kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইভ টিজিং ও বিচারকজীবনের কিছু স্মৃতি

রওশন আরা বেগম বেবী

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ইভ টিজিং ও বিচারকজীবনের কিছু স্মৃতি

আমি তখন রাঙামাটির উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট। সেখানে আমি ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালে মেয়েদের কেউ বাদী হয়ে মামলা করেছে—এ রকম ঘটনা ছিল খুবই সীমিত।

আকস্মিকভাবে রাঙামাটি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী নাসিমার করা একটি মামলা সদর থানা থেকে কোর্টে আসে। এজাহার পড়ে ও নাসিমার শুনানি থেকে ঘটনাটি জানতে পারি।

নাসিমা কলেজে যাচ্ছিল। পথে শিহাব নামের একই কলেজের বিএ ক্লাসের ছাত্র তাকে দেখে একটা নোংরা ও কুিসত মন্তব্য করে। নাসিমা  প্রতিবাদ করে ওঠে, ‘বেয়াদব, ঘরে এদের বোধ হয় মা-বোন নেই, তার বোনকে এভাবে কেউ কিছু বললে সম্ভবত তার খুবই ভালো লাগবে, শয়তান কোথাকার!’ শিহাব জবাব দেয়, ‘এক থাপ্পড় দিয়ে দাঁত সব ফেলে দেব। বেয়াদব কাকে বলে দেখিয়ে দেব। ’

নাসিমা বলে ওঠে, ‘দে না থাপ্পড়, সাহস থাকলে থাপ্পড় দে!’ নসিমা ভাবতেই পারেনি যে সত্যি সত্যি শিহাব তাকে থাপ্পড় মারবে। দেখা গেল শিহাব এত্ত জোরে একটা থাপ্পড় মারল যে বই হাতে নাসিমা মাটিতেই পড়ে গেল। শিহাব তার ওপর একটা লাথি মেরে চলে গেল।

এজাহার পড়ে স্বাভাবিকভাবেই সমন ইস্যু করি। পরের তারিখে আসামি ও তার পক্ষের লোকজন আদালতে হাজির হয়ে আদালতের সিনিয়র মোস্ট অ্যাডভোকেটের মাধ্যমে জামিনের আবেদন করে। মনে হয়েছে আদালতে আসামির বাবাও হাজির। বাদীপক্ষে বক্তব্য দেন কোর্ট ইন্সপেক্টর। আসামিপক্ষের অ্যাডভোকেট সুন্দরভাবেই বলেন, ‘মামলাটি ৩২৩ ধারার মামলা। সাধারণভাবে চড়থাপ্পড় মারার ঘটনা। এটি একটি জামিনযোগ্য ধারা। ’ কোর্ট ইন্সপেক্টর ধারাটি জামিনযোগ্য স্বীকার করেই বলেন, ‘রাস্তাঘাটে এ ধরনের ঘটনা হরহামেশাই হচ্ছে। ’

কোর্টে উপস্থিত ছিল বাদী নাসিমা ও তার ভাই। সম্ভবত কোর্ট ইন্সপেক্টরের কাছে তারা আরো বেশি কিছু বক্তব্য প্রত্যাশা করেছিল। বাদীর ভাই পরিচয় দিয়ে একটি ছেলে আদালতের অনুমতি চায় কিছু কথা বলার জন্য। তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। সে বলতে থাকে, ‘আমরা অত্যন্ত সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়ে। অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে লেখাপড়া করছি। আমাদের টাকা-পয়সার অত্যন্ত অভাব, তাই কোনো উকিলও দিতে পারিনি। আমরা যদি মাননীয় আদালতের নিকট ন্যায়বিচার না পাই, তবে আমার বোনটির পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাবে। ’ বাদীপক্ষের উকিল দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মাননীয় আদালত, ধারাটি জামিনযোগ্য। ’

দুই পক্ষকে শুনে কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আমার মনে হতে থাকল, ‘দণ্ডবিধির ৩২৩ ধারাটি জামিনযোগ্য এ কথা সত্য; কিন্তু ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। এই মুহূর্তে জামিন হয়ে গেলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। রাস্তায় একটি মেয়েকে প্রকাশ্যে, চড়থাপ্পড়-লাথি মারার ঘটনা মোটেও সাধারণ ঘটনা হতে পারে না। আসামিপক্ষের উকিল মেয়েটিকে রাস্তায় প্রকাশ্যে চড়থাপ্পড়-লাথি মারার বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তার মানে ঘটনাটি সত্য। ’

