kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিশ্বসন্ত্রাসের নেপথ্যে

বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ইউরোপ-আমেরিকায় কেউ বোরকা পরলেই তাকে বিমান থেকে মাঝেমধ্যে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। গোটা দুনিয়া এখন ‘ইসলাম-আতঙ্কে’ ডুবে রয়েছে।

এই ভীতি থেকে নিজের দেশের নাগরিক অধিকারের ওপরও হস্তক্ষেপ করছে ইউরোপের অনেক দেশ ও খোদ যুক্তরাষ্ট্র। একদিকে লাগাতার সন্ত্রাসবাদের ঘটনা যেমন ঘটছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সন্ত্রাসবাদের ঘটনাগুলোকেও ব্যবহার করা হচ্ছে এই আতঙ্ক ছড়ানোর কাজে। জুলাই-আগস্ট—এই দুই মাসেই পৃথিবীজুড়ে সন্ত্রাসবাদের হানায় বলি হয়েছে এক হাজার ২০০ মানুষ।  

আল-কায়েদাকে টপকে এখন সন্ত্রাসবাদের সামনের সারিতে ইসলামিক স্টেট। কে তৈরি করল এই ‘আইএস’? একদল ধর্মান্ধ মানুষ বা কোনো দেশের একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি চাইলেই ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের’ জন্ম দিতে পারে না। ভক্তের প্রণামিতে বড়জোর মন্দির-মসজিদ গড়া যায়, কিন্তু একে ৪৭ রইফেলের ভাণ্ডার তৈরি করা যায় না। কারণ আপনার টাকা থাকলেই আপনি মেশিনগান কিনতে পারেন না। ওটা শপিং মল বা অনলাইন স্টোরে পাওয়া যায় না।

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সিএনএন তাদের খবরে একটি ভিডিও দেখায় সশস্ত্র আইএস বাহিনী টয়োটা কম্পানির ট্রাকে করে প্যারেড করছে। একটি-দুটি নয়, এক শর ওপর টয়োটা ট্রাক। তার পরই যুক্তরাষ্ট্রে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। এত টয়োটা ট্রাক ওরা পেল কোত্থেকে? উত্তর নেই!

গত জুন মাসেই সিএনবিসি সংবাদ সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয় যে কিভাবে যুক্তরাষ্ট্র আইএসের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে তারা একটা তালিকা তৈরি করে, ১. দুই হাজার ৩০০টি হামভি অস্ত্রবাহী যান। যার প্রতিটির দাম ৭০ হাজার ডলার; ২. ৪০টি এমএ ১১ আব্রাম ট্যাংক। যার প্রতিটির দাম চার মিলিয়ন ডলার; ৩, ৫২টি এম ১৯৮ হাওউতজার বন্দুক। যার প্রতিটির দাম পাঁচ লাখ ডলার এবং ৪. ৭৪ হাজার আর্মি মেশিনগান। যার প্রতিটির দাম চার হাজার ডলার।

মোট ২১৯ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র আইএসের হাতে তুলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য জানানো হয়েছে যে এই বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার তারা সরাসরি বিক্রি করেনি। আইএসের হাতে তা পৌঁছেছে ‘ঘটনাচক্রে’।

আদৌ কি ঘটনাচক্রে? নাকি পশ্চিম এশিয়ায় ‘শত্রুদের’ বিরুদ্ধে একের পর এক ‘ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী’দের মদদ দেওয়াটাই যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতি!

ইরাক, আফগানিস্তান, মিসরে কয়েক দশক ধরে এই কাজ করে চলেছে আমেরিকা। আধুনিক বিশ্বে তথাকথিত প্রথম সন্ত্রাসবাদের গল্প তখনই প্রথম সামনে এলো যখন আফগানিস্তানে তালেবান ও পরে আল-কায়েদাকে তৈরি করল রোনাল্ড রিগানের আমেরিকা। সিআইয়ের সাবেক প্রধান রবার্ট গেটস তা স্বীকারও করেছেন তাঁর বই ‘From the Shadows’-এ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জাতীয় সুরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা জিবনেউ ব্রেজনিস্কি বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের নথিভুক্ত ইতিহাসে বলা আছে যে আফগানিস্তানের ‘মুজাহিদীন’দের আমরা ১৯৮০ সাল থেকে সাহায্য করছি। অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর সেখানে সোভিয়েত আর্মি ঢুকে যাওয়ার পর থেকে। কিন্তু সত্যিটা হলো যে বিষয়টা পুরো উল্টো। আফগান মুজাহিদীনদের সাহায্য করার নির্দেশে কার্টার সই করেন ১৯৭৯ সালের ৩ জুলাই। কারণ আমরা আফগানিস্তানে সোভিয়েত বন্ধু সরকারকে উত্খাত করতে চেয়েছিলাম। ”

