আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত বাংলাদেশের চেয়ে আয়তনে প্রায় পাঁচ গুণ বড়, খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ অথচ পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের নাম এ দেশের মানুষের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়, সম্ভবত এর অঞ্চলকেন্দ্রিক নামের কারণেই। আফ্রিকার বেশির ভাগ দেশের মতো এই দেশটিও ফ্রান্সের কাছ থেকে ঔপনিবেশিকতার বেড়াজাল ভেঙে ১৯৬০ সালে স্বাধীন হলেও শুরু থেকেই সাম্প্রদায়িকতা, জাতিগত সংঘাত, ঔপনিবেশিক চক্রান্ত, দুর্নীতি আর ক্ষমতার লড়াই ছিল দেশটির নিত্যসঙ্গী। আর তাই প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বর্গকিলোমিটারের এবং ৫৫ লাখের কাছাকাছি জনসংখ্যার এই দেশটিতে কখনোই সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান বা কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো সব সময় থেকেছে উপেক্ষিত, আর যার ভুক্তভোগী হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। গোষ্ঠীগত সংঘাত চরমে পৌঁছলে মানবিক বিপর্যয় রোধে ২০১৪ সালের এপ্রিল মাস থেকে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু হয়। United Nations Multidimensional Integrated Stabilization Mission in Central African Republic (MINUSCA), যা মিনুস্কা নাম নিয়ে এই মিশনের অগ্রযাত্রা শুরু হয় এবং শুরু থেকেই বাাংলাদেশ সেনাবাহিনী মিশনের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়।
উল্লেখ্য, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক শান্তি মিশনে সামরিক পর্যবেক্ষক প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তি রক্ষা মিশনের যাত্রা শুরু হয় এবং এ পর্যন্ত ৪৩টি দেশের ৬৩টি মিশনে শুধু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বমোট এক লাখ ৬৬ হাজার ৮১৪ জন শান্তিরক্ষী অংশ নেন, যদিও অন্যান্য বাহিনী বিবেচনায় সংখ্যাটি দুই লক্ষাধিক। বর্তমানে ১০টি শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মোট তিন হাজার ৬৪৩ জনসহ সর্বমোট চার হাজার ২১২ জন শান্তিরক্ষী মোতায়েন রয়েছেন। এর মধ্যে নারী শান্তিরক্ষীর সংখ্যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৬৭ জনসহ সর্বমোট ৩৩২, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশি নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৩৭ জনসহ সর্বমোট ১৭৪ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে ২০১৪ সাল থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মোট ১২টি পদাতিক ব্যাটালিয়ন দায়িত্ব পালন করেছে, যা বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন বা BANBAT (ব্যানব্যাট) নামে অভিহিত। যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৫৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের মতো এলাকায় (যার স্থানীয় নাম বোয়ার) শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে রয়েছে এই ব্যানব্যাট। এ ছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুটি মেডিক্যাল ইউনিট ও দুটি বিশেষায়িত কম্পানী মিনুস্কা ফোর্সের অপরিহার্য ইউনিট হিসেবে দেশটির অন্যান্য স্থানে শান্তি রক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে।
জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের যাত্রা শুরুর এক যুগ পরে এসে দেশটির জীবনমান উন্নয়নসহ অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশাসনিক কাঠামো বিনির্মাণ ধীরগতিতে সম্পন্ন হলেও বর্তমানে একটি সম্ভাবনাময় পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে দেশটিতে বর্তমানে রাজনৈতিক সরকার ২০২৫ সালে তৃতীয়বারের মতো একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়েছে। কিছু বিচ্ছিন্ন অঞ্চল ছাড়া সংঘাতে লিপ্ত বড় বড় সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র সমর্পণে রাজি করানোর মাধ্যমে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরিয়ে এনে একটি স্থায়ী সমঝোতা বা স্থিতিশীলতা আনয়নের পথে দেশটি অনেকখানি অগ্রসর হয়েছে। এ ছাড়া শিল্প ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে স্থানীয় লোকজনের কর্মক্ষেত্র তৈরির প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা এ বিষয়ে এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে বৈদেশিক পরিমণ্ডলে যেমন বাংলাদেশের মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, তেমনি বাংলাদেশ ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদল ব্যানব্যাটের ভূমিকা ও সাফল্য শুধু প্রশংসিতই হয়নিই, অন্যান্য দেশের শান্তিরক্ষীদের জন্যও অনুপ্রেরণার অংশ হয়েছে, যা দেশটিতে নিযুক্ত জাতিসংঘ শান্তি মিশন প্রধান বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন। ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের ১১তম ইউনিট ৭৭৬ জন শান্তিরক্ষী নিয়ে পূর্ববর্তী ব্যাটালিয়নকে পুনঃস্থাপন করে। উল্লেখ্য, এই শান্তিরক্ষীদলে সাধারণ সেনা সদস্যের পাশাপাশি ৩৭ জন মহিলা সদস্যসহ ডাক্তার ও প্যারামেডিকস অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