আমি জামিন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আদেশনামায় ছোট্ট একটি observation লিখলাম, ‘যদিও অভিযোগের ধারাটি জামিনযোগ্য, তথাপি এই আদালত মনে করে প্রকাশ্য রাস্তায় একজন কলেজ ছাত্রীর গালে থাপ্পড় মেরে তাকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে লাথি মারা একটি বড় ধরনের সামাজিক অপরাধ। এই মুহূর্তে আসামির জামিন এ ধরনের ঘটনাকে উৎসাহিত করবে, যা সমাজকে কলুষিত করায় সহায়ক হবে। অতএব, অপরাধের সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় আসামি শিহাবের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করা হলো। আসামি হাজতে যাবে। ’

জামিন নামঞ্জুরের আদেশ লিখতে থাকা অবস্থায় আমার মনে হচ্ছিল যে আগামীকালই তারা মাননীয় উচ্চতর আদালতে যাবে এবং জামিনও নিয়ে নেবে। জামিনযোগ্য ধারায় আমার জামিন নামঞ্জুরের এই আদেশ মাননীয় উচ্চতর আদালত কিভাবে নেবেন? আবার মনে হলো, দেখি না মাননীয় উচ্চতর আদালত কী করেন? আরো মনে হলো উচ্চতর আদালত আমার observation-কে মূল্যও তো দিতে পারেন। তবে জামিন যদি পায়ও আসামির উচ্চতর আদালতে গিয়ে সেখানকার বিজ্ঞ কৌঁসুলিদের মোটা অঙ্কের ফিস দিতে হবে। অন্তত বেশ কিছু অর্থ খরচ হবে। বুঝুক, যে অন্যায়টি সে করেছে তার থেকে রেহাই পেতে হলে কিছুটা হলেও শাস্তি পেতে হয়।

রাঙামাটি ছোট একটি শহর। আদালতের অনেক কথাই বাজারে আলোচনা হয়, যা অফিসের পিয়ন বা অন্যদের মাধ্যমে জানা যায়। আমার পিয়ন দরবেশ আলী রাতে বাসায় এসে জানাল, আজ জামিন না পাওয়া ছেলেটি অনেক ধনী পরিবারের ছেলে। তার বাবা উকিলের সঙ্গে রাগারাগি করেছেন জামিনযোগ্য ধারায় জামিন না হওয়ার জন্য। তাঁকে নাকি উকিল সাহেব নিশ্চিত করেছিলেন যে ধারাটি জামিনযোগ্য, জামিন না হওয়ার কোনো কারণই নেই। তিনি নাকি দরকার হলে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু উকিল সাহেব তাঁকে জানিয়েছেন, এই ম্যাজিস্ট্রেট ঘুষ খান না। এখন তো তাঁর মনে হচ্ছে ঘুষ দিলে জামিন হতোই। ছেলেটির বাবা নাকি আরো বলেছেন, আগামীকালের মধ্যে উচ্চতর আদালতে জামিনের ব্যবস্থা করতে হবে।

তখন উকিল সাহেব নাকি তাঁকে বোঝাতে শুরু করেন এই বলে যে আদালত জামিনযোগ্য ধারায় জামিন না দেওয়ার পক্ষে যে observationটি দিয়েছেন, মাননীয় উচ্চতর আদালত যদি তাতে গুরুত্ব দিয়ে একমত পোষণ করেন এবং সেখান থেকেও জামিন নামঞ্জুর হয়ে যায়, তবে তাঁদের ছেলের জামিন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। নিম্নতর আদালত সেই জামিন আর কখনো দেবেন না। তাই এখানেই জামিনের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

পিয়ন দরবেশ আলীকে যদিও বললাম, রাস্তাঘাটে-বাজারে আদালতের বিষয়ে অনেক রকমের আলাপ-আলোচনা হবেই, সব কিছু আমাকে জানাতে আসবে না।

এ কথা বললেও আমি মনে মনে ভাবতে থাকলাম, তাদের উচ্চতর আদালতে যাওয়াই ঠিক ছিল, যদি সেখান থেকে জামিনটা বাতিলই হতো, তবে এই অপরাধের শাস্তিটা এই পর্যায়েই হয়ে যেত। এই মামলার আসামি জামিন পেয়ে গেলে, বিচারে ঘটনা প্রমাণ হলেও বা কয় দিনের সাজা দেওয়া যাবে? আর জামিন পেলেও এই ছেলের পক্ষে সাক্ষীদের হাত করা সহজ হয়ে যাবে। তখন ঘটনাটি প্রমাণ নাও হতে পারে। তখন শাস্তি প্রদানও সম্ভব হবে না। এ ঘটনার শাস্তি এই পর্যায়েই হয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

