kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এডিপি বাস্তবায়নের যত কথা

এ এম এম শওকত আলী

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



এডিপি বাস্তবায়নের যত কথা

দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথা অনুসৃত হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি সংক্ষেপে এডিপি শব্দটি এখন প্রচলিত।

মূলত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পাঁচ বছরমেয়াদি উন্নয়ন কর্মকৌশলসহ লক্ষ্যমাত্রা ও ধারণাগত অর্থ সংস্থানের চিত্র পাওয়া যায়। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বছরওয়ারি অনুমোদিত প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ করা হয়। অনুমোদিত প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে কিছু বিতর্কও হয়। কিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দের অপ্রতুলতাই বিতর্কের মূল বিষয়। অপ্রতুলতার পেছনে রয়েছে সরকারের সামর্থ্য। আয়করসহ রাজস্বের অন্যান্য উৎসই হয় সরকারের অর্থ জোগান দেওয়ার ক্ষমতা। সার্বিকভাবে রাজস্ব আদায় হ্রাস পেলে সরকারের সামর্থ্য কম হয়। অতীতে সরকারি রাজস্ব ছাড়াও বিদেশি অর্থদাতাদের কাছ থেকেও প্রকল্পের অর্থ সংগ্রহ করা হতো। এখনো তাই হচ্ছে। তবে নির্ভরতা অনেক হ্রাস পেয়েছে। কোনো প্রকল্পই শতভাগ বিদেশি অর্থায়নে হয় না। এতে সরকারও কিছু অর্থের জোগান দিয়ে থাকে। বিদেশি সাহায্য সব ক্ষেত্রেই শর্তযুক্ত হয়। যে প্রকল্পে বিদেশি অর্থায়ন বেশি থাকে, সে প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর সংশ্লিষ্ট বিদেশি সংস্থার নিয়ন্ত্রণও বেশি থাকে। কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি সংস্থা কর্তৃক আরোপিত শর্তের ব্যত্যয় ঘটলে প্রতিশ্রুত অর্থ বাতিল বা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। শেষোক্ত ক্ষেত্রে শর্ত পূরণের পরই অর্থ পাওয়া যায়। কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগেও প্রকল্পের অর্থছাড় হয় বাতিল অথবা স্থগিত করা হয়। এ ধরনের উদাহরণ সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও এ নিয়ে কিছু অভিযোগের কথা প্রায় প্রতিবছর শোনা যায়। অন্যদিকে শতভাগ সরকারি সূত্রে বরাদ্দকৃত অর্থ প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও অর্থ বরাদ্দ থেমে যায় না। সরকারি অর্থায়নের বিষয়েও একই ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়।

যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয় করতে প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী সরঞ্জাম ক্রয়ের মাত্রাও কমবেশি হয়। সাধারণত অবকাঠামোনির্ভর প্রকল্পেই সরঞ্জাম ক্রয় করার মাত্রার প্রয়োজন বেশি থাকে। বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পে পরামর্শকসহ সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নীতিমালা বা প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ নীতিমালা অনুসরণে ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট বিদেশি সংস্থা অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানায়। সংস্থার নীতিমালায় এ সম্পর্কে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ক্রয়াদেশ বা দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করতে হয়। বিদেশি প্রকল্পের দরপত্রের চূড়ান্ত অনুমোদন সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থাই প্রদান করে। তবে এর আগে সরকারি অনুমোদনেরও প্রয়োজন রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থা আপত্তি উত্থাপন করে। এসব ক্ষেত্রে প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের স্বার্থে সরকার সংশ্লিষ্ট বিদেশি সংস্থার সিদ্ধান্তই মেনে নেয়। তবে এ ধরনের উদাহরণ বিরল। কিছু ক্ষেত্রে সরকার নিজস্ব অর্থায়নেই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। উদাহরণ হলো চলমান পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প। অতীতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সংস্থা সরকারি ক্রয়ের দায়িত্ব পালনে রত ছিল। এ সময় সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নীতিমালাও ছিল। আশির দশকের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত দপ্তর বিলুপ্ত হয়। শতভাগ সরকারি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে প্রথমে সরকারি ক্রয়বিধি ও পরে সরকারি ক্রয় আইন প্রণীত হয়। এখন এটাই সব সরকারি সংস্থা অনুসরণ করে। বলা হয় যে এ বিধি ও আইন বিদেশি সাহায্য দাতাগোষ্ঠীর ক্রয় নীতিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এ সত্ত্বেও এতে একটি বিধান রয়েছে। তা হলো বিধি ও আইনের সঙ্গে বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পসংক্রান্ত নীতিমালার সংঘাত হলে প্রকল্প যদি বিদেশি অর্থায়নে হয়, তাহলে বিদেশি নীতিমালাই অনুসরণ করতে হবে। এ দুয়ের মধ্যে সংঘাতের কোনো উদাহরণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কারণ বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পে বিদেশি নীতিমালাই অনুসরণ করা হয়।

