kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভারতে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করবে যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন থেকে

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পাকিস্তান ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। চীন উত্তেজিত।

এমনকি রাশিয়ার সঙ্গেও হতে পারে সম্পর্কের অবনতি। সেসব ঝুঁকি নিয়েও ভারত আমেরিকার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আরো এক ধাপ এগোল। সোমবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিবের সঙ্গে ‘লেমোয়া’ নামে যে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন তার মোদ্দা কথা হলো, এবার থেকে আমেরিকা জ্বালানি ভরার জন্য বা অন্য কোনো সামরিক সহায়তার জন্য ভারতের যেকোনো সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে। যদিও আমেরিকার সেনাকে ঘাঁটি করতে দেওয়া হবে না বলে এই চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তা ছাড়া এই চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের জল, স্থল ও বায়ুসেনা ঘাঁটিকে উভয়েই রসদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করতে পারবে। সন্ত্রাস মোকাবিলায় কার্যকর হবে এটি।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার সঙ্গে এ ধরনের সামরিক চুক্তি হবে কি না তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠেছে দেশের অভ্যন্তরে এর রাজনৈতিক প্রভাব কী হবে ও কূটনৈতিকভাবেই বা ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক কোথায় দাঁড়াবে।

কিন্তু কেন এত প্রশ্ন উঠছে? কেনই বা একটি মার্কিন চুক্তি নিয়ে এত শোরগোল?

সে জন্য ফিরে যেতে হবে স্বাধীনতা-উত্তরকালের প্রথম যুগে। জওহরলাল নেহরুর সময় থেকেই ভারত ‘নন-অ্যালাইনড মুভমেন্ট’-এর সদস্য। অর্থাৎ সে সময়ে শক্তির দুটি উৎসস্থল, আমেরিকা বা রাশিয়া, কোনো দেশের সঙ্গেই কোনো সামরিক জোটে যাবে না ভারত। সে নীতি বজায় রাখেন ইন্দিরাও। যদিও তিনি রাশিয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের বিদেশনীতিতে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। প্রথমবার এর ব্যতিক্রম ঘটে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়। কুয়েতকে কেন্দ্র করে যখন আমেরিকা-ইরাক উপসাগরীয় যুদ্ধ চলছে, সে সময় আমেরিকা ভারত সরকারকে অনুরোধ করে বিমানে তেল ভরার জন্য তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর তাতে রাজিও হয়ে যান। এ নিয়ে কংগ্রেস তীব্র আপত্তি করে। এমনকি সমর্থন তুলে নিয়ে চন্দ্রশেখর সরকারকে ফেলে দেওয়ার কথাও বলে। ফলে অনুমতি দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই জ্বালানি ভরার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয় চন্দ্রশেখর সরকার। তখন সেই উপসাগরীয় যুদ্ধের বয়স দুই সপ্তাহ।

ফলে সেবার মূলত কংগ্রেসের আপত্তিতেই চন্দ্রশেখর পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই কংগ্রেসই কিন্তু এখনো পর্যন্ত এই চুক্তি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। বামেরা বরাবরের মতো সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলে এই চুক্তির সমালোচনা করেছে। কিন্তু তার বাইরে এখনো পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

কূটনৈতিক মহল মনে করছে, উপমহাদেশে এই চুক্তির ফল মারাত্মক হতে পারে। এর ফলে উত্তেজনা আরো বাড়বে এবং চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক আরো মজবুত হবে। এর মধ্যেই পেইচিং হুমকি দিয়ে রেখেছে, বেলুচিস্তানে যদি ভারত কোনো রকম আক্রমণ করে তা হলে তারা পাকিস্তানকে সব রকম সাময়িক সহায়তা দেবে। আবার দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করেও মার্কিন-চীন সম্পর্ক যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকে কোনো সহজ ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। অন্যদিকে ভারত বলে রেখেছে তারা ভিয়েতনামকে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে সামরিক সহযোগিতা করবে, যা আগে থেকেই পেইচিংকে চটিয়ে দিয়েছে। আর পাকিস্তান তো রয়েছেই। তারা সব সময়ই ভারতের সামরিক চুক্তি ও পদক্ষেপ নিয়ে চিন্তিত। পাশাপাশি রাশিয়া ছিল ভারতের দীর্ঘদিনের সহযোগী দেশ। এই চুক্তির মাধ্যমে সম্ভবত তাতেও ছেদ পড়বে।

