kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এই সব রাজাকার প্রজন্ম!

রেজানুর রহমান

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



এই সব রাজাকার প্রজন্ম!

আচ্ছা, রাজাকারের ছেলেমেয়েরা কি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ে? তারা কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানে? বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত যেসব রাজাকারের ফাঁসি হলো তাদের ছেলেমেয়েরা, পরিবারের অন্য সদস্য, আত্মীয়স্বজন তারা কি আদৌ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ে? দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে? যে জন্য যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হচ্ছে তারা কি সে জন্য অনুতপ্ত? নাকি ভেতরে ভেতরে গোল পাকাচ্ছে? অনেকেই হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন—হঠাৎ আপনার মাথায় এসব প্রশ্নের উদয় হলো কেন? তাদের বলছি, এসব প্রশ্নের একাধিক কারণ আছে। একাধিক আলামত আছে, যা দেখে আশ্বস্ত হতে পারি না।

ভবিষ্যৎ আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে ওঠে। পরিবারের কেউ মারা গেলে সাধারণত কী হয়? কান্নার রোল পড়ে। পরিবারের সদস্যরা যাকেই কাছে পায় তাকেই জড়িয়ে ধরে কাঁদে। অথচ ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীর কোনো ছেলেমেয়েকে, পরিবারের সদস্যকে একবারও প্রকাশ্যে কাঁদতে দেখিনি। বরং প্রকাশ্যে তারা চরম দুর্বিনীত। অনুতপ্ত হওয়া তো দূরের কথা; বরং ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে। এর আগে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যতজনেরই ফাঁসি হয়েছে ফাঁসির আগে তাদের পরিবারের লোকজন কার, মাইক্রোবাসের বহর সাজিয়ে কারাগারে তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। একজনেরও চেহারায় বিষণ্নতার ছাপ চোখে পড়েনি। বরং মনে হয়েছে, পিকনিক মুডে আছেন সবাই। ফিরে যাওয়ার সময় মিডিয়ার সামনে অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এতে মনে হয়েছে, তারা অনুতপ্ত নয়। বরং তারা ক্ষুব্ধ।

এই চিত্রই প্রমাণ করে রাজাকারের পরিবারের সদস্যরা অর্থাৎ রাজাকার প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মোটেই বিশ্বাসী নয়। যদি বিশ্বাসী হতো, তাহলে সেটা তাদের কর্মকাণ্ডে প্রকাশ পেত। এই যে এতজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হলো, তাদের একজনেরও ছেলে অথবা মেয়ে কি বাবার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়েছে? ক্ষমা চেয়েছে জাতির কাছে? একবারও বলেছে, আমার বাবা মহান স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিরাট অন্যায় করেছে। আমি তার হয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চাই। অনেকে হয়তো বলবেন, ছেলেমেয়ের পক্ষে এটা বলা কি সম্ভব? কিন্তু এটা তো সম্ভব বাবা যে ভুল করেছেন সেই পথে আর না হাঁটা। একজনও কি সেটা করছেন? বরং রাজাকার প্রজন্মের কেউ কেউ বাবার আদর্শের ধারায় নিজেকে, নিজেদের নবতর উদ্যোগে সংগঠিত করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এর পেছনে অনেক কারণ আছে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো—রাজাকার প্রজন্মের আর্থিক সংগতি। এযাবৎ যতজন রাজাকারের ফাঁসি হয়েছে, তাঁদের সবাই ছিলেন বিত্তশালী। অঢেল বিত্তবৈভব ছিল তাঁদের। এখন সেগুলো ভোগ করছেন তাঁদের পরিবারের লোকজন। বিত্তবৈভব থাকলে অনেকের মাঝেই ন্যায়-অন্যায় জ্ঞান থাকে না। অনেকে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন। যুদ্ধাপরাধীদের পরিবারেও এর ছায়া পড়েছে। যেহেতু আর্থিক সংগতি আছে কাজেই ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠা সহজ।

অনেকের ধারণা, দেশে এই যে এত জঙ্গি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে তার পেছনেও রাজাকার প্রজন্মের ইন্ধন রয়েছে। কাজেই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক রাজাকারের পরিবারের সদস্যের ব্যাপারে রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষ করে তাঁদের আর্থিক সংগতির বিষয়টিও তলিয়ে দেখা জরুরি। ওই সব পরিবারের ছেলেমেয়েরা কে কোথায় লেখাপড়া করছেন, কে তাঁদের কী শেখাচ্ছেন, সে ব্যাপারেও খোঁজ রাখা দরকার। তাঁরা কি আদৌ মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়েন? পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন হয়েছিল এ কথা কি তাঁরা বিশ্বাস করেন? তাঁদের বাবা এ দেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। দেশের লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিলেন। বাবাদের কৃতকর্মের জন্য তাঁরা এ জন্য কি অনুতপ্ত? এসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি। যদি তাঁরা অনুতপ্ত না হন, তাহলে রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার তাঁরা রাখেন কি না প্রশ্ন এসেই যায়। ধরা যাক, একটি সংস্থায় চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধার পোষ্যদের ক্ষেত্রে একটি কোটা রয়েছে। এটি করা হয়েছে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান জানানোর জন্য।

সময়ের বিবেচনায় বোধকরি আরো একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধীদের ছেলেমেয়েদের যোগ্যতার বিষয়টি নির্ধারণ করা। সিদ্ধান্তটি এমন হতে পারে—রাষ্ট্রের সুবিধা নিতে চাও। তাহলে স্বীকার করো তোমার পিতা মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ভুল করেছিলেন। এ জন্য তুমি অনুতপ্ত! এ ক্ষেত্রে অনেকে হয়তো মানবাধিকারের প্রশ্ন তুলবেন। পিতার ভুলের কারণে পুত্র-কন্যার সাজা হবে কি না এ ব্যাপারেও হয়তো মতামত দেবেন। সব মতামতের ঊর্ধ্বে হলো দেশাত্মবোধ। আমি আমার দেশকে ভালোবাসি কি না। দেশকে ভালোবাসি অথচ মহান মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করি না। এ ধরনের ভালোবাসার প্রয়োজন নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধকে শ্রদ্ধার সঙ্গে বুকে ধারণ করে দেশকে ভালোবাসতে হবে। যদি মনেপ্রাণে সেটা বিশ্বাস করি, তাহলে আমার চিন্তা-চেতনার মাঝে যুদ্ধাপরাধীদের ঠাঁই নেই। হোক তিনি আমার বাবা! কথাটা যত সহজভাবে বলা হলো পরিবেশ-পরিস্থিতি বোধকরি ততটা সহজ নয়। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত রাজাকারের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ঠাঁই পাচ্ছেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে ব্যবসা-বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিষয়টি সহজভাবে নিলে সহজ। আবার কঠিনভাবে নিলে বেশ কঠিন। আবার সহজ কথা যায় না বলা সহজে।

 লেখক : সম্পাদক, আনন্দ-আলো


মন্তব্য