kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কোরবানি অর্থের বাহাদুরি বা উৎসব নয়

মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কোরবানি অর্থের বাহাদুরি বা উৎসব নয়

দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, সাধনা ও শ্রমের ফসল কোরবানি। গরু যিনি লালনপালন করেন ও গরু কেনার জন্য যিনি দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকেন, উভয়ের স্বপ্ন একটি সার্থক কোরবানি।

কোরবানির পশু বিক্রেতার ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি ও হালাল উপার্জন দিয়ে পশু কেনাও ইবাদতের শর্ত। যাঁরা ধনী, তাঁরা তাঁদের মাংস গরিব আত্মীয়স্বজন আর নিঃস্বদের মধ্যে বিলাবেন, এটাই বিধান। পলিথিনভর্তি মাংস ফ্রিজে সংরক্ষণ করে একা খাওয়া অনুচিত। কোরবানির সামর্থ্য না থাকলে বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও ঋণ করে কিংবা অসৎ পথে অর্থ উপার্জন করে কোরবানি করা যাবে না। ইসলাম আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়, এর আধ্যাত্মিক আবেদন আনুষ্ঠানিকতার বহু ঊর্ধ্বে।

কোরবানির পশু লালনপালন, পরিবহন, যানবাহনে ওঠানো-নামানো ও জবাইয়ের আগ পর্যন্ত পর্যাপ্ত যত্ন নেওয়া ও খাবার দেওয়াও ধর্মীয় অনুশাসন। কোরবানির পশুকে ক্ষুধার্ত বা পিপাসার্ত রাখা পাপ। কোরবানিকে আনন্দ-উৎসবে পরিণত করা অনুচিত। তাজা মাংস ভোজনের উৎসব, বড় গরু কেনার উৎসব ও ধনীদের মধ্যে মাংস বিতরণের উৎসব কোরবানির উদ্দেশ্য ম্লান করে দেয়। কোরবানির অর্থ হালাল কি না, মাংস বিতরণ ন্যায্য হয়েছে কি না—এসবই আল্লাহর বিচার্য। কোরবানির পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবহেলায় নাগরিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে না ফেলাও ধর্মীয় নৈতিকতা। আমাদের আচরণ যেন অন্যের কষ্ট বা দুর্ভোগের কারণ না হয়। কোরবানিদাতার নিকটাত্মীয় বা প্রতিবেশীর কাছে যদি মাংস না পৌঁছে, তবে কোরবানির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে আল্লাহর কাছে।

ঋণগ্রস্ত, অভাবগ্রস্ত, জাকাতপ্রাপ্ত হয়েও শুধু সন্তানের আবদার রক্ষা কিংবা সামাজিক মর্যাদা রক্ষার যুক্তিতে কোরবানি ইসলাম সমর্থন করে না। কোরবানি আল্লাহর জন্য, মানুষের সন্তুষ্টি বা প্রশংসার জন্য নয়। মানুষের প্রশংসা বা সমালোচনা অন্তরে স্থান দিয়ে যে কোরবানি, মহান আল্লাহর সঙ্গে তা শিরকের সমতুল্য পাপ। কারণ এ ক্ষেত্রে বান্দাকে আল্লাহর সমকক্ষতায় স্থান দেওয়া হয়। এ ধরনের কোরবানি জাহান্নামপ্রাপ্তির পথ প্রশস্ত করবে।

শ্রমজীবী, কর্মজীবী বা অধীনস্থদের প্রাপ্য বেতন, ভাতা বা বোনাস থেকে বঞ্চিত করে, কারো প্রাপ্য বিল পরিশোধ না করে কিংবা শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রাপ্য মজুরি না দিয়ে অথবা সরকারি রাজস্ব বা বিদ্যুৎ বিল ফাঁকি দিয়ে কোনো ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি যদি অনৈতিক মুনাফার পাল্লা ভারী করেন, তবে ওই অর্থ দিয়ে বিশাল গরু কিনে কোরবানি দেওয়া আল্লাহর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বান্দার হক নষ্ট করে, রাষ্ট্রের পাওনা পরিশোধ না করে কোরবানি কবুল হবে না। আল্লাহ বান্দার হক তথা মানুষের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন।

