kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শরণার্থী, মুসলমান মার্কেল—সবার জন্যই দুঃসংবাদ!

অনলাইন থেকে

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জার্মানির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এক স্থানীয় নির্বাচনে অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) হেরে গেছে। অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী দল অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড (এএফডি) সমর্থন পেয়েছে ২১ শতাংশ ভোটারের।

মার্কেলের দলের অবস্থান তৃতীয় স্থানে। মাত্র ১৯ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে সিডিইউ। ৩০ শতাংশ সমর্থন নিয়ে প্রথম স্থানে আছে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি। নিজের নির্বাচনী এলাকায় মার্কেল ভরাডুবি কি প্রত্যাশা করতে পেরেছিলেন? অভিবাসন প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য গড়তে তিনি চেষ্টা তো কম করেননি! কয়েক দিনের মধ্যেই বার্লিনে স্থানীয় নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচন আগামী বছর। আপাতত দেখার বিষয়, বার্লিনের নির্বাচন কী বার্তা নিয়ে আসে।

রবিবারের স্থানীয় নির্বাচনকে চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল ও তাঁর মুক্তদ্বার অভিবাসননীতির প্রতি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়েছিল। ফলাফলের পর দেখা গেল, হার হয়েছে মার্কেলের। জার্মানরা মুক্ত দুয়ার নয়, অবরুদ্ধ জার্মানিই পছন্দ করছে। গত মার্চে জার্মানির তিন রাজ্যে যে স্থানীয় নির্বাচন হয়, তাতেও ভোটাররা মার্কেলকে প্রায় লাল কার্ড দেখিয়ে দেন। অভিবাসনবিরোধী দলের প্রতি জার্মানদের আগ্রহ ওই দুই নির্বাচনেই দেখা গিয়েছিল। যদি আগামী সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন হয়, তবে এএফডি ১২ শতাংশ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হবে, সর্বশেষ জনমত জরিপ এমনই আভাস দিয়েছে। অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী দল এএফডি মাত্র ২০১৩ সালে গঠিত হয়। এরই মধ্যে দলটি জার্মান পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করার মতো অবস্থানে চলে এসেছে। এএফডি মার্কেলের চতুর্থবারের মতো চ্যান্সেলর হওয়ার সম্ভাবনা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কাও কেউ কেউ উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

অ্যাঙ্গেলা মার্কেল অভিবাসীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে একই সঙ্গে আলোচিত ও সমালোচিত। তাঁর মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে অবশ্যই মুসলিম শরণার্থীদের জায়গা দিতে হবে। না হলে তা বিশ্বে বড় সংকটের সৃষ্টি হবে। এই যুক্তিতে তিনি ২০১৬ সালের মধ্যে জার্মানিতে তিন লাখ অভিবাসীকে আশ্রয় দেওয়ার নীতি নিয়েছেন।