গোটা আরব দুনিয়ায় এটাই মার্কিন নীতি। আফগান ‘মুজাহিদীন’দের সঙ্গে হোয়াইট হাউসেই দফায় দফায় বৈঠক করেন খোদ রোনাল্ড রিগান। যুক্তরাষ্ট্র তখন তাদের বলত ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’। সিআইএ নিজেই স্বীকার করেছে যে ওসামা বিন লাদেন তাঁর কর্মজীবনের শুরুতে সিআইএর নির্দেশেই কাজ করতেন আর রিগানের ইশারাতেই তৈরি হয় আল-কায়েদা।

কিছুদিন আগেই আইএসের এক পাকিস্তানি কমান্ডার ইউসুফ সালাফি জেরায় স্বীকার করেছে যে আমেরিকার বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকেই তারা অর্থসাহায্য পেত। সালাফির এই মন্তব্যের কয়েক মাস পরেই মার্কিন ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির সাবেক ডিরেক্টর মাইকেল ফ্লিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমি আগেই ওবামা প্রশাসনকে সতর্ক করেছিলাম যে সিরিয়ায় আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে যাদের মদদ দেওয়া হচ্ছে তারা ‘ইসলামিক জিহাদি’। ”

আরব দুনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সহযোগী ইসরায়েল। ইরাক ও সিরিয়ায় যে বিপুল তেলের খনি আইএসের দখলে, সেই তেলখনি থেকে তেল প্রথমে যায় তুরস্কে, তারপর সেখান থেকে বিক্রি হয়। তুরস্ক হলো ন্যাটোর সদস্য, আমেরিকার মিত্র। প্রতি মাসে তেল বিক্রি করে আইএসের আয় হয় ১৯ মিলিয়ন ডলার। তেলের প্রধান ক্রেতা ইসরায়েল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ছেলেও নাকি এই তেল ব্যবসার লভ্যাংশ পেয়ে থাকেন। সিরিয়ার দাবি সে রকমই।

এডওয়ার্ড স্নোডেনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আইএসের প্রধান আবু বকর আল বাগদাদির ট্রেনিং হয় ইসরায়েলে। ট্রেনিংয়ের যৌথ দায়িত্বে ছিল মোসাদ ও সিআইএ।

ওবামা প্রশাসন ইদানীংকালে যে আইএসবিরোধী ‘যুদ্ধ’ চালাচ্ছে পশ্চিমা দুনিয়ার একাংশের সংবাদমাধ্যমে তাকে বলা হচ্ছে প্রক্সি ওয়ার, লোকদেখানো যুদ্ধ। বলা হচ্ছে যে সিরিয়ায় এই যুদ্ধ আসলে গ্যাস পাইপলাইনের যুদ্ধ।

এমনিতে ইউরোপের এক-চতুর্থাংশ অংশ গ্যাস আসে রাশিয়া থেকে। কিন্তু ইউরোপের ভূখণ্ডে এখন নতুন গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে যেতে চায় কাতার ও ইরান। কাতারের পাইপলাইন সিরিয়া হয়ে ইউরোপে ঢুকবে, এমনটাই ছিল মার্কিন পরিকল্পনা। কিন্তু রাশিয়ার মিত্র বাশার আল আসাদ সেই অনুমতি দেননি। আসাদকে তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে।

কার্যত ইরাক ও সিরিয়া না ছুঁয়ে আরব দেশগুলো থেকে ইউরোপে পাইপলাইন নিয়ে যাওয়া অনেক বেশি ব্যয়সাপেক্ষ। তাই ইরাক ও সিরিয়ার দখলদারি ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ আসাদ সরকারের উচ্ছেদ আমেরিকার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। আইএস এই দখলদারির কাজটাই করছে। সাম্প্রতিক একটা বইয়ের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। বইটার নাম ‘দ্য নিউ ইম্পেরিয়ালিজম’। নয়া সাম্রাজ্যবাদ তর্জমা হতে পারে বাংলায়। লেখক ডেভিড হেনরি। পশ্চিম এশিয়ার তেলসম্পদ ব্যবহার করে দুনিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে পদানত করাই মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের। অভিযোগ লেখকের। পুরো বইটিতেই তথ্য দিয়ে হেনরি ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর অভিযোগের সারবত্তা।

ধর্মান্ধতা ও সহিষ্ণুতা—দুটিই যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি অবস্থান করছে। আমাদের বাড়ির পাশের মানুষগুলোর মধ্যেই এই দুই উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু মজার কথা হলো, এই ‘লোকাল’ ধর্মান্ধতা ‘গ্লোবাল এইড’ না পেলে আইএসে পরিণত হতো না। কারণ খোলাবাজারে একে-৪৭ রাইফেল কিনতে পাওয়া যায় না। আর পশ্চিমের অর্থনীতিই তো দাঁড়িয়ে আছে অস্ত্র ব্যবসার ওপর! আমেরিকা, সৌদি, ইসরায়েল—এরাই মূল নিয়ন্ত্রক।  

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনীতিবিদ

biku.babai@gmail.com


মন্তব্য