জাকাতদাতা যদি জাকাত পুরোপুরি আদায় না করেন, জাকাতকে বোঝা মনে করেন ও আংশিক জাকাত অনাদায়ি রেখে বিশাল গরু কিনে কোরবানি করেন, তাও আল্লাহর দরবারে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নামাজ, জাকাত ইত্যাদি ফরজ ইবাদত পুরোপুরি আদায় করে ও আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, অভাবগ্রস্ত, অধীনস্থদের হক আদায় করে ও ঋণমুক্ত ও দায়মুক্ত থেকে নিজের শতভাগ হালাল উপার্জিত অর্থ দিয়ে শুধু আল্লাহর হুকুম পালনের চিন্তাচেতনা অন্তরে ধারণ করে যে কোরবানি, তা হবে নিঁখুত ও শ্রেষ্ঠ কোরবানি। এ কোরবানি পরকালের পাথেয়। পার্থিব জীবনে আমরা বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন কিংবা পেশাগত বা ব্যবসায়িক উন্নতির জন্য প্রচুর শ্রম, অর্থ, সময় ত্যাগ করি। কিন্তু আল্লাহর পথে ব্যয়, স্বার্থ ত্যাগ বা কোরবানি অনেক উচ্চমার্গের। নিজের ধনসম্পদ, মেধা, শ্রম ও সময় যদি আল্লাহর পথে কোরবানি করি, তবে সমাজে ন্যায়বিচার, সমতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অন্যায়, বৈষম্য দূর হবে।

সমাজে আজ যত শোষণ, পীড়ন ও বৈষম্য, তা একমাত্র সম্পদ কুক্ষিগত ও পুঞ্জীভূত করার ফসল। কোরবানির গরু কেনার পেছনে বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়, যার সুফলভোগী সাধারণ দরিদ্র মানুষ। কেউ মাংস পেয়ে, কেউ মজুরি পেয়ে, কেউ চামড়া বিক্রির অর্থ পেয়ে নিজ নিজ অভাব মোচন করছেন। পুষ্টির অভাবে যাঁরা জীর্ণশীর্ণ, তাঁরা কোরবানির সুবাদে মাংস খাওয়ার অধিকার পাচ্ছেন। এটা দরিদ্রের হক। এভাবে বিত্তবানরা কোরবানির শিক্ষা থেকে যদি সারা বছর দান, অনুদান কিংবা পশু কিনে মাংস বিতরণ করেন, তবে তা দারিদ্র্য ও অপুষ্টি দূরীকরণে ভূমিকা রাখবে।

কোরবানির মাংস জমা রাখতে এখন ফ্রিজ কেনার প্রতিযোগিতা চলে। টন টন মাংস ধনীদের ঘরে ঘরে জমা থাকে। এ কোরবানি নিরর্থক। যত বেশি পরিমাণে সম্ভব কোরবানি মাংস দরিদ্রদের দান করা উত্তম। অধিক মাংস খাওয়ার লোভ বিসর্জন দিয়ে অকাতরে দরিদ্রদের মাংস দান করা অনেক বড় মাপের কোরবানি। লোভমুক্ত থাকা, লোভ সংবরণ করা, লোভ বিসর্জন দেওয়াই কোরবানির সফলতা, সার্থকতা।

কোরবানি উপভোগের উৎসব নয়, ত্যাগের উৎসব। আমাদের এ বিলাসপ্রিয় ও ভোগপ্রিয় জীবনে আমরা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করি বিনোদনে, অনুষ্ঠানে। অনেক অনৈতিক ও অসামাজিক কাজেও আমরা বেপরোয়া অর্থ ব্যয় করি। এসব অনুষ্ঠান-বিনোদনে দরিদ্রদের অংশ নেই, ভাগ নেই, হিস্যা নেই। কিন্তু কোরবানি এমন একটি মহৎ ও মানবিক অনুষ্ঠান, যেখানে ধনীরা যে মানের মাংস বা খাবার গ্রহণ করেন, দরিদ্ররাও সমমানের খাবারে শরিক হতে পারেন। ইসলামের শাশ্বত বাণী হলো, ধনী ও দরিদ্রে বৈষম্য ও বিভাজন দূর করা। কোরবানি হলো আত্মিক ইবাদতের সমান্তরালে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইবাদত।

যে কাজে অপবিত্র উপার্জন, আড়ম্বরপূর্ণ ব্যয়, প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতা থাকে, তা আল্লাহ প্রত্যাখ্যান করেন। যে ইবাদতে শুদ্ধ নিয়ত থাকে মহাপ্রভু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তাই আল্লাহ পরম যত্নে গ্রহণ করেন এবং তাই হবে পরকালীন মুক্তির মাধ্যম। কোরবানির পশু জবাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি আমরা দুর্নীতি, অন্যায়, অমানবিকতা ও পাপাচারের মানসিকতা বিসর্জন দিয়ে অন্তরে সততা, নৈতিকতাকে গ্রহণ করি, তবে তা হবে কোরবানির পরম প্রাপ্তি ও সাফল্য। কোরবানি কবুলের পরিমাপক হলো, ‘আমিত্ব, অনৈতিকতা ও অন্যায় বিসর্জন দাও এবং সৎ ও শুদ্ধ জীবন বেছে নাও’।

লেখক : সচিব, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লি.

 mmunirc@gmail.com


মন্তব্য