kalerkantho


ঢাকা নগরীকে বাঁচাতে করণীয়

মো. মাহবুুবুল হক

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ঢাকা নগরীকে বাঁচাতে করণীয়

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে একদিন সকালে আচমকা ১০ মিনিটের বৃষ্টির পর কোমরপানি ভেঙে গ্রিনরোডের কাছে ক্রিসেন্ট রোডের একটি বাড়ি থেকে আসার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বৃষ্টিপাত থেকে যে পানি জমা হয় তা ‘রানঅফ ওয়াটার’ বলে পরিচিত।

শহরে এই পানি ‘স্টর্ম’ ড্রেন দিয়ে নিষ্কাশিত হয়ে থাকে। ঢাকা একসময় দালানকোঠায় ঠাসা ছিল না। ছিল অবাধ মুক্ত আকাশ আর সবুজ ঘাসের সমারোহ। বৃষ্টির পানি শুষে নেয়। এমনও বছর গেছে সপ্তাহ ধরে বৃষ্টিপাত কিন্তু তেমন কোনো অসুবিধা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। সেই একই বৃষ্টিপাত পাকা দালান আর বিটুমিনাস সড়ক শান্ত পরিবেশ ওলটপালট করে দিয়েছে। দুটি জায়গা থেকে পানি-বর্জ্য পাওয়া যায়। গৃহ ও বৃষ্টি থেকে। নিষ্কাশনের পৃথক ব্যবস্থা। প্রথমটি ট্রিটমেন্ট প্লান্টে শোধিত হয়ে লেগুনে। দ্বিতীয়টির গন্তব্য কোনো দূরবর্তী জলাধারে বা নদীতে। আজ খাল নিয়ে যে এত কথা হচ্ছে তা আসলে এক প্রকার খোলা স্টর্ম ড্রেন। অবাধে দালান নির্মাণের ফলে বৃষ্টিপাতের পানি মাটিতে পড়ার আগে ছাদে জমা হয়। তারপর স্টর্ম স্ট্যাক দিয়ে মাটিতে। অনিষ্কাশিত পানিটুকু ভূগর্ভস্থ ড্রেনে জায়গা না পেয়ে ঘরদোরে ঢোকে আর সড়কপথে প্লাবন ঘটায়। এ ক্ষেত্রে ম্যানহোল সংখ্যা বৃদ্ধি ও ম্যানহোল ঢাকনা গ্রিল স্থাপন বিবেচনা করা যেতে পারে। তাহলে ভূগর্ভস্থ ড্রেনে নিষ্কাশন হার ছাদ থেকে পড়ার হার থেকে দ্রুত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্লাবন থাকবে না বলে মনে করছি।

দুই মেয়রের কর্মসূচিতে প্রথম যে কাজটিতে হাত দিতে হতে পারে তা হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ স্টর্ম ও বক্স কালভার্ট আবর্জনামুক্ত করা বলে মনে করছি। প্রয়োজনে বক্সটির টপ স্ল্যাব ভেঙে ভেতরে জমে থাকা আবর্জনা অপসারণ করা যেন পানিপ্রবাহে বিঘ্ন না ঘটে। গোলটেবিল বৈঠকে মন্তব্য ‘জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন মনে করেন দুই মেয়র ও নগর পরিকল্পনাবিদরা’। এর মধ্যে গঠিত এত সব কমিটি দিয়ে কোনো কাজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। অযথা দৌড়ঝাঁপ। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কমিটিতে কাজ হয় না। চাই ইচ্ছা, সমন্বিত কার্যক্রম ও যথাযথ বাস্তবায়ন। মেয়রের অধীনে। মেয়রদ্বয় বয়সে তরুণ, এমন সব কাজে অনভিজ্ঞ, তবে নিষ্ঠাবান বলে মনে হচ্ছে। সেটাই ভরসা। খবরের শিরোনাম ‘ডিএসসিসিতে ই-টেন্ডারিং চালু’। উত্তর অংশেও হয়েছে। শিরোনাম ‘ঠিকাদারি না পেয়ে ক্ষুব্ধ কাউন্সিলররা’ উপশিরোনাম ‘মেয়রের সঙ্গে বৈঠকে ক্ষোভের কথা জানান’ বলে খবরে প্রকাশ। বেশির ভাগ কাউন্সিলর নামে-বেনামে নিজেরাও ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার। এই মেয়র সাহেব কিন্তু অন্য ধরনের। তিনি অসাধ্য সাধন করেছেন। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড সরানো।