তবে এসব কোনো কিছুকেই বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না নরেন্দ্র মোদির সরকার। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, মোদি একেবারেই নিজের মতো করে বিদেশনীতিতে বদল আনছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এরপর যে ভারতের মাটিকে আমেরিকা ব্যবহার করবে না, এ কথা বলা যায় না। পাকিস্তানের দৈনিক তো লিখেছেই, এই লেমোয়া চুক্তিই শেষ নয়, এরপর ভারত-মার্কিন সহযোগিতার আরো দুটি চুক্তি হবে—সিসমোয়া (কমিউনিকেশনস ইন্টারপোর্টেবিলিটি অ্যান্ড সিকিউরিটি মেমোরেন্ডাম অব অ্যাগ্রিমেন্ট) ও বেকা (বেসিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট ফর জিও-স্প্যাশিয়াল কো-অপারেশন। ) প্রথমটির ক্ষেত্রে চুক্তি হলে ভারতের মাধ্যমে নিরাপত্তাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাবে আমেরিকা। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্থানের ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি ও সমীক্ষার সুযোগ পাবে পেন্টাগন। এ দুটি ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে পারিকরের জবাব, ‘সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করতে এত বছর লাগল। এর উপযোগিতা দেশের মানুষকে বোঝাতে হবে। তারপর অন্য বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। ’

তবে লেমোয়ার জন্য যে দেশের অভ্যন্তরে মোদি সরকারকে বিরোধীদের প্রশ্নবাণ হজম করতে হবে, সেটা উপলব্ধি করেই সম্ভবত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে চুক্তির পরিধি কতটা, তা স্পষ্ট করা হয়েছে। এই বোঝাপড়া সামরিক বাহিনীর পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে, এর সঙ্গে যুদ্ধাস্ত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে ফোর্বস ম্যাগাজিন কিন্তু স্পষ্ট বলেছে, ‘এই লেমোয়ার ফলে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর বিরাট সুবিধা হলো। তাদের ভারতে ঘাঁটি থাকবে না ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও ভালো কিছু পাচ্ছে—ভারতের সামরিক ঘাঁটি। ’

স্বাভাবিকভাবেই এই চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তান প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। নওয়াজ শরিফের রাজনৈতিক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ বলেন, ‘ভারত-মার্কিন এই সখ্য দেখে পাকিস্তান যথেষ্ট চিন্তিত। এর ফলে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক খারাপ হতে পারে। ’ চীনকে রুখতেই যে ভারত এতটা ‘সাহসী’ হয়ে উঠেছে, সে কথা উল্লেখ করা হয়েছে পেইচিংয়ের দৈনিক ও পাকিস্তানের দৈনিকে। অন্যদিকে চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সেনা বাড়ানোর কাজ শুরু করেছে আমেরিকা।

কাজেই এই একটি চুক্তির মাধ্যমে ভারতের এত দিনকার বিদেশনীতির মধ্যেই এলো বিশাল বদলের সূচনা বার্তা। পরবর্তীকালে তা আরো কতটা বদলে যায়, সে বিশ্লেষণের সময় আসেনি। তবে এই চুক্তি যে মনমোহন সিংয়ের করা অসামরিক পরমাণু চুক্তির চেয়েও ব্যাপ্তিতে ও প্রভাবে অনেক বেশি, তা বুঝতে পারাটা বোধ হয় কঠিন নয়।

সূত্র : এই সময় অনলাইন


মন্তব্য