বিগত এক বছরে বেসামরিক জনসাধারণকে সুরক্ষা দিতে ব্যানব্যাট তার দায়িত্বপূর্ণ এলাকা, যা দেশের সংঘাতের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত, সেখানে প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি এপিসির মাধ্যমে টহল বা অপারেশন পরিচালনা করেছে। উল্লেখযোগ্য অপারেশনের মধ্যে ২০২৫ সালের ৩ থেকে ১৭ মার্চ দেশের উত্তর চাদ ও ক্যামেরুনের সীমান্তবর্তী অত্যন্ত দুর্গম একটি গ্রাম এনজোড়োতে প্রধান একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণের মুখে ব্যানব্যাটের সদস্যরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঐবষর-ওহংবত্ঃরড়হ বা হেলিকপ্টারের মাধ্যমে অপারেশন পরিচালনা করেন। এ সময় ওই এলাকায় অবস্থান করে ব্যানব্যাটের সদস্যরা স্থানীয় জনসাধারণের জানমাল রক্ষা করেন এবং এলাকায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। ব্যানব্যাটের সাহসী ভূমিকা জাতীয়ভাবে প্রশংসিত হয় এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে মোতায়েনকৃত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদলের প্রধান কর্তৃক ব্যানব্যাটকে ‘কমেনডেশন বা প্রশংসাপত্র’ প্রদানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের ওপর এক গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়। দেশের উত্তর-পশ্চিমের খনিজ সম্পদে ভরপুর ‘এনগুতেরে’ এলাকায় জাতীয় স্বার্থে অভিযান পরিচালনা ও এলাকাটি দখল করে অবস্থানের বিষয়ে মিশন প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, এর আগে কখনো ওই এলাকায় জাতিসংঘের কোনো সেনাদল পৌঁছতে পারেনি। বিবদমান সশস্ত্র গোষ্ঠী পরিবেষ্টিত ওই এলাকায় পৌঁছার কোনো রাস্তাও ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন তার নিকটবর্তী ক্যাম্প বোকারাঙ্গা থেকে পেরু ইঞ্জিনিয়ার কম্পানিকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় পেতে রাখা মাইন ও এক্সপ্লোসিভ নিষ্ক্রিয় করে ৩৫ কিলোমিটার রাস্তা এবং পাঁচটি ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে ৪৯ দিনের প্রায় এক অসম্ভব অভিযান সফল করে এনগুতেরে এলাকা অধিকারে নিতে সক্ষম হয়। এতে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি বিবদমান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায় এবং স্থানীয় জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ত্রাণ সরবরাহ গোষ্ঠীর ওই এলাকায় প্রবেশ নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই অসাধারণ সাফল্য জাতীয় ও জাতিসংঘের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয় এবং ব্যানব্যাট এর জন্য আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্জন করে। বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের বিভিন্ন সফল অভিযান ও তৎপরতায় বিবদমান দুটি প্রধান সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘থ্রি আর’ ও ‘এন্টি বালাকা’ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে অস্ত্র সমর্পণে রাজি হয় এবং ব্যানব্যাট Disarmament, Demobilization and Reintegration (DDR) অপারেশন পরিচালনা করে। এতে মোট ২৯০ জন সশস্ত্র যোদ্ধা তাঁদের নিজস্ব অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছাড়াও বিভিন্ন ভারী অস্ত্র ব্যানব্যাট ও সরকারের নির্ধারিত বিভাগের কাছে সমর্পণ করেন। পরবর্তী সময়ে এসব সাবেক যোদ্ধাকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা প্রদানসহ যোগ্যতা অনুসারে সরকারি বাহিনীতে আত্তীকরণ এবং বাকিদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা কার্যক্রমেও ব্যানব্যাট অত্যন্ত দক্ষভাবে সহায়তা প্রদান করে। সংঘাত নিরসনে এটি বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের জন্য ছিল এক অভূতপূর্ব সাফল্য।
২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় দেশটির জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচন ছিল ২০১৩ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। এই নির্বাচন আয়োজনে ব্যানব্যাট বছরজুড়েই নিজ দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ভোটার রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমে নিরাপত্তা সহায়তা প্রদান এবং ব্যানব্যাটের মহিলা সদস্যদের দ্বারা স্থানীয় মহিলা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে। ভোটগ্রহণের এক সপ্তাহ আগে থেকেই দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সব ভোটকেন্দ্রকে নিরাপত্তা পরিকল্পনায় এনে মোট সাতটি ক্যাম্প থেকে ভোটগ্রহণ কার্যক্রমের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছে। ভোট-পরবর্তী ভোটগণনা ও ব্যালট বাক্স পরিবহনেও সফলভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের অবদান দেশটির গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এক মাইলফলক হিসেবেই বিবেচিত হবে।