দেখা গেল সত্যি সত্যি মামলাটি নিয়ে তারা উচ্চতর আদালতে যায়নি। সপ্তাহে সপ্তাহে এখানেই জামিনের আবেদন করা ও নাকচ হওয়া একটি রীতিমতো ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে তিন মাসে বহুবার জামিনের আবেদন হলেও এই আদালত থেকে জামিন দেওয়া হলো না।

তিন মাস শেষ হওয়ার পর একদিন মনে হলো, ঘটনাটি প্রমাণিত হলেও এর চেয়ে বেশি সাজা দেওয়া যেত না। তাই একদিন আবেদন শুনে জামিন মঞ্জুর করা হলো।

প্রায় সাত দিন পর আবার বাজারের আলোচনার খবর এলো, শিহাবের বাবা নাকি আদালতের প্রতি তাঁর বিশেষ সম্মান জানিয়েছেন এ জন্য যে মা-বাবা হয়েও তাঁরা তাঁদের সন্তানের অন্যায় কাজটি উপলব্ধি করতে পারেননি। আদালত পেরেছেন। তাঁরা নাকি অবাক হয়েছেন এ জন্য যে হাজত থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তাঁদের ছেলে রীতিমতো মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ছে, সে নাকি তওবাও করেছে জীবনে আর কখনো এ ধরনের কাজ করবে না। ছেলেটির মাও নাকি ছেলেটির এই পরিবর্তিত স্বভাবের জন্য আশ্চর্য হয়েছেন। আমাকে নাকি অনেক দোয়াও করেছেন।

শুনে আমি প্রচণ্ড তৃপ্তি অনুভব করতে থাকলাম। শিহাবের এই পরিবর্তনই তো আইন ও আদালতের মুখ্য উদ্দেশ্য। আমার কাছে বেশ ভালো লাগতে থাকল।

এর মধ্যে বান্দরবান সদর উপজেলায় আমাকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পোস্টিং দিয়ে একটি বদলির আদেশ আসে। আবার আমার কাছে খবর এলো, শিহাবের বাবা এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও কোর্টের বিজ্ঞ কৌঁসুলিদের নিয়ে আমার বদলি ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। তাঁদের অভিমত হলো আরো কিছুদিন আমার রাঙামাটিতে থাকা প্রয়োজন। তাতে নাকি রাঙামাটির উপকার হবে। তাঁরা সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে ও কেবিনেট ডিভিশনে সম্মিলিত স্বাক্ষর দিয়ে আবেদন জানাবেন। কথাটি আমাকে চিন্তায় ফেলে দিল।

পরের দিন আমি কোর্টে গিয়ে কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট সাহেবকে ডাকিয়ে আমার কক্ষে আনালাম। আমার বদলির আদেশটি বহাল থাকা প্রয়োজন বলে জানালাম। আমি তাঁকে বললাম, উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমপর্যায়ের পদ হলেও আমার ক্যারিয়ারের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদে কাজ করা প্রয়োজন।

আমি তাঁকে বিদায় দিয়ে সেই মামলাটির বিষয়ে ভাবছিলাম যে রাস্তায় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার অপরাধের জন্য দণ্ডবিধির ২৯৪/৫০৯ ধারা রয়েছে। বর্তমান মামলাটি সে ধারায় আসেনি। এসেছে ৩২৩ ধারায়। আমিও বিচার চলাকালে ধারাটির কথা খেয়াল করিনি। এ ধরনের মামলা যথাযথ ধারায় হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তবে সে ধারাগুলোও জামিনযোগ্য। আমার মনে হচ্ছিল অপরাধের ধারাটি জামিন অযোগ্য হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তবেই এ ধরনের অপরাধের বিষয় গুরুত্ব পাবে। জামিন পাওয়া না গেলে ঘটনা ঘটাতে নিশ্চয়ই ভয়ভীতি কাজ করবে এবং অপরাধের মাত্রা অবশ্যই কমতে থাকবে। বর্তমানে এ মামলার ক্ষেত্রে জামিন না হওয়াই তার প্রমাণ।

আজও আমি মনে করি, দণ্ডবিধির এ ধারা জামিন অযোগ্য হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

 

লেখক : সাবেক অতিরিক্ত সচিব


মন্তব্য