ডিআইটি হয়নি। স্কুলে পড়ি। বাড়িটি ধোলাইখালের ওপর। নৌকা চলতে দেখেছি। জলাবদ্ধতা নেই। ১৯৫৬ সালেরটি ছাড়া বন্যা দেখিনি। তবে ১৯৮৮ সালেও বন্যা হয়েছিল। আজ খালের ওপর বিটুমিনের পাকা সড়ক, নিচে কংক্রিটের চার ফুট ব্যাস পাইপ বসানো। ভরাট এমনভাবে হয়েছে যে বোঝা যায় না, এককালে খাল ছিল মর্মে প্রতিবেদন ছিল। শিরোনাম ‘রাজধানীর খালগুলো কোথায়?’ উপশিরোনাম ‘দখল-দূষণে মরছে খাল’। অবৈধ দখলকৃত জমির ওপর অর্থকরী স্থপনা নির্মাণ করে দিব্যি ব্যবসা ফেঁদে বসেছে কেউ কেউ। এ বেআইনি কাজটি কিভাবে ওয়ার্ড প্রশাসনের নজর এড়িয়ে গেল বুঝতে পারছি না মর্মে খবরে প্রকাশ। বর্তমানে চলছে নদী আহার পর্ব।

প্রায় চার যুগ পরও এমন কেন অবস্থা? ঊর্ধ্বে আধাঘণ্টা বৃষ্টিপাতের ফলে প্লাবন-ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয় নিয়মিতভাবে। নগরবাসীর পক্ষে প্রস্তুত থাকা সম্ভব নয়। অনর্থক কষ্ট পায়। এরা পৌর কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত কর দেয়। সরাসরি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে মেয়র। তার পরও কেন এমন অবস্থা? দেখেছি ঢাকা বড় হতে। অভিযোগের খাতা খুলে বসিনি। সব কিছুর অভিভাবক থাকে। ঢাকারও উপযুক্ত অভিভাবক ছিল। ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি। নির্বাচন তফসিল নিয়মনীতি থাকার পরও নিয়মিত নির্বাচন হয় বলে মনে হয় না। পৌর কর্তৃপক্ষ সার্বভৌম সত্তা ও অর্থের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয়। একদিকে সাংবিধানিক প্রাসঙ্গিকতা, অন্যদিকে আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও সিদ্ধান্ত কোথা থেকে আসে তা বোঝা যায় না। সে ক্ষেত্রে বলতে হয় পৌর কর্তৃপক্ষের নামেই কর্মকাণ্ড চলছে। অর্থাৎ নিধিরাম সর্দার। এমন পরিবেশে ঢাকা গড়ে উঠছে। আশার কথা, মনের মতো দুজন মেয়র পাওয়া গেছে।

