kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উচ্চশিক্ষা নিয়ে চিন্তা

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



উচ্চশিক্ষা নিয়ে চিন্তা

জঙ্গিবাদে শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়ার এমন এক সন্ধিক্ষণে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো। গত বছরের তুলনায় এবারে পাসের হার ৫.১০ শতাংশ বেড়েছে।

জিপিএ ৫ বেড়েছে ১৫ হাজার ৩৮২টি। এখন শুরু হতে যাচ্ছে ভর্তিযুদ্ধ। পাসের হার বাড়ার কারণে প্রতিযোগিতা একটু বেশিই হবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এখন চিন্তিত পছন্দমতো বিশ্ববিদ্যালয় ও পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হওয়া নিয়ে। সবাই ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না সত্য, তবে কেউ উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না। কেননা আমাদের উচ্চশিক্ষার দ্বার অনেকটা অবারিত। সরকারি হিসাব মতে, বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪২টি এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৪টি। এক রকম পাল্লা দিয়ে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে নতুন নতুন বিষয় ও শিক্ষার্থী সংখ্যা। সুযোগ তৈরি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন বিষয়ে পড়ার। আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং চাহিদা বিবেচনা করে আমরা শিক্ষার্থী তৈরি করছি। কিন্তু শিক্ষার্থী তৈরি করার জন্য পর্যাপ্ত ও সর্বশেষ সংস্করণের বই এবং ভালো শিক্ষকই যথেষ্ট নয়, বরং আরো অনেক কিছু প্রয়োজন। নতুন বই আমাদের শিক্ষার্থীদের নতুন বিষয়ে জানার ক্ষেত্র তৈরি করছে সন্দেহ নেই; কিন্তু বই দিলেই চলবে না। তাদের অন্য বৃত্তিগুলো সুন্দর ও সুচারুরূপে বিকশিত করার জন্য যেসব উপাদান দরকার, তার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেখতে হবে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, তার অবস্থান এবং এর সামগ্রিক পরিবেশের বিষয়টি। বেড়ে ওঠার জন্য গাছের যেমন পরিচর্যা দরকার, তেমনি মানুষের বেড়ে ওঠার জন্যও পরিচর্যা অপরিহার্য। অপরিপক্ব গাছ যেমন কাজে আসে না এবং ফল দেয় না, তেমনি সত্যিকার মানুষ হয়ে বেড়ে না উঠলে আমাদের লাভ হবে না। মোটা দাগে শিক্ষার্থীদের আমরা এখন কিভাবে তৈরি করব, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। সময় এসেছে বহু বিষয় সংস্কারের, সংশোধনের, পরিবর্তনের ও নতুন বিধিবিধান আরোপের।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষাসহ শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি তথা ডিজিটাল পদ্ধতির প্রয়োগ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অহেতুক ভোগান্তি ও হয়রানি থেকে রক্ষা করে আসছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে আমাদের প্রচেষ্টা ছিল অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ। আমাদের প্রচলিত ধারণার বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া হামলা থেকে আমরা পরিষ্কার যে জঙ্গিবাদ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ পর্যন্ত সংখ্যার বিচারে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিবাদের বিস্তার বেশি হলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এর বিস্তার ব্যাপকভাবে ঘটতে পারে। জঙ্গিবাদ বিষয়টি সর্বাত্মক এবং সর্বত্র—এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা এখন শ্রেয়। আমরা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম সহজীকরণে তৎপর হয়েছি এবং এর সুফল পদে পদে পাচ্ছি; কিন্তু তাদের মানসিক বিকাশ, সুকোমল বৃত্তির বহিঃপ্রকাশ এবং তাদের গতিবিধির ওপর ভালোভাবে লক্ষ রাখতে সমস্যা হচ্ছে। আমাদের খারাপ লাগার কথা, আজ আমাদের প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীদের প্রতি ওয়াচডগের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক একাধারে ১০ দিন অনুপস্থিত থাকলে তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে তাদের তালিকা তৈরি করছি আমরা। তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছি। শিক্ষার্থী ও তার অভিভাবক আজ বড় ভীতির মধ্যে রয়েছেন। যেকোনো কারণে শিক্ষার্থী অনুপস্থিত হতে পারে। সেটি যৌক্তিক কারণে হলে সমস্যা নয়। কিন্তু অনুপস্থিতি যদি জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে ভাবার বিষয় ও ভয়ের কারণ। কেননা সাম্প্রতিক সময়ে অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা দেখি দীর্ঘদিন অনুপস্থিতিতে থাকা শিক্ষার্থীরা জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত। তবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হয়েছে। দেশে বিদ্যমান জঙ্গি তৎপরতা নিরসনে এবারে যারা বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাচ্ছে, তাদের জন্য আমরা কঠোর নির্দেশনা তৈরি করতে পারি। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী অনেকটা আক্ষেপের সুরে বলেছেন, আমরা যদি মনে করি ২০ জন শিক্ষার্থী ভালো, তাহলে কেন আমরা ২০ জনকেই ভর্তি করাচ্ছি না। তাঁর উক্তি অনেক গুরুত্ব বহন করে। তবে কিভাবে আমরা শিক্ষার্থী নির্বাচন করব তা নিয়ে এখন নতুন করে ভাবতে পারি। বলার অপেক্ষা রাখে না, যাই ভর্তি করি না কেন, বিদ্যমান যোগ্যতা একমাত্র মেধা। এর বিকল্পও নেই। কিন্তু এর বাইরে আরো কিছু ভাবতে পারি। শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময় এখন কঠোর নির্দেশনা থাকা জরুরি। আমাদের দরকার শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সম্পর্কে পুরো ডাটাবেইস। সাধারণ ও অতি প্রয়োজনীয় তথ্যের পাশাপাশি এমন কিছু তথ্য জানতে হবে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থী সম্পর্কে মেধার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা যায়। সম্ভব হলে তার ওপর মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা চালানো যেতে পারে। তার শখ, খেলাধুলাসহ সাংস্কৃতিক বিষয়ে আগ্রহ ও অনীহার বিষয় জানা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের এক অংশ মাদকসহ বিভিন্ন নেশায় মত্ত। এ বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া দরকার। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে এক ধরনের অঙ্গীকারনামা নেওয়া যেতে পারে, যা হবে কঠোর ও কঠিন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা হয়। ওরিয়েন্টেশন দেওয়া হয় শুধু শিক্ষার্থীদের। এ কার্যক্রমে অভিভাবকদের যুক্ত করা উচিত। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে অনেক নিয়মকানুুন জানতে পারবেন। গতানুগতিক দায়িত্বের বাইরে আরো কিছু করার আইনগত ভিত্তি থাকা ও দায়িত্ব নেওয়ার বিষয় থাকতে হবে। আমাদের করণীয় এ বছরে পাস করা শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োগ করতে পারলে সচেতন ও প্রতিরোধের ক্ষেত্র তৈরি হবে। আশা করি আমরা এর ফল পাব।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com


মন্তব্য