kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ডায়াবেটিস সচেতনতা ও ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ডায়াবেটিস সচেতনতা ও ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম

আজ ৬ সেপ্টেম্বর, জাতীয় ডায়াবেটিস দিবস। এই দিনটিতে যাঁকে সবার আগে মনে পড়ে, তিনি হলেন জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম।

মানবতাবোধ দ্বারা তাড়িত গতিশীল জীবনের অধিকারী ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ছিলেন বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে এমন একজন প্রতিভাধর ব্যক্তি, যাঁর মধ্যে ঘটেছিল বহুমুখী মানবীয় গুণের সমাহার। তিনি আজীবন নিজেকে জড়িত রাখেন মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের ব্যক্তি ও সমাজ থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে তাঁর এমন একটি মর্যাদাশীল আসন তৈরি হয়েছে, যা অর্জন অন্য কোনো চিকিৎসা-সমাজবিদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে চিকিৎসাসেবাকেই জীবনের প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে নিজেকে একজন জাত শিক্ষক, চিকিৎসা-সমাজবিদ, সমানুভূতিপ্রবণ প্রাজ্ঞ চিকিৎসক, অপ্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠক ও সুদক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে দেশ ও জাতির সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। বহুমুখী চিন্তাশীল ও বিরল মেধাশক্তির অধিকারী ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্বীয় চিকিৎসক পেশার গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর বহুমুখী কর্মোদ্যম ও স্পৃহাকে সমাজসেবার বৃহৎ পরিসরে পরিব্যাপ্ত করে নিজের সক্ষমতা আরো ব্যাপক ও সফলভাবে বিকশিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর প্রধানতম সাফল্য চিকিৎসা পেশাকে চিকিৎসা সমাজসেবায় রূপান্তর করা।

সব সৃজনশীলতায় এমন একটা ভাবদর্শন থাকে, যা অয়োময় প্রত্যয় ও প্রতীতির নেপথ্য নায়ক হিসেবে অনির্বচনীয় ভূমিকা পালন করে। সেই বলিষ্ঠ বোধ ও বিশ্বাস, সেই অনুভব-অনুপ্রেরণা, সেই সুকৃতির সুষমা ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে; আর ব্যষ্টি হয় সমষ্টির শক্তি। যে মহৎ কর্মোদ্যোগ দেশ ও জাতির সীমানা পেরিয়ে মানবসমাজ ও সভ্যতার জন্য অনুপম আস্থা ও সেবার আদর্শ হিসেবে প্রতিভাত হয়, তা আবার নিজেই একটা ভাবাদর্শ নির্মাণ করে থাকে। জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম (১৯১১-১৯৮৯) এমন এক ভাবাদর্শের সাধক ও উদ্গাতা, যা বাংলাদেশে ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানবভাগ্যে আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচ্য।

একই সঙ্গে স্বপ্ন দেখা ও সর্বাঙ্গ সুন্দরভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার মোহনীয় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন ডা. ইব্রাহিম। মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত এই মহানুভব মানুষটি মানবতার মহান উচ্চ আদর্শের প্রতি ছিলেন আজীবন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও নিবেদিত চিত্ত। বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক সময় এ-জাতীয় মানুষের মধ্যে বাস্তববুদ্ধির কিছুটা ঘাটতি থাকে, যার ফলে তাঁদের আদর্শবাদ জাগতিক উপযোগিতার ক্ষেত্রে আপাত সাংঘর্ষিকতায় তাঁরা হয়তো কাঙ্ক্ষিত কোনো অবদান প্রত্যক্ষভাবে রাখতে পারেন না। বিস্ময়ের ব্যাপার, ডা. ইব্রাহিম ছিলেন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি সেবার যে উচ্চ আদর্শ তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে প্রতিনিয়ত সঞ্চারিত করতে সচেষ্ট ছিলেন, তা ছিল বাস্তবতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। ‘শুধু উপদেশ, আদেশ, নির্দেশ নয়, আপন দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি তাঁর স্বপ্ন, কল্পনা ও আদর্শকে বাস্তব রূপ দিতেন। কর্তব্য পালনে, শৃঙ্খলা রক্ষায়, ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করায়, সময় মেনে চলায়, স্নেহ-মমতা ও সহানুভূতিতে তাঁর মতো বড় মাপের মানুষ যেকোনো দেশে যেকোনো সমাজে বিরল। ’ বস্তুত অদম্য প্রাণশক্তি, ইস্পাত কঠিন সংকল্প ও সাংগঠনিক বিচক্ষণতার সঙ্গে শ্রম ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যোগ্যতার মহামিলন ঘটেছিল একসঙ্গে এই বহুমুখী প্রতিভাশালী ব্যক্তিত্বের বলয়ে। কোনো সভায় তাঁকে কোনো দিন দেরি করে আসতে দেখা যায়নি। কর্তব্য যে ধর্ম—তা অধ্যাপক ইব্রাহিম তাঁর নিজের জীবনে প্রতিফলিত করেছিলেন। তিনি ধর্মপরায়ণ ছিলেন; কিন্তু তাঁর কোনো গোঁড়ামি ছিল না। তাঁর সফলতার ক্ষেত্রে অন্যান্য গুণের সঙ্গে সঠিক নেতৃত্বই মূল ভূমিকা পালন করেছে।

