kalerkantho


এপার-ওপার

দার্জিলিংয়ের দরজায় নির্বাচন

অমিত বসু

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শারদ উৎসবে টয় ট্রেনে আরো জয়রাইড দার্জিলিংয়ে। ৬টার জায়গায় ৯টা। সর্পিল রেলগাড়ি পাহাড়ের গা বেয়ে ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠবে। জানালায় সবুজ পাহাড়, সামনের প্লেটে মনোরম আহার। সফরে অফুরন্ত বাহার। নবীন প্রেমিক যুগলও আহ্লাদে গলতে বাধ্য।

কেনাবেচায় গরম দার্জিলিং। নির্বাচন এগিয়ে আসছে। বছর ঘুরলেই একের পর এক ভোট। করপোরেশন, পঞ্চায়েত, গোর্খাল্যান্ড টেরিটরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিটিএতে। জিটিএর হাতেই দার্জিলিংয়ের ভার।

তারা যেমন চালাবে, তেমন চলবে। আপাতত চালকদের অযোগ্যতায় চলাচল ব্যাহত। উন্নয়নের টাকা কোথায় উড়ছে কে জানে। জিটিএর ৫০ সদস্য কিন্তু ভালো আছেন। থাকা-খাওয়ার এলাহি ব্যবস্থা। মনোরঞ্জনে দেশভ্রমণ। সদস্যরা বলছেন, অন্য দেশ না দেখলে মাথায় উন্নয়নের নতুন প্ল্যান আসবে কী করে। গরিবগুর্বোরা বলছে, লম্বা-চওড়া কথা আমাদের মাথায় ঢোকে না। মোটা ভাত-কাপড় পেলেই বাঁচি। তা-ই বা পাচ্ছি কোথায়।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনি নিরুপায়। দার্জিলিংয়ের দারিদ্র্য দূর করার ইচ্ছা থাকলেও কিছু করতে পারছেন না। সব ক্ষমতা জিটিএর হাতে। সেটা ধরে বসে আছে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। মোর্চার হাত থেকে জিটিএ কাড়তে চেষ্টার কসুর করছেন না মমতা। মোর্চার নেতাকর্মীদের ভাগিয়ে আনছেন তৃণমূলে। জিটিএ চোয়ারম্যান, মোর্চার সহসভাপতি প্রদীপ প্রধান তৃণমূলে। প্রদীপের আক্ষেপ, মোর্চায় থেকে আমি জীবন্ত লাশ হয়ে গেছি। পাহাড়ে যতটুকু কাজ হয়েছে, গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট নেতা সুভাষ ঘিসিংয়ের সময়ে। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতা বিমল গুরুংয়ের নেতৃত্বে দার্জিলিং শুধুই শুকিয়েছে। এবার তৃণমূলের আলোয় বিকাশ। বিনাশের রাস্তায় আর নয়। জিটিএ থেকে এভাবে টাকা লুট করলে মানুষ ক্ষমা করবে না।

বিমল গুরুং, প্রদীপ প্রধান—দুজনই সুভাষ ঘিসিংয়ের শিষ্য। তাঁরা সুভাষের জিএনএলএফের নেতা ছিলেন। পৃথক গোর্খা রাজ্যের দাবিতে হিংসাত্মক আন্দোলন করেছিলেন ঘিসিং। পাশে ছিলেন দুই সাগরেদ বিমল আর প্রদীপ। ১৯৮৮ সালের ২২ আগস্ট সুভাষকে ঠাণ্ডা করতে কেন্দ্রীয় সরকার গোর্খা রাজ্যের দাবি না মানলেও দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরিষদের আওতায় ছিল তিনটি সাবডিভিশন—দার্জিলিং, কার্সিয়াং, কালিমপং। ১৯৯২ সালে সংবিধান সংশোধন করে নেপালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে ঢোকানো হয়। আর্থিক ক্ষমতা হাতে পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি পার্বত্য পরিষদ। প্রতিবাদ আছড়ে পড়তে থাকে পাহাড়ে। অর্থ তছরুপের অভিযোগে সুভাষের ভাবমূর্তি ধুলায় লুটায়। বেগতিক বুঝে সুভাষসঙ্গ ত্যাগ করে নতুন দল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা গড়েন বিমল আর প্রদীপ। তখন তাঁদের কাজ ছিল সুভাষের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে নতুন দলকে চাঙ্গা করা। আজ প্রদীপ বলছেন, বিমলের চেয়ে সুভাষই ঢের ভালো ছিলেন। বিমল-প্রদীপ সম্পর্ক সাপে-নেউলে। কেউ কারো ছায়া সহ্য করতে পারছেন না। প্রদীপ চেয়েছিলেন বিমলকে সভাপতির পদ থেকে ভাগিয়ে নিজে সহসভাপতি থেকে সভাপতি হতে। বিমলের দলবলের সঙ্গে পেরে না উঠে নতুন আশ্রয় খুঁজলেন। বিপন্নতায় মমতার ডাক তাঁর কাছে সোনায় সোহাগা। তৃণমূলের পতাকা হাতে নতুন লড়াই।

