kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাকিস্তানের ‘অতি আবেগ’ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



‘চোরের মায়ের বড় গলা’ বুঝি একেই বলে! নইলে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে পরাজিত পাকিস্তান এমন উদ্ভট ও উদ্ধত আস্ফাালন দেখাবে কেন? ছয়জন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হলো। আর প্রতিবারই তাদের তর্জন-গর্জন।

প্রতিবার একই ঢঙে ‘উদ্বেগ’, ‘ক্ষোভ’, ‘নিন্দা’, ‘বিবৃতি’ কিংবা পার্লামেন্টে প্রস্তাব পাস। কাজটি কখনো করছেন তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কখনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা। রাজপথে-পার্লামেন্টে, সরকারি ওয়েবসাইটে লাগাতার ও বল্গাহীনভাবে চলছে তাদের ‘বাংলাদেশ-বিষোদ্গার’। সর্বশেষ চলল ৩ সেপ্টেম্বর। ওই দিন রাতে মীর কাসেমের ফাঁসি কার্যকর হলো। আর অমনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি, ‘আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। ’ বিচারপ্রক্রিয়ায় আক্রমণ করা হয়। অথচ উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক, শুনানি শেষে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত এ রায় দেন। পুরো বিচারপ্রক্রিয়াও ছিল পূর্ণমাত্রায় স্বচ্ছ। তার পরও এ বিচার নাকি ‘ত্রুটিপূর্ণ’! এমনকি ‘রাজনৈতিক ফায়দা লোটার’ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। মীর কাসেম ছিলেন একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা, গণধর্ষণের একনিষ্ঠ সহযোগী। কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর তৃতীয় শীর্ষনেতা। তাঁর উপাধি ছিল ‘চট্টগ্রামের কসাই’, ‘একাত্তরের জগেশঠ’। সেই কাসেমই কিনা পাকিস্তান সরকারের চোখে ‘বড় নেতা’ (সমকাল, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬)! হায় সেলুকাস! আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পাকিস্তানের এমনটাই দাবি। মজার বিষয় হলো, এ ছিল তাদের ১১তম বিবৃতি। যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড নিয়ে এর আগে আরো দশবার পাকিস্তান এরূপ আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছিল। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে পাস করেছিল নিন্দা প্রস্তাব।

পাকিস্তানের এই আনুষ্ঠানিক গাত্রদাহের শুরুটা মূলত আবুদল কাদের মোল্লার (প্রথম দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী) ফাঁসি কার্যকর দিয়ে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ওই ফাঁসি কার্যকর হয়। তার আগের দিন (১১ ডিসেম্বর) পাঞ্জাবের প্রাদেশিক পরিষদে এবং ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে ওই ফাঁসির বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব আনা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, ‘পাকিস্তানের প্রতি অনুগত ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন করায় কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে’ [দেখুন, খোদ পাকিস্তান পার্লামেন্টই কাদের মোল্লার সমস্ত কীর্তির (!) স্বীকৃতি দিচ্ছে]। এ ছাড়া ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান এ ফাঁসিকে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড ও বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যকার পুরনো ক্ষতকে উসেক দেওয়া’ বলে মন্তব্য করেন।

১ নভেম্বর, ২০১৪-এ নিজামীর ফাঁসির রায় হলো। ওই দিনই পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘বাংলাদেশ সরকার কেন অতীতের কবর খুঁড়ে পুরনো ক্ষতগুলো উন্মোচন করছে, তা বোধগম্য নয়। ’ এরপর ১৪ নভেম্বর, ২০১৪-এ কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ হলো। ১৯ নভেম্বর খাইবার পাখতুনখোয়া প্রাদেশিক পরিষদে একই প্রক্রিয়ায় নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়।

গাত্রদাহ প্রবল হয় সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির সময়। সরকারের প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দেন পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টির প্রধান এবং পরাজিত পাকিস্তানি সেনাপ্রধান জেনারেল নিয়াজির বংশধর ইমরান খান। কেবল উদ্বেগ-ক্ষোভ প্রকাশ করেই তিনি ক্ষান্ত নন। সাকার ফাঁসি বন্ধ চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তিনি চিঠি পর্যন্ত লেখেন। তিনি কৈফিয়ত চান, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্য কী? এমনকি চরম স্পর্ধায় দাবি জানান, ‘বাংলাদেশ সরকারের সাকা-মুজাহিদের অপরাধের প্রমাণ দেওয়া উচিত। ’ সাকা যে যুদ্ধাপরাধে জড়িত নয়, তার প্রমাণও নাকি তাঁর কাছে আছে। এর আগে কাদের মোল্লার ফাঁসি প্রসঙ্গে ইমরান বলেন, ‘কাদের মোল্লা নির্দোষ। যে অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, তা ভুয়া। ’