যে দেশ ও সমাজে সীমাহীন সার্বিক (অর্থনৈতিক, চিন্তাচেতনার, সহনশীলতার, সাধনার) দারিদ্র্যের কারণে বড় কিছু করা যায় না, মহৎ কিছু গড়ে ওঠে না এবং যেখানে চিন্তার দৈন্য (Lack of Imagination), উদ্যম-উদ্যোগের অভাব (Lack of Initiative) এবং ত্যাগ শিকারের অনীহা (Lack of Sacrifice) অন্যতম প্রতিবন্ধকতা, সে দেশে জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম প্রমাণ করে দিয়েছেন উদ্দেশ্য যদি মহৎ হয়, লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, প্রচেষ্টা যদি আন্তরিক হয়, তবে স্বল্পোন্নত দেশেও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি তথা বারডেমের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। ১৯৫৬ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ডায়াবেটিস চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রথম বছরে মাত্র ৩৯ জন রোগীর চিকিৎসা করা সম্ভব হয়েছিল। সেখানে এখন শুধু বারডেমেই চিকিৎসাধীন নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা পাঁচ লাখের কাছাকাছি। শুধু ঢাকা শহর ও এর উপকণ্ঠে নয়, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ডায়াবেটিস চিকিৎসাকেন্দ্র আজ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সততা থাকলে অঙ্কুর কী করে মহামহীরূহের রূপ লাভ করতে পারে, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠান শাহবাগের বারডেম তার উদাহরণ।

জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ছিলেন করুণায়, মানবতায়, সেবায়, বলিষ্ঠতায়, দানে, ধ্যানে, ব্যক্তিত্বে এক বিরাট কর্মীপুরুষ। চিন্তায় স্থির, পরিকল্পনায় ধীর, কর্মে বীর তিনি ছিলেন সাধনাপূর্ত জীবনের অধিকারী। একজন আদর্শবাদী স্বপ্নস্রষ্টা এবং তাঁর ছিল সাধনায় সিদ্ধি লাভের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তবমুখিতা ও কঠোর পরিশ্রম ক্ষমতা। তাঁর একটি অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল—যাঁরা তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন তাঁদের মধ্যে তিনি তাঁর অফুরন্ত উৎসাহ-উদ্যম, অগাধ বিশ্বাস ও অসাধারণ কর্মশক্তির সামান্য হলেও সঞ্চারিত করে দিতে পারতেন। ফলে সরকারের ও সরকারের বাইরে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা পদে ও বৃত্তিতে যাঁরা নিয়োজিত, তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্য ও সহযোগিতা তিনি সর্বদাই পেয়েছেন।

শুধু ডায়াবেটিস নয়, যেকোনো রোগের চিকিৎসায় প্রচলিত ধরনের গতানুগতিক চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না থেকে গবেষণার মাধ্যমে কী করে সর্বাধুনিক ও স্বল্পব্যয়ে চিকিৎসার সুযোগ সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় সে ব্যাপারে ছিল জাতীয় অধ্যাপক ডা. ইব্রাহিমের নিরন্তর প্রয়াস। বারডেম বর্তমানে বস্তুত জেনারেল হাসপাতাল বলে পরিচিতি পেলেও এ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগ নির্ণয়-নিরূপণ-নিয়ন্ত্রণ-প্রতিরোধ—সব বিষয়ে নিরন্তর গবেষণা কার্যক্রম বিদ্যমান। চিকিৎসায় ও ক্লিনিক্যাল স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে উচ্চতর গবেষণার প্রতি ডা. ইব্রাহিমের ছিল সজাগ দৃষ্টি এবং সে কারণে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অধিকাংশ প্রকল্প গবেষণা-আশ্রয়ী। ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও এ রোগের ব্যাপারে সমাজসচেতনতা বৃদ্ধির নানা কৌশল-পদ্ধতি-প্রক্রিয়া অনুসন্ধান ও প্রয়োগে নিবেদিত। ডায়াবেটিক রোগীদের পায়ের ক্ষত চিকিৎসা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় বিবেচনা করেই তিনি পৃথক ফুট কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ডায়াবেটিক রোগীরা যাতে পরিবার ও সমাজের কাছে বোঝা না হয়, আজীবনের এই রোগভোগকারী যাতে বেকার হয়ে বোঝা না হয়ে দাঁড়ায় সে জন্য ডায়াবেটিক রোগীদের পুনর্বাসন ও তাদের জন্য কর্মসৃজন প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জুরাইনে নিজের ক্রয় করা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে। এসব বিষয়ের প্রতি তাঁর সূক্ষ্ম সুদৃষ্টি ছিল বলেই তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাস্থ্থ্যসেবা খাতের প্রবাদপুরুষ এবং একজন সত্যিকারের Missionary and Visionary. বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সরকারি খাতের পর অন্যতম স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি মেলবন্ধন (Public-Private Partnership) প্রয়াসের প্রধানতম সফল উদাহরণ।

যেসব বিরল ব্যক্তিত্ব তাঁদের স্বপ্ন আর শ্রম, ত্যাগ আর তিতিক্ষা, সচেতনতা আর কর্তব্যবোধ দ্বারা এই বাংলায় আমাদের এই প্রজন্মের ও মূল্যবোধ উন্নত করার বলিষ্ঠ প্রয়াস নিয়েছেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম তাঁদেরই একজন। তাঁকে আমরা আবিষ্কার করি, তাঁকে আমরা খুঁজে পাই, এ দেশের মানুষের উন্নয়ন প্রকল্পে তাঁর সর্বনিম্ন চিন্তার গভীরে। তিনি ছিলেন একাধারে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাবিদ, চিকিৎসা-সমাজবিদ, অসাধারণ মানুষ, যিনি আমাদের যাত্রাপথ আলোকিত করে গেছেন। তাই অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম আমাদের ইতিহাসে একজন চিরবরেণ্য ব্যক্তিত্ব।

 

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির চিফ কো-অর্ডিনেটর


মন্তব্য