kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের প্রভাব

এ এম এম শওকত আলী

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের প্রভাব

বিশ্বের সব ধরনের গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একাধিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এদের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর অন্য নাম ‘অদৃশ্য সরকার’। নিজস্ব কার্য পরিচালনার জন্য এরা সব সময়ই কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে। এ কারণে এদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার কোনো অবকাশ নেই। গোয়েন্দা সংস্থা যেমন পুলিশ বাহিনীতেও রয়েছে, তেমনি সামরিক বাহিনীতেও। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোয় পুলিশের গোয়েন্দা বাহিনী ‘বিশেষ শাখা’ বা স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) নামে পরিচিত। সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থার দৈনন্দিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা নয়। এ সংস্থা মূলত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত। বাংলাদেশে সামরিক ও পুলিশের মাঝামাঝি স্থানে রয়েছে অন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এর নাম এনএসআই বা ন্যাশন্যাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স। জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে তারাও জড়িত। প্রশ্ন হলো, দৈনন্দিন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তারা কী ভূমিকা পালন করে? এদের প্রয়োজনই বা কী? ব্রিটিশ আমল থেকেই দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের কিছু ক্ষেত্রে এসবি দায়িত্ব পালনে রত। প্রধান দুটি ক্ষেত্রে এদের দায়িত্ব রয়েছে। এক. সরকারি কর্মকর্তাদের প্রাথমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে। দুই. পাসপোর্ট প্রদানের জন্য। প্রথমোক্ত ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকমিশন দ্বারা সুপারিশকৃত প্রার্থীর অতীত ইতিহাস এসবি যাচাই করে প্রতিবেদন পেশ করে। এ প্রতিবেদনে বিরূপ কিছু না থাকলে চাকরিতে নিয়োগে বাধা নেই। দ্বিতীয় ক্ষেত্রেও পাসপোর্ট আবেদনকারীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়। মূলত অপরাধ অথবা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয় এ দুই ক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। তাঁরা হবেন নির্দলীয় ব্যক্তি। অন্যদিকে কোনো অপরাধজনিত মামলায় ছয় মাসের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে চাকরিরত কর্মকর্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পদচ্যুত হবেন। এসব বিধান সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধিতেই রয়েছে। তবে চাকরিতে যোগদানের আগে যদি এ ধরনের দণ্ড হয়, তাহলে কী হবে অথবা দণ্ড ভোগ করার পরও কি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চিরদিনের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন, তা স্পষ্ট নয়।

