kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আন্তর্জাতিক পরিসরে অন্য এক বাংলাদেশ

ফরিদুল আলম

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আন্তর্জাতিক পরিসরে অন্য এক বাংলাদেশ

গত ২৯ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপুর্ণ দিন, যেদিন বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন সফরে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ররি স্টুয়ার্ট। এর মধ্যে কেরির সফরটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

কেরির সফর ছিল মাত্র ৯ ঘণ্টার, ব্যস্ততায় ঠাসা এবং এ নিয়ে সর্বস্তরে আগ্রহ ছিল সীমাহীন। বাংলাদেশ সফরের শুরু হলো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে। এক কথায় এটি এক অনন্য ঘটনা। গত মে মাসে জাপানে জি-৭ সম্মেলনের শেষে বারাক ওবামা হিরোশিমায় পারমাণবিক বিস্ফোরণে নিহতদের স্মরণে স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভে গিয়ে বলেছিলেন, ‘হিরোশিমার ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। ’ আর মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ওবামার পর সম্ভবত মার্কিন সরকারের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শন করে পরিদর্শন বইতে যা লিখলেন, তা অনেকটা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপলব্ধিবোধকে প্রতিধ্বনিত করে।

আক্ষরিক অর্থে কেরির এই সফর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এর পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা যেতে পারে, প্রথমত, ২৯ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ভারতে অনুষ্ঠেয় ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সংলাপে অংশ নেওয়ার প্রাক্কালে তিনি বাংলাদেশে এলেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের ঘটনায় এর আগে বেশ কয়েকবার যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল তাঁর দেশের পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রস্তাব পেশ ও বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে সে ব্যাপারে কাঙ্ক্ষিত আগ্রহ প্রদর্শন না করার কারণে কেরির ব্যক্তিগত উপস্থিতির মধ্য দিয়ে সেসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে তার অবস্থান পরিবর্তন করানোর এক চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, কেরি এমন এক সময় সফর করলেন যখন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকার তাদের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে চলমান বিষয়গুলোর বাইরে নতুন করে কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না। কার্যত ওবামা সরকারের হাতে সময় আছে সব মিলিয়ে মাত্র পাঁচ মাস এবং এই সময়টার মধ্যে নতুন করে নতুন কোনো দেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে কাজ করার জন্য মোটেও সহায়ক নয়, বরং নতুন কোনো কিছুর সূচনা করা যেতে পারে মাত্র এবং যেহেতু পরবর্তী সময়ে ওবামা আর প্রেসিডেন্ট থাকছেন না, সে ক্ষেত্রে পরবর্তী সরকারের জন্য এই নতুন কিছুর সূচনার পরিবর্তে মেয়াদের অবশিষ্ট সময়টুকু নির্বিঘ্নভাবে কাটিয়ে দেওয়াটাই অধিক সমীচীন। তৃতীয়ত, নিকট অতীতের ইতিহাস থেকে যা বোঝা যায় তা হচ্ছে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির বর্তমান ধারাবাহিকতা রক্ষা করার অংশ হিসেবে যদি আমরা এই সফরকে মূল্যায়ন করি, তবে দেখব এই মুহূর্তে পারস্পরিক লেনদেনের মাধ্যমে সুবিধা আদায়ের নীতির চেয়ে ওবামা প্রশাসনের বিদায়ের আগে প্রাপ্তির পাল্লাটা ভারী করার চেষ্টা এবং সেই মনোযোগটাই বেশি। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে আমাদের নিজেদের দিক বিবেচনায় নিয়ে ভাবতে হবে, আসলে এই সফরের মধ্য দিয়ে আমরা কী অর্জন করলাম। অর্জনের হিসাব-নিকাশ করতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, জন কেরি ওবামা সরকারের শেষ সময়ের এই সফরের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন শেখ হাসিনা সরকারের প্রশংসা করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তরফ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর সফরের সূচনা করলেন, সেই সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মাধ্যমে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার, গঠনমূলক সমালোচনা ও সবার অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে শক্তিশালীকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তাঁর সফর শেষ করলেন। সফরের শেষ ধাপে ধানমণ্ডিতে এডওয়ার্ড এফ কেনেডি সেন্টারে নাগরিক সমাজ, তরুণ ও গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে এক বক্তৃতায় তিনি সন্ত্রাসবাদের কারণ হিসেবে প্রকারান্তরে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুপস্থিতিকে দায়ী করে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে আমাদের কাছে সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হচ্ছে গণতন্ত্র। সন্ত্রাসীদের পরাভূত করতে হলে আমাদের অবশ্যই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে হবে, যা সন্ত্রাসীরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। ’

এখানে আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়। আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন না থাকলেও কেরির সঙ্গে বর্তমান বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। দেশের একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী কোনো ব্যক্তি যখন একটি দেশের দূতাবাসে সে দেশের পরারাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নিজে গিয়ে হাজির হন তখন আমাদের লজ্জা পেতে হয়। অবস্থাদৃষ্টে যা বোঝা গেল তাঁর এই সাক্ষাতের মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত এমন একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারকে চাপ প্রয়োগ করার জন্য কেরিকে ম্যানেজ করার এক কৌশল। বলা বাহুল্য, এ ধরনের দাবি নিয়ে যখন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কোনো দেশের মন্ত্রীর কাছে হাজির হন তখন সেই মন্ত্রীই বা আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করতে পারেন? বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই যে আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই বিদেশিদের প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। স্বাধীনতার ৪৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও এই নব্য ঔপনিবেশিকতার বেড়াজাল থেকে আমরা খুব একটা মুক্ত হতে পারিনি। যদিও মালয়েশিয়া ও কোরিয়ার মতো রাষ্ট্র উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের অভিধা থেকে মুক্ত হয়ে বর্তমানে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে নিজেদের শামিল করেছে এবং কোনো অংশেই তাদের থেকে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কোনো সংগত কারণ ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের লক্ষ্যে নিজেদের সচেষ্ট করতে পারিনি। আর এর ফলে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিদেশিদের হস্তক্ষেপও যেন আমরা অবলীলায় মেনে নিয়েছি।

২০১২ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বার্ষিক অংশীদারি সংলাপের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের মে মাসে সে দেশের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি আর শারম্যান বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় অংশীদারি সংলাপে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারি সংলাপের গুরুত্ব ও দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নতির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নে দারুণ সাফল্য অর্জন করেছে এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বাংলাদেশের এসব অর্জনকে বৈশ্বিক পরিসরে অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য অনুকরণীয় বলেও মনে করেন। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্রমাগত সাফল্য, সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদবিরোধী নীতি, ধর্মীয় সম্প্রীতি, বিশ্ব শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে পেশাদারির সঙ্গে অংশগ্রহণ ও বিভিন্ন আঞ্চলিক ফোরামে সক্রিয় অংশগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ উৎসাহী করে তুলেছে। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের অন্যতম উৎপত্তিস্থল হওয়া সত্ত্বেও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ও সর্বসাম্প্রতিক সময়ে গুলশান ও শোলাকিয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ় অবস্থান নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের দিকটি নিয়ে ইতিবাচকভাবে ভাবতে প্রলুব্ধ করছে। আর সেই বিবেচনায় কেরির হঠাৎ এই ঝোড়ো সফর আন্তর্জাতিক পরিসরে অন্য এক বাংলাদেশকেই চিত্রিত করে।

 

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

mfulka@yahoo.com

 


মন্তব্য