারকৃত নোট জালিয়াতচক্রের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিবির একজন সহকারী পরিচালক একটি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়েছেন। যাতে বলা হয়েছে, জালিয়াতচক্রের সদস্যরা তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জাল নোট বাজারজাত করে। তিন ধাপে এসব জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দেয়। প্রথম ধাপে জাল মুদ্রা নোট প্রস্তুতকারীরা পাইকারি বিক্রেতার কাছে এক হাজার টাকার নোটের একটি বান্ডিল (এক লাখ টাকা) ৪০-৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে। দ্বিতীয় ধাপে পাইকারি কারবারিরা আবার এসব টাকা খুচরা কারবারির কাছে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করে। তৃতীয় ধাপে খুচরা কারবারিরা এসব টাকা নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে। অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, বৃদ্ধা, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের লোকেরাই হচ্ছে নোট জালকারীদের মূল টার্গেট। উল্লেখ্য, পুলিশের দেওয়া তথ্য বিবরণীতে দেখা যায়, গত এক বছরে কামরাঙ্গীরচর থানায় তিনটি, গুলশান থানায় একটি, বংশাল থানায় একটি, সবুজবাগ থানায় একটি, ভাটারা থানায় একটি, রমনা মডেল থানায় দুটি, শেরেবাংলা নগর থানায় তিনটি মামলাসহ জাল নোট চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মোট ১৫টি মামলা করা হয়। এ সময়ের মধ্যে এই চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মোট ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়। এই সময়ের মধ্যে এই চক্রের ৫৩ জন সদস্যকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। জাল নোট ব্যবসায়ী চক্রের কেউ গ্রেপ্তার হলে পুলিশ তার বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(বি) ধারায় মামলা করে। আর মামলার দুর্বলতায় জাল নোট চক্রের সদস্যরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়। পুলিশ এসব মামলায় যাদের সাক্ষী করে প্রায়ই তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে মামলার নিষ্পত্তি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

গোয়েন্দাদের মতে, দেশের বাইরে থেকেও কোটি কোটি টাকার জাল নোট দেশে ঢুকছে। রাজধানীতেও তা ছাপা হচ্ছে। এ চক্রের সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকরা জড়িত। ছয় মাসে অন্তত ১০০ কোটি টাকার জাল নোট তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শনাক্ত হয়েছে অন্তত পাঁচটি কারখানা। এ ছাড়া আরো ১৫টি জাল টাকার কারখানা সম্পর্কে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এর পরও থেমে নেই জাল টাকার বাজারজাতকরণ। আইনের ফাঁকফোকরের কারণে জাল টাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক সাজার ঘটনা এ দেশে ঘটে না বললেই চলে। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে জাল নোট সম্পর্কিত পাঁচ হাজারেরও বেশি মামলা উচ্চ আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে ঝুলে আছে। নোট জালকারী চক্রের আর্থিক সামর্থ্যের কারণেই তাদের মামলাগুলো যে অমীমাংসিত থাকছে, তা এক নিষ্ঠুর সত্য।

২০১১ সালের ১৮ নভেম্বর ঢাকার এক প্রতিষ্ঠিত দৈনিকে ‘জাল নোট নিয়ে সংকট বাড়ছে আমাদের’ শিরোনামে আমার লেখা নিবন্ধে বক্তব্য ছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও ডিবির উপকমিশনার এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘নোট জাল করার বিনাশী কর্মকাণ্ডে শুধু কয়েক ডজন জালিয়াতই জড়িত নয়, এর সঙ্গে দুটি নামিদামি বেসরকারি ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতারও জোরালো প্রমাণ তাঁরা সংগ্রহ করেছেন এবং অচিরেই এতদ্বিষয়ক ভয়ংকর কর্মকাণ্ডে জড়িতদের ভালোভাবে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পারবেন। প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের এক শ্রেণির লোভী ও ধূর্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এই জাল নোট বানানো বা বাজারজাত করার দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ডে নেমে পড়ার ঘটনা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, দেশের অথনৈতিক বুনিয়াদ ধ্বংসের এক বড় সংযোজনও বটে। ’

দেশের প্রাচীনতম দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয় কলামে বলা হয়, ‘দেশের অভ্যন্তরে যাহারা জাল নোট তৈরি ও বিক্রয়ের ব্যবসা ফাঁদিয়া বসিয়াছে তাহাদের পরিচয়  এবং গতিবিধি সম্পর্কেও বিস্তর তথ্য রহিয়াছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হইল, বারবার উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণসহ জালিয়াতচক্রের সদস্যদের আটক করিবার পরও রহস্যজনকভাবে তাহারা ছাড়া পাইয়া যাইতেছে এবং পুনরায় নোট জালিয়াতির ব্যবসা ফাঁদিয়া বসিতেছে। ’

দেশের অর্থনীতিতে তাণ্ডব সৃষ্টিকারী ঘটনাগুলো সামাল দিতে হলে ঢাকা মহানগরীর সংশ্লিষ্ট কয়েকটি থানাসহ সীমান্তের চিহ্নিত ১৫-২০টি থানায় নোট ‘জালিয়াতিবিষয়ক একটি সাংবাৎসরিক সেল’ (উপযুক্ত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে) গঠন, এতদসংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিচার দ্রুত ও সঠিকভাবে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজনবোধে সংশ্লিষ্ট আইনের কিছু ধারা সংশোধন ও সংযোজন করতে হবে। এর আগে প্রশ্নবোধক জামিন প্রদানের বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে অপরাধীরা এভাবে জামিন না পায়। সেই সঙ্গে যে বেসরকারি বা সরকারঘেঁষা ব্যাংকের কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল তাদের কার কী শাস্তি হয়েছে তার বিবরণ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশ করা প্রয়োজন। শাস্তি প্রদানসংক্রান্ত কাজগুলো যদি আলো-আঁধারির প্রক্রিয়ায় ‘সামাল’ দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সে ব্যাপারেও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মহোদয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আপাতত এ তিনটি কাজ যথাযথভাবে যুগপত্ভাবে করতে পারলে আশা করা যায় জাল নোটবিষয়ক তাণ্ডব অনেকাংশে কমে যাবে।

লেখক : সাবেক সচিব

 karar.hassan@gmail.com


মন্তব্য