kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জন কেরি খেলা কি ড্র হয়েছে?

মোফাজ্জল করিম

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জন কেরি খেলা কি ড্র হয়েছে?

মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ২৯ আগস্ট তাঁর মার্কিন প্রতিপক্ষের সঙ্গে নাতিদীর্ঘ বৈঠকের পর বলেছেন, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। আলোচনায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

সম্ভবত ‘ব্রিভিটি ইজ দ্য সউল অব উইট’ নীতিতে বিশ্বাসী আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তাই কোনো বিষয়েই বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি। তবু তাঁর ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমের বাচনিকে যা জানা গেছে, তাতে একটি বিষয় মোটামুটি পরিষ্কার হয়েছে, জন কেরি সাহেব জঙ্গি দমনের ব্যাপারে ঝেড়েই কেশেছেন (এর চেয়ে জোরে কাশলে তা মনে হয় কূটনৈতিক কৌশল ও ‘এটিকেট’-এর বরখেলাপ হতো!)। সময় কম ছিল বলেই বোধ হয় তিনি কোনো প্যাঁচ-পোঁচের ধার না ধেরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সময় সোজাসুজি প্রস্তাব দেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরাও আপনাদের পাশে থেকে শরিক হতে চাই। অর্থাৎ আপনারা সামান্য সবুজ সঙ্কেত দিলেই, একটু ও.কে. বললেই, আমরা শুধু দূরে থেকেই আপনাদের পাশে নয়, একেবারে পাশে থেকেই পাশে থাকব। আমাদের আপাতত একটা মোড়া বা পিঁড়ি পেতে বসতে দিলেই হবে, শোওয়ার ব্যবস্থা আমরা নিজেরাই করে নেব রাত্রি গভীর হওয়ার আগেই।

কেরি সাহেব যে এ রকম একটা মেসেজ ক্যারি করে নিয়ে আসছেন সাত সমুদ্র তের নদীর পার থেকে তার ঢাক গুড়গুড় আওয়াজ বেশ কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের সহায়তার ব্যাপারে শুভাকাঙ্ক্ষীদের আগে থেকেই ধন্যবাদ জানিয়ে বলে আসছেন, সাহায্য লাগলে আমরা বলব। এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সামর্থ্যের তারিফ করে কেরি সাহেবকে বললেন, আপনারা বরং প্রযুক্তি দিয়ে, তথ্য প্রদান করে, আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারেন। এর বেশি আর কিছু চাই না। থ্যাংক ইউ। বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতিতে প্রবাদ বাক্য, প্রবচন ইত্যাদি আবহমান কাল ধরে গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়ে আসছে। শহুরে  সংস্কৃতিতে এগুলোর প্রচলন কম। কিন্তু কখনো কখনো এর কোনো কোনোটি একেবারে খাপে খাপে লেগে যায়। মার্কিন প্রস্তাবের ব্যাপারে এ রকম দুটি প্রবাদ-প্রবচনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে—শিয়ালকে কখনো ভাঙাঘর দেখাতে নেই। অন্যটি, সূই হয়ে ঢোকা আর ফাল হয়ে বের হওয়া। ছড়া আকারে বলা হয় আরেকটি কথা—বড়র পীরিতি বালির বাঁধ/ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণে চাঁদ। জানি না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসব প্রবাদ-প্রবচন ও নিকট অতীতে আফগানিস্তানে, ইরাকে মার্কিনিদের কীর্তি-কাহিনী স্মরণ করে মার্কিন সাহায্য-সহায়তার দরাজদিল প্রস্তাব গ্রহণে বিরত থাকছেন কি না।

তা ছাড়া এটাও তো ঠিক, আফগানিস্তান-ইরাক-পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশকে একপাল্লায় তুলে মাপা যাবে না। এসব দেশ মাতৃভাষার জন্য, কিংবা নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি রক্ষার জন্য কবে বুকের রক্ত দিয়েছে শুনি? একটি সহায়সম্বলহীন পলিমাটির মতো কোমল স্বভাবের শান্তিপ্রিয় তথাকথিত অসামরিক জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে যার পরিচিতি ছিল, সেই বাঙালি ৯ মাস যুদ্ধ করে একটি নৃশংস আসুরিক শক্তিকে পরাজিত করে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছে। ইরান-তুরান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান বাদ দিলাম, দুনিয়ার আর কোন জাতি বাঙালির সেই অতুলনীয় শৌর্য-বীর্য-সাহসিকতার পাশে দাঁড়াতে পারে? আমাদের দুর্ভাগ্য, অর্ধশতাব্দী পার হওয়ার আগেই আমরা আমাদের সেই ইস্পাতকঠিন ঐক্য ও অবিস্মরণীয় দেশপ্রেমের কথা বিস্মৃত হয়ে দেশকে শতধা বিভক্ত করে ফেলেছি, ক্ষমতার অন্ধ মোহে আবদ্ধ হয়ে ভাইয়ের গলায় ভাই ছুরি বসাচ্ছি। এ যেন বনতলে শিকারের দখল নিয়ে দুই সহোদর শার্দূলের মরণপণ লড়াই, আর বৃক্ষশাখায় শকুনি-গৃধিনীর অধীর অপেক্ষা, কখন এরা দুজনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে এবং সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে তাদের মহাভোজের উলঙ্গ উল্লাস। কিন্তু না, এই দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষ জানে, প্রয়োজনে আবার অস্ত্র ধারণ করে এ দেশকে রক্ষা করতে হবে, তা সন্ত্রাসী-জঙ্গির বিরুদ্ধেই হোক, অথবা দুর্নীতিবাজ দুর্বৃত্ত লুটেরাদের বিরুদ্ধেই হোক। আর সে দায়িত্ব পালনের জন্য বাড়ির কাছের আরশিনগর কিংবা সাত সাগর আর তের নদীর পারের কোনো সদাশয় সুহৃদের অযাচিতভাবে এগিয়ে আসার দরকার নেই। প্রয়োজনে এ দেশের একেকজন মানুষই হবে একেকটি অগ্নিঝরা একাত্তর, গর্জে উঠে বলবে ‘শির দেগা, নেহি দেগা আমামা’।