যেকোনো সামরিক অভিযান বা অবস্থানের সাফল্য স্থানীয় বেসামরিক জনগোষ্ঠীর মাঝে ভালোবাসা অর্জন করা ছাড়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন গত বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালের পর নিজস্ব দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় স্থানীয় জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য মোট ২১টি মেডিক্যাল ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে, যেখানে ব্যানব্যাটের নিজস্ব ডাক্তার ও প্যারামেডিকসরা প্রায় ৯০০ জন স্থানীয় জনসাধারণকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ প্রদান করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন নিজ অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় সংঘাতপূর্ণ বোকারাঙ্গা এলাকায় ‘বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ স্কুল’ পরিচালনা করে স্থানীয় দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা নিশ্চিত করছে। বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, বই ও অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় লোকজনের এক আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।
Hope for Better Tomorrow বা ‘আগামীর সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ’—এই নীতি সামনে রেখে গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালজুড়ে বাংলাদেশ ব্যাটলিয়ন তার দায়িত্বপূর্ণ এলাকা বুয়ারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কারিগরি বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি বা দক্ষতা অর্জনের এক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। এর অংশ হিসেবে আট সপ্তাহব্যাপী মোট চারটি প্রশিক্ষণচক্র পরিচালনা করা হয়। একেকটি প্রশিক্ষণচক্রে কৃষি, সেলাই, ইলেকট্রনিক ও প্লাম্বিং এবং কার্পেন্টিংয়ের ওপর ২০ জন করে বছর শেষে মোট ১০০ জন স্থানীয় তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষিত করা হয়। ব্যানব্যাটের পুরুষ ও নারী সেনা সদস্যরা এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বিনামূল্যে পরিচালনা করেছেন। প্রশিক্ষিতদের অনেকেই এরই মধ্যে তাদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্র তৈরি করেছে, যেখানে অন্যান্য স্থানীয় লোকও কাজ করছে। বেকারত্ব দূরীকরণে বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে স্বাবলম্বিতা তৈরির এই প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ব্যানব্যাটকে দেশটির প্রশাসনিক বিভাগীয় প্রধান কর্তৃক সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে, যা জাতিসংঘে নিয়োজিত যেকোনো কন্টিনজেন্টের জন্য একটি বিরল সম্মানের বিষয়।
দুই দেশের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ অর্থায়নে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুইতে নির্মিত হয়েছে একটি অত্যাধুনিক কমিউনিটি ক্লিনিক। ২০২৫ সালের ৪ মার্চ মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট মিস্টার ফস্টিন আরচেঞ্জা তদেরা ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, এসবিপি, ওএসপি, এসজিপি, পিএসসি যৌথভাবে এই ক্লিনিকের উদ্বোধন করেন। দেশের প্রেসিডেন্টের নামানুসারে এর নামকরণ হয় ‘তদেরা কমিউনিটি ক্লিনিক’। ২০ শয্যা বিশিষ্ট এই কমিউনিটি ক্লিনিকে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম, ডেন্টাল ও সার্জিক্যাল উইংয়ের সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরের রেডিওলজিস্ট, ডেন্টিস্ট, শিশু বিশেষজ্ঞ, গাইনিকোলজিস্ট, প্যারামেডিকসসহ মোট ছয়জন এই ক্লিনিকে বিনামূল্যে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছেন। পাশাপাশি স্থানীয় ২৬ জন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের Capacity Building বা দক্ষতা অর্জনে সহায়তা প্রদান করছেন। এরই মধ্যে রাজধানীসহ সারা দেশে এই কমিউনিটি ক্লিনিকের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা বাংলাদেশের মর্যাদা ও সুনাম এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, এসবিপি, ওএসপি, এসজিপি, পিএসসিকে ওই দেশের অত্যন্ত সম্মানিত ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল’ প্রদান করা হয়, যা ওই দেশের