kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আরো একটি সান্ত্বনাহীন মৃত্যু

ফরিদুর রহমান

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আরো একটি সান্ত্বনাহীন মৃত্যু

মেয়েটি দর্জির দোকানে গিয়েছিল। যেমন আমাদের মেয়েরা তাদের পছন্দের জামাকাপড় তৈরি করাতে যায়।

আমাদের বোনেরা যেমন একজন ভালো পোশাক নির্মাতার খোঁজে অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে এসে হাজির হন—ঠিক তেমনই। কারিগরের কাছে কাপড় দেওয়ার পাশাপাশি অনেকটা বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁরা সমর্পণ করেন নানা ব্যক্তিগত তথ্য। রিশার মাও তা-ই করেছিলেন। তিনি জানতেন না, দর্জির ছদ্মবেশে ওত পেতে বসে আছে একজন ঘৃণ্য ঘাতক।

গত ২৪ আগস্ট একটি স্কুলের সামনে জনবহুল সড়কে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় ঘাতক ওবায়দুল ছুরির আঘাতে রক্তাক্ত করে ফেলে ১৪ বছর বয়সের সম্ভাবনাময় কিশোরীর শরীর। মৃত্যুর পর জনতা তাকে ধরিয়ে দিয়েছে। আমরা শুধু দিনের পর দিন অসহায়ের মতো লক্ষ করছি, যে সমাজে, যে রাষ্ট্রে আমরা বসবাস করছি তা কোনোভাবেই আর নারীদের জন্য, শিশুদের জন্য, লেখক-শিল্পী-সাংবাদিকসহ মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য নিরাপদ নয়।   

হত্যার মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, আসামিদের গ্রেপ্তার করে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ও বিচারের মধ্য দিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি আমরা নিয়মিত শুনতে অভ্যস্ত তা যেন ক্রমেই দূরবর্তী স্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। সাগর-রুনি থেকে তনু-মিতু ও সাম্প্রতিককালের আফসানা পর্যন্ত অগণিত ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমরা অনেক আশ্বাস পেয়েছি। কিন্তু আশ্বাসের ওপর মানুষের বিশ্বাস দ্রুত কমে আসছে। এক ধরনের অসহনীয় অক্ষমতা ক্রমেই আমাদের গ্রাস করে ফেলছে।

রাজীব হায়দার, অভিজিৎ, নিলয় নীল, দীপন কিংবা নাজিমুদ্দিন সামাদের মতো লেখক-প্রকাশক-সাংবাদিক হত্যা, দেশব্যাপী ইমাম-পুরোহিত-যাজক ও ধর্মগুরু হত্যা, ইতালি ও জাপানের নাগরিক হত্যার পর হত্যাকারীদের শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তারের ব্যাপারে যে ঢিলেঢালা ভাব দেখা গেছে তাতে হত্যাকারীরা প্রকারান্তরে উৎসাহিত, এমনকি অনুপ্রাণিত বোধ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তারাও সে সময় বেশ নিশ্চিন্তই ছিলেন বলে মনে হয়। কিন্তু ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান ঘটনা সেই আস্থার ভিত্তিভূমি নড়িয়ে দিয়েছে। এর পরপরই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পুলিশের পক্ষ থেকে পর পর বেশ কিছু সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে নিহত ও ধরা পড়াদের মধ্যে আগের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজনের সন্ধান পাওয়া গেছে। পুলিশ যদি ক্ষমতাধরদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে, প্রবল প্রতিপক্ষের ভয়ে ভীত না হয়ে ও জাগতিক লাভের প্ররোচনার ঊর্ধ্বে উঠে কর্তব্য পালন করে, তাহলে একজন অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে পরের অপরাধীর জন্য উদাহরণ রেখে যেতে পারে।      