এডিপিভুক্ত প্রকল্পের অর্থ ব্যয় নিয়েও কিছু বিতর্ক প্রতিবছরই গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। বলা হয় ব্যয়ের শ্লথগতি। অর্থাৎ প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ৩০ আগস্ট প্রকাশিত এক খবরে ২০১০-১১ থেকে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত বছরওয়ারি এক লেখচিত্র দৃশ্যমান ছিল। তুলনামূলক এ চিত্রে দেখা যায় যে এ বছর জুলাই মাসে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় হয়েছে মাত্র ০.৫৬ শতাংশ। যা পূর্ববর্তী সাত বছরের চেয়ে সর্বনিম্ন। ৫৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে অর্থ ব্যয় হয়েছে। বাকি ২৭টিতে কোনো ব্যয় হয়নি। এ ধরনের সোজা হিসাবে প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় না। বরাদ্দকৃত সম্পূর্ণ অর্থ কোনো সময়ই মন্ত্রণালয় বা বিভাগ প্রথমেই পায় না। অর্থ ছাড় করার দায়িত্ব অর্থ বিভাগের। এ ছাড়া অন্য প্রক্রিয়াও রয়েছে। অর্থ ছাড়ের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়। প্রকল্পের অর্থ চার কিস্তিতে ছাড় অর্থাৎ ব্যয় করার নিয়ম আছে। আশির দশকের আগে প্রতি কিস্তির অর্থ ছাড়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠাতে হতো। অর্থ ব্যয় অর্থাৎ বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার স্বার্থে এ প্রথা বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। এর আওতায় প্রথম তিন কিস্তির অর্থ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ছাড় করতে ক্ষমতাবান। চতুর্থ কিস্তির জন্য প্রথম তিন কিস্তির হিসাবের বিবরণসহ পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পরই চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড় করা হয়। তবে প্রথম তিন কিস্তির অর্থ ব্যয় নিয়মমাফিক হয়েছে কি না তা অর্থ মন্ত্রণালয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরই অর্থ ছাড় করা হয়।

এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময়ের প্রয়োজন হয়। কারণ চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড়ের প্রস্তাব বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রথমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এ পর্যায়েও হিসাবের বিবরণ নিয়মসিদ্ধ কি না তা পরীক্ষা করা হয়। প্রথম তিন কিস্তির অর্থ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ছাড় করার ক্ষমতা রাখলেও এ পর্যায়েও কিছু দেরি হয়। অর্থ ছাড়ের প্রস্তাব প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা থেকে পাঠাতে হবে। মন্ত্রণালয় প্রস্তাব পাওয়ার পর সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। অনেক সময় বাস্তবায়নকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে অর্থ ছাড়ের প্রস্তাব অনুমোদনে দেরি হয়। একই যুক্তি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এরা কিছু ক্ষেত্রে অহেতুক চিঠি চালাচালি করতে অভ্যস্ত। অর্থ ছাড়ের পরবর্তী পর্যায়ে ক্ষেত্রভেদে দরপত্র আহ্বানও দেরি হয়। এর বহু কারণ রয়েছে। দরপত্র আহ্বান প্রযোজ্য আইন ও বিধি ও ক্ষেত্রভেদে বিদেশি সংস্থার প্রচলিত নীতিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। এরপর নির্ধারিত সময়ের পরে দরপত্রগুলো মূল্যায়ন করার বিষয় রয়েছে। এ ধরনের মূল্যায়ন সাধারণত কমিটির মাধ্যমে করা হয়। কমিটির মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও দরপত্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি নানা ধরনের ওজর-আপত্তি করে। তাদের লিখিত আপত্তি নিষ্পত্তি করতে হয়। এ ছাড়া রয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তদবির। সব মিলিয়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থা অনেকটা চাপের মুখে থাকে। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যখন তাঁদের পছন্দের দরপত্রের পক্ষে নানা কথা বলেন। যে ২৭টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ জুলাই মাসে বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে অর্থ ছাড় হয়েছে কি না বা অর্থ ছাড়ের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগে পাঠানো হয়েছে কি না তা দেখতে হবে। জুন ৩০ অর্থবছর সমাপ্তির দিন। মাত্র এক মাসে খুব বেশি অর্থ ব্যয় করা সম্ভব নয়। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দিতে হবে। গত ২০ বছরের ব্যয়ের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে এডিপির বরাদ্দ ব্যয়ের মাত্রা তৃতীয় ও চতুর্থ কিস্তির পরে হয়। এটাই বাস্তবতা, যা মেনে নেওয়া ভালো। আর এ কথাও মনে রাখতে হবে যে ব্যয়ের মাত্রাই এডিপি বাস্তবায়নের সফলতার পরিচয় বহন করে না। ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তবে কাজের অগ্রগতিও দেখা প্রয়োজন। এ দুয়ের মধ্যে সংগতি থাকা বাঞ্ছনীয়।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


মন্তব্য