মার্কেল শনিবার নিজ এলাকা মেকলেনবার্গ-ভরপোমানে শেষ মুহূর্তের নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালান। তিনি এ সময় এএফডির উগ্র অভিবাসনবিরোধী মানসিকতার বিষয়ে ভোটারদের সতর্ক করে দেন। তিনি বলেন, বিভেদ সৃষ্টিকারীদের হারাতে হবে, দেশের স্বার্থেই মধ্য-ডানপন্থী জোটের নীতি সমর্থন দিতে হবে। ‘রবিবারের নির্বাচন আমাদের ভবিষ্যতের আভাস দেবে’—এমনও বলেছিলেন আত্মবিশ্বাসী মার্কেল। মার্কেল মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতময় পরিবেশ থেকে পালিয়ে আসা অভিবাসীদের ব্যাপারে জার্মানদের মানবিক হতে বলছেন। কিন্তু তাদের কাছে নিশ্চিতভাবেই মানবিকতার চেয়ে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনগুলোকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনে শরণার্থী ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ ইউরোপে সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যে ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান শুরু হয়েছে, তা থেকে দূরে নেই জার্মানি। দেশটিতে গত ছয় মাসে ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থন যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তাদের কর্মপরিধি। এএফডি এর মধ্যেই শরণার্থী ও ইসলামবিরোধী অবস্থান নিয়ে বেশ শক্তিশালী অবস্থান দখল করে নিয়েছে জার্মানির রাজনৈতিক মাঠে। নির্বাচনী প্রচারণায় তারা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও কাজে লাগাচ্ছে। রবিবারের নির্বাচনে ভালো করে এএফডির কর্মী-সমর্থকরা যথারীতি উল্লসিত। লেইফ এরিক হোম নামের এক কর্মী বিবিসিকে বলেছেন, ‘হয়তো এভাবেই চ্যান্সেলর মার্কেলের দিন শেষ হবে। ’ জার্মানিতে মার্কেলের জন্য যখন দুঃসংবাদটি রচিত হয়, তিনি তখন চীনে জি-২০ সম্মেলন উপলক্ষে চীনে অবস্থান করছেন। চীন থেকে মার্কেল বলেছেন, ‘আমরা জার্মানিতে কারো সুযোগই বন্ধ করতে চাই না। শরণার্থীদের জন্য সহায়তা অব্যাহত থাকবে। আমরা কিছু অঞ্চলে সত্যিকার অর্থেই সামাজিক উন্নয়ন দেখতে পাচ্ছি। ’

মার্কেল যতই বলুন, তাঁর বিরোধীরা নিরাপত্তা, সামাজিক মূল্যবোধ, অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে শরণার্থীদের সম্ভাব্য প্রভাবের ব্যাপারে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। আগে শরণার্থীদের জার্মানিতে আসার বিষয়ে সমর্থন দিয়েছেন এমন অনেকেই এখন দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আতঙ্কিত। মার্কেল ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আমরা পারব। জার্মানি জার্মানিই থাকবে। ’ কিন্তু অনেকেই মার্কেলের কথায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না। সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে জার্মানিতে একটি অস্বস্তি আগে থেকেই ছিল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আইএসের উগ্রপন্থায় উদ্বুদ্ধ শরণার্থীদের পরিচালিত সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা। স্থানীয় জার্মানদের কথা হচ্ছে, তারাও শরণার্থীদের সাহায্য করতে চায়; কিন্তু সবার আগে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শরণার্থীদের সংখ্যা আরো বেড়ে গেলে যে বড় সামাজিক পরিবর্তন আসবে তা জার্মানির পক্ষে গ্রহণ করা কঠিন হবে।

জার্মান সমাজে শরণার্থীদের একীভূতকরণের জন্য কারিগরি শিক্ষা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অনেক শরণার্থী এর মধ্যেই নিজেদের তৈরি করতে লেগে পড়েছে। তবে কারিগরি প্রশিক্ষক আর্নল্ড অ্যারোনলাইটনা বলছিলেন, ‘মার্কেল ঠিক কাজই করেছেন। তবে এখন আমাদের এক ধাপ পেছনে যাওয়া উচিত। শরণার্থীদের সংখ্যা সীমিত করা হলে হয়তো বিতর্ক বাধবে। কিন্তু আমাদের তা করতে হবে। ’ জার্মানিতে চাকরি করতে হলে একজন শরণার্থীকে অন্তত তিন বছর নিজেকে তৈরি করতে হবে। অথচ তারা এখনো নিশ্চিত জানে না, জার্মানিতে শেষ পর্যন্ত তাদের থাকা হবে কি না। কারণ সরকার যতই মানবিকতার কথা বলুক, সাধারণ মানুষের মতো দ্রুত বদলে যাচ্ছে! 

বিশ্লেষকরা বলছেন, সমর্থনে ধস ঠেকাতে চাইলে এখন মার্কেলকে জার্মানদের কাছে অন্তত দুটি বিষয় প্রমাণ করতে হবে। এক. তিনি দীর্ঘ মেয়াদে শরণার্থীদের আগমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন এবং দুই. তিনি জার্মানিকে নিরাপদ রাখতে পারবেন।

 

সূত্র : বিবিসি ও এএফআর


মন্তব্য