বিমল স্বস্তিতে নেই। দলে ভাঙন বাড়ছে। দল ছাড়লেই লুফে নিচ্ছে তৃণমূল।

কেন্দ্রীয় আর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছ থেকে সুভাষ ঘিসিংয়ের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা আদায় করেছিলেন বিমল। তারই ফসল জিটিএ। পার্বত্য পরিষদের চেয়ে জিটিএর প্রশাসনিক এলাকাও বেড়ে যায়। বিমলরা যতটা চেয়েছিলেন ততটা না পেলেও এখতিয়ার অনেকটাই বাড়ে। প্রশাসনিক, আর্থিক ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। জিটিএর ৫০ সদস্যের মধ্যে ৪৫ জন নির্বাচিত। পাঁচজন মনোনীত।

জিটিএর প্রথম নির্বাচন ২০১২ সালের ২৯ জুলাই। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সঙ্গে লড়তে চেয়েছিল তৃণমূল, সিপিএমও। কৃতকার্য হয়নি। মোর্চার হুমকিতে প্রার্থীরা পালিয়ে যান। মমতা বোঝেন মোর্চাকে ঘাঁটানো ঠিক হবে না। তিনি চুপ করে যান। বলতে গেলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতায় পৌঁছল মোর্চা প্রার্থীরা। মমতা বিমলের বিরোধিতা না করে সাহায্যের হাত বাড়ান। সেটা ছিল তাঁর সাময়িক কৌশল। বিমলকে ফেলতে তিনি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। বিমলের ডানা ছাঁটা শুরু করেছিলেন আগেই। গোর্খাদের বাদ দিয়ে অন্য উপজাতিদের নিয়ে পরিষদ গঠনে তিনি আগ্রহ দেখান। গোর্খা আধিপত্য কমতে থাকে। বিমল চটলেও কিছু করার ছিল না। ২০১৭ সালের নির্বাচনে জিটিএ দখলের পরিকল্পনা মমতার। পাহাড়ে তৃণমূলের জমি ক্রমেই শক্ত হচ্ছে। মোর্চার সংগঠনে ধরছে ফাটল।

দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় পুরনো তাস খেলতে চাইছেন বিমল। তিনি ঘোষণা করেছেন, ২০১৯ সালে পৃথক গোর্খা রাজ্য গঠিত হবে। স্মৃতি উসকে তাঁর বার্তা, ২০০৭ সালে যখন মোর্চা প্রতিষ্ঠিত হয়, নেপালি সাহিত্যিক ওমান সিং চামলিং তাঁকে একটি টুপি উপহার দিয়েছিলেন। সেই টুপি পরেই নতুন রাজ্যের চুক্তিতে তিনি সই করবেন। গোর্খাল্যান্ডের জন্য যেকোনো মঞ্চে যেতে তিনি রাজি। বিমলের কথার জবাব দিয়েছেন পার্বত্য তৃণমূলের সভাপতি রাজেন মুখিয়া। কটাক্ষ করে তিনি জানিয়েছেন, গোর্খাল্যান্ড নিয়ে বিমল গুরুং নাটক করছেন। জিটিএতে তৃণমূল ক্ষমতায় এলে মোর্চার চুরি ফাঁস হওয়ার ভয়ে আবোল-তাবোল বকছেন। যে তৃণমূল প্রথম জিটিএ নির্বাচনে প্রার্থী দিতে পারেনি, আজ তারা মোর্চার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। বিমল আলো খুঁজছেন নিঃসীম অন্ধকারে।

 

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য