প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধানকে নিজ হাতে পরিয়ে দেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে মধ্য আফ্রিকান সেনাবাহিনীর জন্য বিনামূল্যে ২৫ হাজার ইউনিফর্ম উপহার হিসেবে প্রদান করেছে। স্থানীয় বেশ কিছু মেধাবী শিক্ষার্থীকে ফুল ফ্রি স্কলারশিপের মাধ্যমে বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজে অধ্যয়নের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের সাফল্যের পাশাপাশি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় জনসাধারণের যেমন হৃদয় জয় করা সম্ভব হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক চাহিদাসম্পন্ন বিষয়গুলোতে সরাসরি অবদান রেখে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক তৈরিতে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। রাষ্ট্রীয় সুসম্পর্কের এই ধারা বজায় রেখে ভবিষ্যতের জন্য কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য অথবা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এখন বাংলাদেশের জন্য এক অপার সম্ভাবনার উর্বর ভূমি। মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা বাংলাদেশের এই সুনাম, মর্যাদা আর সম্ভাবনা বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। শুধু বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠাই নয়, নিজ মাতৃভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে লাল-সবুজের পতাকার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে ১১টি তাজা প্রাণ বিসর্জনের ইতিহাস দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির হয়ে বেঁচে থাকুক অনন্ত কাল ধরে।
লেখক : সেনা কর্মকর্তা



দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি প্রধান নির্দেশক হচ্ছে দেশজ আয়ের প্রবৃদ্ধির হার। প্রতিটি বাজেটেই এই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। চলতি অর্থবছর জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৫.৫ শতাংশ। তবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস হচ্ছে অনেক কম। বিশ্বব্যাংক যে পূর্বাভাস দিচ্ছে, তাতে এ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৩.১ শতাংশ। আইএমএফের পূর্বাভাস হলো ৪.৭ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে, প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৪.০ শতাংশ। এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম অনুমিত হওয়ার কারণ হলো নির্বাচন-পূর্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ হ্রাস, জ্বালানি খাতের সমস্যা, বৈশ্বিক ঘটনাবলির নেতিবাচক প্রভাব এবং উৎপাদনে স্থবিরতা। অর্থবছরের শেষ প্রান্তে হাওরে ভয়াবহ বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে বোরো ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তা ছাড়া সার্বিকভাবে কর্মসংস্থান হ্রাস পায়। মানুষের আয় কমে যায়। আগামী বছর প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর প্রধান নিয়ামক হবে সুস্থির সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ। 
সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, গণমাধ্যমে আমরা যে চিত্রটা দেখি তা মূল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। লোকলজ্জা, সামাজিক চাপ আর প্রভাবশালীদের হুমকির মুখে অসংখ্য ঘটনা অন্ধকারেই থেকে যায়, কোনো দিন আলোর মুখ দেখে না। যে সমাজ নিজের সবচেয়ে অবোধ, নিষ্পাপ আর চার থেকে ১০ বছরের কোমল শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই সমাজের সামগ্রিক সুস্থতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে গেছে। আমাদের চারপাশের চেনা জগত্টা শিশুদের জন্য এক অবর্ণনীয় আতঙ্কের উপত্যকা হয়ে উঠছে।
লোকজন আমাকে ইবনে আইমান হিসেবেই চিনত। সূদূর চীন দেশ থেকে পারস্য হয়ে যে বাণিজ্য কাফেলাগুলো ইয়েমেন দেশে যেত সেই বাণিজ্য পথের নাম ছিল সিল্ক রুট বা রেশমি পথ। দক্ষিণ আরবের স্বপ্নপুরী বলে খ্যাত মরূদ্যান আল জাহরার পাশ দিয়ে সিল্ক রুটের কাফেলা যখন চলাচল করত, তখন আমি অন্যান্য বেদুইন বালক-বালিকার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে কাফেলা যাত্রীদের স্বাগত জানিয়ে ঐতিহ্যবাহী আরবি গানের তালে তালে নাচতে থাকতাম। আমাদের উচ্ছ্বাস দেখে কাফেলা থেমে যেত এবং কাফেলার সর্দার এগিয়ে এসে আমাদের আদর করতেন এবং দেশ-বিদেশের মিঠাই দিয়ে ছেলে-মেয়েদের খুশি করতেন। ঐতিহাসিক সিল্ক রুটের সম্মানিত কাফেলা ঘিরে আল জাহরার অধিবাসীদের এই ঐতিহ্য শত বছর ধরে চলে আসছিল। কাফেলার সদস্যরা আমাদের মরূদ্যানে যাত্রাবিরতি করতেন এবং আমাদের সঙ্গে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক লেনদেন করতেন, তাতে আমাদের সারা বছর বেশ ভালোভাবেই কেটে যেত।