২.

এ তো গেল সাহায্য পাঠানোর নামে সৈন্য-সামন্ত পাঠানোর প্রস্তাব। বাপরে! ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয়। কল্পনা করুন, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-নগরে-বন্দরে, অলিতে-গলিতে ‘জলপাই লেবাইস্যা’ (কবি মোহাম্মদ রফিককে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে) কালো-ধলো বন্দুকধারীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর দেশটা হঠাৎই হয়ে গেছে সিরিয়া, ইরাক অথবা আফগানিস্তান। না, কোনো দুঃস্বপ্নেও যেন এমনটি না হয়।

অন্যান্য যেসব বিষয়ে মিস্টার জন কেরির সঙ্গে আমাদের সরকারের সামারি ট্রায়ালের মতো সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে তাতে কেরি সাহেব যে খুব একটা উৎসাহী ছিলেন তা মনে হয় না। অবশ্য এ ধরনের বুড়ি ছুঁয়ে দেখার মতো সফরে টেবিলের দুই পাশে বসে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা উভয় পক্ষের সম্মত কার্যবিবরণী প্রস্তুতের সুযোগও নেই। এসব ক্ষেত্রে আলোচনা না হয়ে ‘ভালোচনা’ হয় বেশি। অর্থাৎ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একে অন্যের ভূমিকা বা সাফল্যের প্রশংসা করে নির্দোষ বক্তব্য প্রদান, তোষামোদমূলক পিঠ চুলকানো কথাবার্তা এবং ‘আমরা অবশ্যই দেখব’, ‘নিশ্চয়ই বিবেচনা করব’ ধরনের কথাই বলা হয় বেশি। এগুলোকে আমি আলোচনা না বলে বলি ‘ভালোচনা’। কেরি সাহেব আমাদের আর্থসামাজিক চমকপ্রদ অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এবং তা করতে গিয়ে উনিশ শ সত্তরের দশকের শুরুতে তারই এক পূর্বসূরি সহকর্মী হেনরি কিসিঞ্জারের বাংলাদেশ সম্পর্কে সেই ঐতিহাসিক উক্তি ‘বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি’র কথা মনে করে গলায় কাঁটা বেঁধার যন্ত্রণা অনুভব করেছেন কি না জানি না। তার চেয়ে বড় কথা, একাত্তরে তাঁর দেশের সরকারের আমাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা—যা চিরকাল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে—স্মরণ করে লজ্জায় লাল হচ্ছিলেন কি না তা-ও জানি না, তবে তিনি এসব কিছু দারুণভাবে পুষিয়ে নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক স্থাপন ও পরিদর্শন বহিতে উচ্ছ্বাসমণ্ডিত মন্তব্য লিখে। এরপর নিশ্চয়ই তিনি মনে মনে আশা করেছিলেন সন্ত্রাসী ও জঙ্গি দমনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে যেসব প্রস্তাব দেবেন তা ‘কণ্ঠভোটে’ পাস হয়ে যাবে। কিন্তু দুঃখিত, মিস্টার কেরি, বাংলাদেশ এখন আর মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী উনিশ শ সত্তরের দশকের, আপনাদের ভাষায়, তলাবিহীন ঝুড়ি নেই, এখন সে রীতিমতো সাবালক, দারুণ স্মার্ট। আপনি ভালো করতেন আমাদের এই অর্থনৈতিক উল্লম্ফনের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আসল কুশীলব, যাদের শ্রমে-ঘামে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে (আমি নিজে প্রায়শ বলি, যাদের কাঁধে চড়ে চলেছে বাংলাদেশ), তাদের জন্যও দুটি প্রশংসার বাণী শোনাতেন। যদি বলতেন, আমি ফিরে গিয়ে আমার ‘বসেক’ বলব, বাংলাদেশের এই অগণিত খেটে খাওয়া মানুষগুলোর রক্তঝরা অবদানকে স্বীকৃতি জানিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের কোটামুক্ত-শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার প্রদান করতে। দুঃখের বিষয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বঙ্গবন্ধুর খুনিকে ফেরত পাঠানো ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনায় আপনি খুব একটা আগ্রহী ছিলেন বলে মনে হয়নি।