ইমরানের সব জিজ্ঞাসা ও সন্দেহে তখন পানি ঢেলে দিয়েছিলেন তাঁরই দেশের মানবাধিকার কর্মী আসমা জাহাঙ্গীর। পাকিস্তান সরকারের আচরণকে ‘ভারসাম্যহীন অতি আবেগ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের আচরণই নিশ্চিত করেছে, সাকা-মুজাহিদ তাদের এজেন্ট ছিলেন এবং পাকিস্তানের জন্য কাজ করতেন। ’ তিনি আরো বলেন, ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে পাকিস্তানের সামরিক আদালতে এবং সৌদি আরবে যেসব পাকিস্তানিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের ব্যাপারে সরকার নীরব। অথচ বাংলাদেশের বিরোধী দলের নেতাদের প্রতি কী দরদ!’

কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান, রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রীর অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মতামত, ভীতি প্রদর্শনমূলক বা সতর্কীকরণমূলক বিবৃতি আন্তর্জাতিক আইনে ‘হস্তক্ষেপ’ (intervention) হিসেবে গণ্য হয়। আন্তর্জাতিক আইনের একটি সাধারণ নীতি হচ্ছে, প্রতিটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের নিজস্ব ব্যাপারে পূর্ণ নিরপেক্ষতা মেনে চলবে।

জাতিসংঘ সনদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, প্রতিটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সম্মান দেখাবে। এক রাষ্ট্র কোনোভাবে অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপ’ করবে না। করলে (লাগাতার) জাতিসংঘ তার সদস্যপদ বাতিল করতে পারবে। রাষ্ট্রগুলো সব আন্তর্জাতিক বিরোধ জাতিসংঘের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করবে (অনু-২, ৬)।

সার্বভৌমত্বের বিষয়টিও এখানে প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, সার্বভৌমত্ব (sovereignty) হলো রাষ্টের সর্বোচ্চ ক্ষমতা, নিজস্ব নীতির ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য; যার মাধ্যমে রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও বহিঃশক্তির আক্রমণ প্রতিহত করে। আইনবিজ্ঞানের ভাষায়—এককভাবে আইন প্রণয়ন ও তা বলবতের ক্ষমতার নামই সার্বভৌমত্ব। একে বলা হয়, Supreme element of the statehood। ভূখণ্ড, জনগণ, সরকার—এ তিন উপাদান রাষ্ট্রের দেহ হলে, সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের প্রাণ। মূলত এই সার্বভৌমত্বই রাষ্ট্রকে অন্যান্য সংগঠন থেকে পৃথক করে। এর দুটি দিক—বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব (external sovereignty) ও অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব (Internal Sovereignty)। বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব হলো বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণহীনতা। আর অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের সারকথা হলো, ‘রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের আইনই চূড়ান্ত। ’

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি নিয়ে পাকিস্তানের লাগাতার বিষোদ্গার কেবল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপই নয়, এ কেবল একটি দেশের স্বাধীন বিচার বিভাগকে অমর্যাদা বা তার কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়, তা এ দেশের ‘অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের’ সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে সব ধরনের আন্তর্জাতিক আইন, প্রথা ও কূটনৈতিক রীতিনীতির বিরুদ্ধাচরণ। তর্কের খাতিরে পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী ধরে নিলাম, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া ত্রুটিমুক্ত নয়। তার পরও পাকিস্তান যা করছে, তা করার আইনগত কোনো এখতিয়ার তাদের নেই।

বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে পাকিস্তানের ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের প্রতিবাদ জানিয়েছে। চারবার পাকিস্তানি হাইকমিশনারকে তলব করেছে। তাঁদের হাতে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানোর অনুরোধ জানিয়েছে। তার পরও পাকিস্তান ‘থোড়াই কেয়ার’ করছে। বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ‘কড়া প্রতিবাদ’, ‘পাকিস্তানের হাইকমিশনার তলব’—এসব শিষ্টাচারপূর্ণ কিন্তু ‘বাধ্যবাধকতাহীন’ অনুরোধে অশিষ্ট পাকিস্তানের ভীমরতি ঘুচবে না। এখন দরকার কঠোর ও বাধ্যবাধকতাপূর্ণ (Obligatory) পদক্ষেপ। তাই বাংলাদেশের জাতিগত মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের অনতিবিলম্বে জাতিসংঘে অভিযোগ দায়ের করা উচিত। তাতে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী তারা জাতিসংঘের সদস্য হারাতে পারে। তাদের ওপর ‘অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ হতে পারে। হতে পারে আরো অনেক কিছু। কিন্তু আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি না কেন? আমরা চুপ কেন?

 

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

aftabragib@yahoo.como


মন্তব্য