পুলিশের পক্ষে নিশ্চয়ই সব হত্যাকারী, চোর-ডাকাত, ধর্ষক, লুটেরা, প্রতারক ও ছিনতাইকারীকে তাত্ক্ষণিকভাবে পাকড়াও করে আদালতে হাজির করা সম্ভব নয়। লোকবল, প্রাধিকার, যানবাহন সংকট, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ইত্যাদি নানা দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হয়তো দ্রুত ও সময়োচিত পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রেই সাফল্যের পরিচয় দিতে পারেনি। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার চেয়ে আন্তরিকতার অভাব নিঃসন্দেহে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। ফলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বিপুল আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্টদেরই উদ্যোগ নিতে হবে।

সরকারের গৃহীত নীতি, ঘোষিত নানা কর্মসূচি ও আইনকানুনের কড়াকড়ি আরোপের হুমকি-ধমকি সত্ত্বেও নারী ও শিশু, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের জীবনমান ও নিরাপত্তার বিষয়টি যে এখন পর্যন্ত তেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয় না, তা গত কয়েক বছরের নারী ও শিশু নির্যাতনের বাস্তব অবস্থার দিকে চোখ ফেরালে সহজে বোঝা যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জনসহ বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর অগ্রযাত্রা লক্ষ করা গেলেও সম্পদ ও সম্পত্তিতে বঞ্চিত হওয়ার কারণে পরিবার থেকেই নারীর প্রতি বৈষম্যের সূত্রপাত ঘটে। ফলে শৈশব থেকেই পুরুষশাসিত সমাজে ছেলেরা মেয়েদের অধস্তন বলে ভাবতে শুরু করে। এ অবস্থা যদি দূর না করা যায়, তাহলে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও নারীর ক্ষমতায়ন স্লোগানসর্বস্বই হয়ে থাকবে।  

দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুললে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো বলবেন, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। পুলিশের বড় কর্তারাও সহজেই বলে ফেলতে পারেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন কোনো অবনতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। পরিসংখ্যানবিদরা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করে দিতে পারেন দেশের আইনশৃঙ্খলার সূচকে এই মৃত্যু শতকরা হিসাবে শূন্য দশমিকের পরে বড় অঙ্কের কোনো সংখ্যা নয়। কিন্তু যে মায়ের বুক আকস্মিক শূন্য হয়ে যায়, যে বাবার বড় আদরের আশ্রয় এক নিমেষে খালি হয়ে যায় এবং যে ভাই বা বোনের নিত্যদিনের ভালোমন্দের সঙ্গী হঠাৎ হারিয়ে যায়, তাদের কাছে তা শতকরা ১০০ ভাগ। পরিসংখ্যানের কোনো কারচুপিতেই এই অপূরণীয় ক্ষতি কোনো দিনও পূরণ হওয়ার নয়। সুরাইয়া আক্তার রিশার সহপাঠী, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক ও প্রতিবাদী সাধারণ মানুষের সঙ্গে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীও হত্যাকারীর গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নিয়েছেন। এই সম্মিলিত ক্ষোভ ও প্রতিবাদ যদি ভবিষ্যতে আরো একজন রিশাকে উন্মত্ত হত্যাকারীর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে, তাহলে এই সান্ত্বনাহীন মৃত্যু তার সহপাঠীদের নিশ্চয়ই শক্তি ও সাহস জোগাবে।  

আমরা জানি, রিশার মৃত্যুতে আমাদের কোনো উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে না। মাননীয় অর্থমন্ত্রী ঘোষিত রাজস্ব আদায়ে নিশ্চয়ই এর কোনো প্রভাব পড়বে না। সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি না করেই রামপালে বিদ্যুেকন্দ্র নির্মিত হবে। ঢাকা শহরে কয়েক বছরের মধ্যেই চালু হবে আকাঙ্ক্ষিত মেট্রো রেল। কিন্তু রিশা কোনো দিনও এই মেট্রো রেলে চড়বে না, রামপালের বিদ্যুতের আলোয় কখনোই আলোকিত হবে না তার জীবন। রিশার মা-বাবা ও নিকটজনদের বুকে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, তা চলতেই থাকবে—তাদের জন্য সান্ত্বনার কোনো শব্দ আমাদের জানা নেই।

 

লেখক : বিটিভির সাবেক উপমহাপরিচালক


মন্তব্য