অনেকে জানতে চান, আপনার আসল সফর তো ইন্ডিয়ায়, তা হলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য কষ্ট করে ঢাকায় এলেন কেন? এর উত্তর সহজ। এক, ওই জঙ্গিসংক্রান্ত প্রস্তাব দেওয়া। দুই, বারবার বাংলাদেশের কাছে-পিঠে ঘুরে যান, জিজ্ঞেস করলে বলেন, নিশ্চয়ই এর পরের বার আসব তোমাদের দেশে। এখন আপনাদের সরকারের এই অন্তিম সময়ে বিরাট এজেন্ডা নিয়ে পুরো দুই দিনের সফরে যাচ্ছেন ইন্ডিয়া, আর হয়তো সুযোগ হবে না এই অঞ্চলে আসার। অতএব, ‘যো ওয়াদা কিয়া হায়, উয়ো নিভানা পড়েগা’। কিসের কষ্ট, কিসের ক্লেশ/চলো মন যাই বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশ তো আর মালদ্বীপ-ভুটান-নেপাল-শ্রীলঙ্কা নয় যে সফর না করলেও কিছু যায় আসে না। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও আপনাদের সরব প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও নীরব প্রতিদ্বন্দ্বী ‘সুয়া হুয়া রুস্তম’ ইন্ডিয়ার নানা ক্ষেত্রে তৎপরতার কথা বিবেচনা করে এটুকু কষ্ট আপনি অবশ্যই স্বীকার করবেন। আর বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতি তো আপনাদের সবাইকে সারাক্ষণ মায়াবী সাইরেন বাজিয়ে শোনাচ্ছে। সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে আপনাদের মতো শক্তিধরদের মধ্যে কার আগে প্রাণ, কে করিবে দান ধরনের প্রতিযোগিতা তো শুরু হয়েই গেছে বলা যায়। তাই চলে আসলেন আপনি। তিন, আপনাদের ৮ নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। নেই নেই করেও আপনাদের দেশে কয়েক লাখ বাংলাদেশি ভোটার আছে। আপনি ঢাকা না এসে পাশের দেশে দুই দিন সফর করবেন (‘আমার বঁধুয়া আনবাড়ি যায় আমারই আঙিনা দিয়া’), বারবার কথা দিয়েও কথা রাখবেন না, তাতে অভিমানী বাঙালিরা আপনাদের ভোট দেবেন ভেবেছেন? আপনাদের নির্বাচনী প্রতীক গাধা হতে পারে, বাঙালি অত গাধা না। আপনার বাংলাদেশ সফরের পর এখন দেখবেন বাংলাদেশিরা হিলারি আপার জন্য (এই সম্বোধন আমার নয়, হিলারি ক্লিনটন আগে একবার বাংলাদেশ সফরে এসে যখন গ্রামের মহিলাদের কার্যক্রম দেখতে গিয়েছিলেন, বোধ হয় যশোরে, তখন সেই মহিলারা জানতে চেয়েছিলেন, আপা একা এলেন কেন? দুলাভাইকে নিয়ে এলেন না?) কেমন জান ধরে দেয়।

৩.

এত কথা বললাম, কিন্তু দেখছি আসল কথাই বলা হয়নি। আসল কথা হচ্ছে দুটি শব্দ, যা জন কেরি খুব কৌশলে ব্যবহার করেছেন মাত্র বার দু-তিনেক। তাঁর ৯ ঘণ্টার সফরে তিনি হয়তো ৯ হাজার শব্দ উচ্চারণ করেছেন কিন্তু ওই দুটি শব্দ ব্যবহার করেছেন মাত্র দুবার কি তিনবার। কোন দুটি শব্দ? শব্দ দুটি হচ্ছে গণতন্ত্র ও সুশাসন। এরই ভেতর দিয়ে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, আইনশৃঙ্খলা, জাতীয় ঐক্য ইত্যাদি আমাদের সব বড় বড় ব্যাধির উল্লেখ করেছেন সুকৌশলে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতো। বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শনের কারণে আওয়ামী লীগ যেমন বিপুলভাবে পুলকিত, এই দুটি প্রসঙ্গের অবতারণার জন্য বিএনপি-ও বোধ হয় ম্যালা খুশি।

আর এ জন্যই বোধ হয় বলা যায় খেলাটা ড্র হয়েছে। আমাদের দুই বড় দলই এ ধরনের একটা ‘উইন-উইন সিচুয়েশনে’ অবশ্যই তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারে (হয়তো তুলছেও!)।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com

 


মন্তব্য