kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ । ১১ মাঘ ১৪২৩। ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বিচারপতি মোর্শেদ বিংশ শতাব্দীর কিংবদন্তি বিচারক

ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



বিচারপতি মোর্শেদ বিংশ শতাব্দীর কিংবদন্তি বিচারক

ভারতীয় উপমহাদেশে আইনাঙ্গনে আইনি পেশা গঠন করেছেন কিন্তু বিচারপতি মোর্শেদের নাম শোনেননি এমন কাউকেই পাওয়া যাবে না। ইংল্যান্ডে লর্ড ডেনিং ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী বিচারক।

আমার মতে, বিচারপতি মোর্শেদ ছিলেন বিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ার লর্ড ডেনিং!

বিচারপতি মোর্শেদের পুরো নাম সাইয়্যেদ মাহবুব মোর্শেদ। তিনি ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি মুসলিম বাংলার অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন সাইয়্যেদ আবদুস সালিক, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত সফল একাডেমিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তির পর বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন এবং পরে বগুড়া ও দিনাজপুরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মাতা ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বোন আফজালুন্নেছা বেগম। ১৯৩৯ সালে বিচারপতি মোর্শেদ কলকাতার সাবেক মেয়র ভারতীয় প্রখ্যাত জাতীয়তাবাদী নেতা মোহাম্মদ জাকারিয়ার মেয়ে লায়লা আর্জুমান্দ বানুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

বিচারপতি মোর্শেদ ১৯২৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগ থেকে প্রথম স্থান লাভ করেন। তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে ১৯৩০ সালে বিএ (সম্মান) ও পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩২ সালে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। তিনি ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তী সময় বিচারপতি মোর্শেদ আইনে উচ্চশিক্ষার্থে বিলেত গমন করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি ‘বার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি লাভ করেন। উল্লেখ্য, ওই বছর ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে বার-অ্যাট-ল পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি প্রথম স্থান লাভ করেন।

পড়াশোনার পাশাপাশি বিচারপতি মোর্শেদ সাহিত্যকর্মে ও সৃষ্টিধর্মী কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। শিশুকাল থেকেই সাহিত্যে তাঁর প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকাকালে কলেজ ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেন। তিনি ১৯৩০ দশকে ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে বিলেতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ বেশ কিছু প্রবন্ধ লেখেন, যা তাঁকে মধ্যপ্রাচ্যব্যাপী পরিচিত করে তোলে। বিচারপতি মোর্শেদ ছিলেন একজন ভালো বক্তা ও বাগ্মী। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং সোসাইটির নেতৃত্ব দেন। ছাত্রজীবনে খেলাধুলার প্রতিও তাঁর ঝোঁক ছিল। তিনি গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের অন্যতম সংগঠক ছিলেন।

বিচারপতি মোর্শেদ তাঁর আইন পেশা ৪০ দশকের প্রথম দিকে কলকাতা হাইকোর্টে প্রথমে শুরু করেন। তাঁর মামা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সহকারী হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে তিনি তত্কালীন প্রখ্যাত আইনজীবী শরত্চন্দ্র বসু ও এ বি খাইতামের জুনিয়র হিসেবে কাজ করেন। কিশোর বয়সেই বারে তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। দেশ বিভাগের পর তিনি ঢাকা হাইকোর্টে যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালের প্রথম দিকে ঢাকা হাইকোর্টে তাঁকে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডহক বিচারপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কিছু ব্যতিক্রমধর্মী সাড়াজাগানো রায়, যথা দ্য মিনিস্টার কেইস, দ্য প্যান কেইস, দ্য বেসিক ডেমোক্রেসি কেইস, দ্য মাহমুদ কেইস এবং দ্য কনভোকেশন কেইস প্রভৃতি যা পাকিস্তানে সাংবিধানিক ইতিহাসের মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডহক বিচারপতি হিসেবে দেওয়া তাঁর একটি রায়কে ‘লিগ্যাল ক্ল্যাসিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিচারপতি মোর্শেদ ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রবাদসম সাহসিকতা ও প্রচণ্ড সাহসী রায় তত্কালীন সরকারকে ঘাবড়িয়ে দিয়েছিল। তাই সরকার বিভিন্নভাবে তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছিল। কিন্তু বিচারপতি মোর্শেদ ছিলেন প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও বিবেকবান মানুষ। যখন তিনি দেখেছেন তিনি বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে বিচার করতে পারছেন না, তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে নিজেই পদত্যাগ করেন ১৯৬৭ সালের ১৬ নভেম্বর। পদত্যাগের পর বিচারপতি মোর্শেদ প্রায় একযুগ বেঁচেছিলেন, তবে শেষের দিকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। আইনের জগৎ ও তার বাইরে সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে বিচারপতি মোর্শেদ ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশ এমন একজন আইনের কিংবদন্তিকে হারাল, যাঁর অভাব এখনো পূরণ হয়নি এবং ভবিষ্যতে কখনো পূরণ হবে বলে মনে হয় না।

পদত্যাগের পর বিচারপতি মোর্শেদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ডিফেন্সকে সংগঠিত করতে সহযোগিতা করেন। তিনি ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষভাবে যোগদান করেন। আইয়ুব খানের ডাকা রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের ১১ দফার পক্ষে ওকালতি করেন। তাঁর বৈচিত্র্যপূর্ণ ক্যারিয়ারে তিনি বহু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি রোটারি ক্লাব, লায়ন্স ক্লাব, পাক-চায়না ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলা-চায়না ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি বাংলা ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ও বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য ছিলেন। ১৯৫৬ সালে বিচারপতি মোর্শেদ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সভাপতি ছিলেন। তিনি ‘লিগ্যাল এইড’ নামে আইনি সহযোগিতা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এটাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম মানবাধিকার সংগঠন।

সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে বিচারপতি মোর্শেদ যে সাহস, উদার হূদয়, ব্যক্তিত্ব ও অঙ্গীকার দেখিয়েছেন, তা আজ সমসাময়িক বাংলাদেশে খুবই জরুরি, যেখানে আইনের শাসন হুমকির মুখে।

এমন এক সময়ে বিচারপতি মোর্শেদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশ সুপ্রিম

কোর্টের আইনজীবী


মন্তব্য