kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা

অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের গতি ক্রমাগত বাড়লেও দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা কোনোভাবেই কমছে না, বরং বেড়েই চলেছে। যদিও অর্থনীতির সঙ্গে স্থিতিশীলতার সম্পর্ক রয়েছে।

সক্ষমতা অর্জনের ধাপগুলো কোনো অলৌকিক শক্তি বা ম্যাজিকের মাধ্যমে ঘটছে না। সম্ভব হয়েছে লাখ লাখ মানুষের কঠোর পরিশ্রম ও মেধার মাধ্যমে। আমাদের চেষ্টা ও সাধনা আমাদের দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে এগিয়ে চলছি। এখানে একটু সমস্যাও হচ্ছে। যখন আমরা অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ঊর্ধ্বগতি বলে মনে করছি ও বাস্তবে তাই, তখন আন্তর্জাতিক দাতা ও সাহায্য সংস্থাগুলো তাদের সাহায্যের হাত ফিরিয়ে নিচ্ছে। এখন তাদের সাহায্যের হাত প্রসারিত হচ্ছে আফ্রিকাসহ অন্যান্য দরিদ্র দেশে। অথচ মধ্যম আয়ের দেশ হলেও আমাদের সার্বিক অর্থনীতি সন্তোষজনক নয়। এমডিজিতে আমাদের সাফল্য অনেক, তবু অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টি মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে মেলালে এখনো ক্রয়ক্ষমতাহীন মানুষের সংখ্যা কম নয়। জীবনযাত্রার মান কারো কারো বাড়ছে, কিন্তু এর ওপর সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো কি মন্দ তা নির্ভর করে না। অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে কমবেশি স্বীকার করলেও সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা আমাদের দারুণভাবে পেয়ে বসেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সামাজিক অস্থিরতা আমাদের পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আমরা আদিম বর্বর যুগে বসবাস করছি।

রাজনীতির মাঠে আমাদের লড়াই পরস্পর পরস্পরকে ঘায়েল করা, কুৎসা রটনা করা ও বাগ্যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। রাজনীতির মোড় ঘোরানো ও ইতিবাচক রাজনীতিতে যাওয়ার কোনো পথ তৈরি হচ্ছে না। ভালো কিছুর প্রতি সমর্থনের পরিবর্তে সমালোচনা ও ন্যায়ের প্রতি সমর্থন না দেওয়ার প্রবণতা আমাদের পেয়ে বসেছে। রয়েছে কোনো ইস্যুতে দ্রুত মতের পরিবর্তন। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পদক ফিরিয়ে নেওয়া ও তাঁর কবর অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ইস্যু রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচিত বিষয়। বিএনপি চেয়ারপারসন ১৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর জন্মদিন পালন না করায় বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেত যদি তিনি ইতিহাসের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের জন্য জন্মদিন পালন করা থেকে বিরত থাকতেন। তিনি বন্যাসহ অন্যান্য কারণ উল্লেখ করেছেন, যা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি যখন সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদে অভিযুক্ত যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ও সন্দেহ পোষণ করেন তখন আমাদের কষ্ট হয়। তাদের পরিচয় কারো অজানা নয়। পুলিশ যখন তাদের ঘেরাও করে ও আত্মসমর্পণের জন্য বলে প্রতি-উত্তরে তারা গুলি ও গ্রেনেড ছোড়ে, তখন তাদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর নয় কি? গোটা দেশ যখন জঙ্গিবাদ ইস্যুতে সচেতন-সজাগ ও শীর্ষ জঙ্গিদের নিহত হওয়ার পর স্বস্তি প্রকাশ করছে তখন তাঁর এ বক্তব্য আমাদের দারুণভাবে হতাশ করে। আমাদের মনে সহজ প্রশ্ন জাগে, তাহলে তিনি কি চান না জঙ্গিবাদ নির্মূল না হয়ে জঙ্গিবাদ টিকে থাকুক—এমনটি তাঁর পছন্দ।

রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো সামাজিক অস্থিরতাও আমাদের দারুণভাবে পেয়ে বসেছে। জঙ্গিবাদ ইস্যুতে আমরা ভীতসন্ত্রস্ত, তবে তা নিরসনে আমাদের সক্ষমতাও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সক্ষমতা ধরে রাখার কোনো বিকল্প নেই। জঙ্গিবাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সামাজিক অপরাধ যেমন খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধের সংখ্যাও বাড়ছে। এর চরম শিকার হচ্ছে আমাদের তরুণী ও নারীরা। অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা কোনো কূলকিনারা পাচ্ছি না। একেকটি ঘটনা যেন একেক রকম এই অর্থে যে এর মোকাবিলা করার ধরন ভিন্ন ভিন্ন। আইনি প্রক্রিয়া শুরুর পর কোনোটি থেমে যায়, কোনোটি মাঝপথে আটকে যায়, আবার কোনোটির শুরুতেই গলদ। তনু হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে যে এটি এখন মৃত। মিতু হত্যাকাণ্ডের অবস্থাও প্রায় একই রকম।   মাঝপথে আটকে আছে। এক মিশ্র বিষয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। মিতু হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমরা সাধারণ মানুষ অস্পষ্টতার মধ্যে রয়েছি। আফসানা হত্যাকাণ্ড অন্যগুলোর তুলনায় ব্যতিক্রম। শুরুতেই গলদ। অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের কোনো লক্ষণ আমাদের চোখে পড়ছে না। এমনিভাবে হারিয়ে গেছে সাগর-রুনিসহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ড, যার কোনো অগ্রগতি আমাদের কাছে নেই।

জঙ্গিরা ভয়ংকর বিধায় তাদের ক্ষেত্রে আমাদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা নিজেরাও জানে যে তাদের মৃত্যু হতে পারে। মৃত্যুকে তারা এক অর্থে বরণ করে নিয়েছে। কিন্তু তনু, মিতু, আফসানাদের ঘাতকরা কোনো অংশেই কম ভয়ংকর নয়। জঙ্গিরা যেমন বিশেষ আদর্শ ও মতাদর্শ লালনের কারণে অন্যকে হত্যা করছে, তেমনি সামাজিক অন্য অপরাধীরাও খুন ও ধর্ষণ করছে তাদের নিজস্ব কোনো বিশেষ মনোবৃত্তির কারণে। লোকগুলো আলাদা হলেও তাদের মনোবৃত্তি একই ধরনের। দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে, টার্গেট ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাদের অপরাধের মাত্রা সমান। আমাদের জন্য উভয়ই চরম ক্ষতিকর ও হুমকিস্বরূপ। আমাদের সাধারণ ধারণা জঙ্গিবাদ ইস্যুতে আমরা এখন এক-অভিন্ন-একাট্টা ও একমত। যেকোনোভাবেই হোক আমরা এর নিরসন চাই। একইভাবে অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রেও আমাদের সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। নইলে অস্থিরতা আরো বাড়বে। আমরা বড় মাত্রায় রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ছে এবং আরো বাড়বে; কিন্তু সুশাসনের উপাদানগুলোর সূচক ইতিবাচকের দিকে না গেলে আমাদের যাবতীয় অর্জন ব্যর্থ হতে পারে। আমাদের অতিমাত্রায় সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com


মন্তব্য