১৯৪৭ সালের পর থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে যে ১৯৬১-৬২ সালে এ দেশের একজন যোগ্য প্রার্থীর ক্ষেত্রে এসবির প্রতিবেদনে বলা ছিল ওই প্রার্থী কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকাণ্ডে জড়িত। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি তদানীন্তন প্রাদেশিক গভর্নরের কাছে পেশ করা হয়। শোনা যায় গভর্নরের অলিখিত মন্তব্য ছিল, ‘২২ বছর বয়সে আমিও কমিউনিস্টপন্থী ছিলাম। ’ শেষ পর্যন্ত প্রার্থী নিয়োগ লাভ করেন। ৫ সেপ্টেম্বর এক দৈনিকে প্রকাশিত খবর ছিল, ৩৪তম বিসিএসে নেতিবাচক গোয়েন্দা প্রতিবেদনের জন্য ১৩৪ জনের নিয়োগ ঝুলে আছে। অতীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র কারাবরণ করেন। তাঁরাই আবার পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে যোগ্য বিবেচিত হয়ে নিয়োগ লাভ করেন। পরে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রশংসনীয় অবদানও রাখেন। ওই সময় তাঁদেরও প্রতিবেদন এসবি দিয়েছিল। কিন্তু তাঁরা নিয়োগবঞ্চিত হননি। জানা যায় যে নিয়োগবঞ্চিতদের মধ্যে রয়েছেন ১৪ জন প্রশাসন ক্যাডারের, পররাষ্ট্র দুই, পুলিশ ছয় ও শিক্ষা ক্যাডারের ৫০ জন প্রার্থী। আরো তাত্পর্যপূর্ণ তথ্য হলো, ১৩৪ জনের মধ্যে অন্তত ১৪ জন রয়েছেন বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে কর্মরত। তাঁদের ক্ষেত্রে আগে পুলিশের বিশেষ শাখার প্রতিবেদনে বিরূপ কোনো মন্তব্য বা তথ্য ছিল না বলেই তাঁরা ওই সময় চাকরিতে নিয়োগ লাভ করেন। এরপর পছন্দসই অন্য ক্যাডারে নিয়োগের জন্য আবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। এখন কেন বিরূপ মন্তব্য হবে? এর মধ্যে কিছু ভুল হচ্ছে বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে। অন্য কারণ কী তা অবশ্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখনো বলেনি। যা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তা হলো—এক. কী কারণে বঞ্চিত হয়েছেন তা গোপনীয় বিষয়; তবে প্রার্থীদের আবেদন পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে; দুই. বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে। প্রকাশিত সংবাদে আরো জানা যায় যে গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তার এ বিষয়ে মন্তব্য ছিল, ‘রাজনৈতিক যোগসূত্রতা পাওয়ায় কয়েকজনের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আবার ভুলও হতে পারে। ’ সম্পূর্ণ বিষয়টিই অস্বচ্ছ। আবারও বলতে হয়, যাঁরা আগে সরকারি ক্যাডারে কাজ করেছেন এবং এখনো কর্মরত, তাঁদের রাজনৈতিক যোগসূত্র এখন কেন বলা হচ্ছে? অন্যদের ক্ষেত্রে বলা যায়, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ের ভিত্তি কী? এ বিষয়ে শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে তরুণ ও মেধাসম্পন্ন প্রার্থীদের নিয়োগবঞ্চিত করা যায় না। সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রমাণ বা নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রতিবেদনে রয়েছে কি? এসব প্রশ্ন মন্ত্রণালয় কেন উত্থাপন করেনি? এ কথা ঠিক যে প্রথাগতভাবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন গোপনীয়। তবে অত্যন্ত সীমিত ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা করা আইনসিদ্ধ। সীমিত ক্ষেত্র হলো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষা, যা আলোচ্য ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে মনে হয়। সাক্ষ্য আইনের অন্যতম বিধান হলো শোনা কথার ভিত্তিতে কাউকে দোষী প্রমাণ করা যায় না : ‘Hearsay evidence is no evidence.’ যেসব গোয়েন্দা কর্মকর্তা নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছেন তাঁরা কি শোনা কথার ভিত্তিতে করেছেন, না নির্ভরযোগ্য দালিলিক তথ্যের ভিত্তিতে করেছেন—এ বিষয়টি জানা প্রয়োজন। দালিলিক প্রমাণ বা তথ্যের অন্যতম সূত্র হলো সংশ্লিষ্ট থানার লিপিবদ্ধ কোনো তথ্য। এ ক্ষেত্রে তা মন্ত্রণালয় অবশ্যই জানতে পারে। এ ধরনের তথ্য জানার পরই নেতিবাচক প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় অবিচার করা হবে। জনপ্রশাসনও মেধাসম্পন্ন কর্মকর্তার সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। আলোচ্য বিষয়ে বঞ্চিত অধিকাংশ প্রার্থীর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁরা সবাই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয় অস্বীকার করেছেন। দু-একজন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে স্বীকার করেছেন। কোনো ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকা কি গুরুতর অপরাধ? ছাত্ররাজনীতির অধিকার একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত বিষয়। বর্তমানে একমাত্র বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়টি নিষিদ্ধ। কিন্তু এ নিয়েও দাবি উঠেছে।

অন্যদিকে প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিদের দলীয়করণের বিষয়টিও মিডিয়ায় বহুদিন ধরে আলোচিত বা সমালোচিত বিষয়। একদিকে একের পর এক ক্ষমতাসীন দল কর্মকর্তাদের দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পদায়ন ও পদোন্নতির সিদ্ধান্তে লিপ্ত, অন্যদিকে গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদনের ফলে যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের পথ চিরতরে রুদ্ধ হবে। এমনটি হওয়ার কথা নয়। এ বিষয়ে আইন, বিধি, প্রশাসনিক প্রথার যুক্তিসংগত পরিবর্তন কাম্য। অপরাধীর ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থার মূলনীতি হলো কারো বিরুদ্ধে চার্জশিট হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালত নিরপরাধ হিসেবে গণ্য করবে। বিচারে যদি অভিযুক্তের শাস্তি হয়, তাহলে সে অপরাধী হিসেবে গণ্য। অন্যথায় নয়। সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোথায় কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে ও চূড়ান্তভাবে চার্জশিট আদালত গ্রহণ করেছেন কি না সে বিষয়টিই বিবেচ্য। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই অথচ প্রতিবেদনে লেখা হয় সে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে, তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হওয়ার পক্ষে যুক্তি নেই। সব রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন রয়েছে। এটাই বাস্তবতা। সরকারি নিয়োগের আইন, বিধি ও প্রশাসনিক প্রথার সংস্কার ও প্রয়োগ এ বাস্তবতার নিরিখেই করা বাঞ্ছনীয়। আর এ সম্পর্কে যদি উচ্চ আদালতের কোনো প্রাসঙ্গিক রায় থাকে, তাহলে সে বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় কিছু ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি মুক্তি লাভ করে। সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক নিয়োগে বিপরীতধর্মী চিত্র দৃশ্যমান। প্রশাসনিক বিধিতে বা নিয়মে পাবলিক সার্ভিস কমিশন কর্তৃক সুপারিশকৃত প্রার্থীর পুলিশি প্রতিবেদনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদন নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক হওয়ার কথা বলা নেই। গলদ এখানেই। এ ধরনের বিধান বা নিয়ম নির্বাহী বিভাগকে সীমাহীন ক্ষমতা প্রদান করে। সীমাহীন ক্ষমতার প্রয়োগ সুশাসনের অন্তরায়।

লেখক : কেয়ারটেকার সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


মন্তব্য