একজন বলছিলেন, ‘তুমি ঢাকা সম্পর্কে লেখা ছেড়ে দিয়েছ?’ আমি বললাম, ‘আমি এ নিয়ে আর লিখব না বলে স্থির করেছি। ’ জানতে চাইল কেন? বললাম, ‘ঢাকা পেকে গেছে। যেকোনো সময়ে টুপ করে পড়বে। শহরটি যদি একটি কমলালেবু মনে করি আর মোটা দাগে কোষগুলো যদি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিধান, নগর পরিকল্পনা, গণপরিবহন, পয়োনিষ্কাশন ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম বলে ধরি, তাহলে বলি এগুলো পেকে পচন ধরেছে। ’ উত্তর পাইনি। সভ্য দেশে এসব দায়িত্ব স্থানীয় সরকারাধীন। বাংলাদেশই ব্যতিক্রম। তাদের আবার মাঝখানে প্রাদেশিক বা রাজ্য পর্যায়ে সরকার ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশে দুই প্রকার সরকারের জন্য দুটি নির্বাচন হয়। জাতীয় ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে। মানুষ দুটি গুলিয়ে ফেলে বলে আমার ধারণা। দুটির ভিত্তি, ভূমিকা, ধরন, কার্যপরিধি ইশতেহার যে সম্পূর্ণ ভিন্ন তাঁদের পরিষ্কার ধারণা আছে বলে মনে হয় না। দুটিই সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকে হেতু দুটিই সার্বভৌম সত্তা। প্রথমটির প্রধান প্রধান কাজ সরকার গঠন, আইন প্রণয়ন, নির্বাহী বিভাগের কাজ পর্যবেক্ষণ ও নিত্যদিনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ। দ্বিতীয়টির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিধান থেকে জনস্বাস্থ্য পর্যন্ত কার্যক্রমগুলো মহল্লা বা গ্রামবাসীর ইচ্ছানুযায়ী বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ। ব্যয় নির্বাহ নাগরিকের দেওয়া পৌর কর ও অন্যান্য উৎস থেকে। যদি একই কাজের জন্য দুটি সত্তা থেকে থাকে, তবে তা অনর্থক ও অপচয় বলে মনে করছি। একটিকে সরিয়ে নেওয়া গেলে বিষয়টি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হতো বলে মনে করছি। সরকার তেমনটি ভাববে কি? একটি কথা উল্লেখ করতে চাই। ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দল কিছু ব্যাপারে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দেশ পরিচালনা করবে আর স্থানীয়ভাবে প্রায় সব কিছু পরিচালনা করবে নির্বাচিত স্থানীয় পর্যায়ের সরকার। যেমন—ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা আর সিটি করপোরেশন।

মেয়রদ্বয়ের কাছে বিনীত আবেদন—১. পুনরুদ্ধার কাজটি, যারা খাল খেয়েছে তাদের অর্থে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে করানো। আশা করা যায়, কাউন্সিলর সাহেব মেয়রকে ও ওয়ার্ডবাসীকে হতাশ করবেন না। অন্যথায় এক্সেভ্যাটর ও আর্থ-রিমুভার যন্ত্র লাগাবেন। নিশ্চিত যে মহল্লাবাসী দ্বিধাহীনভাবে কাজটির প্রতি সমর্থন জানাবে। তাহলে পানি সরে যাওয়ার পথ আরো পরিষ্কার হবে। জায়গা থাকলে বনায়ন। তাহলে এলাকাবাসী একটুকু দম ফেলার সুযোগ পেত। ২. তরল বিষাক্ত বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে মিশে কি রকম ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ কাজ সংশ্লিষ্টদের ছয় মাস সময়ের মধ্যে আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার এমনভাবে স্থাপন করতে হবে, যেন নগরবাসী ঝুঁকিতে না থাকে। ৩. বক্স ড্রেনের উপরস্থ স্ল্যাব ভেঙে অভ্যন্তরস্থ আবর্জনা অপসারণ। ৪. নদীগুলোর গভীরতা বৃদ্ধি, অপরদিকে নিষ্কাশনব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখা। বর্জ্য নদীতে ফেলা যাচ্ছে না নদী বেদখল ও ভরাট হওয়ায়। তাহলে বর্জ্যটা ফেলবে কোথায়? চার নদীই ভরাট। শিরোনাম ‘চার নদীর ভরাটে দখলে ডুবছে ঢাকা’ উপশিরোনাম ‘সমন্বিত বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্পে সরকার ৬৪২.২০ একর জমি অধিগ্রহণ করলেও ১৭৮.৫০ একর দখল হয়ে গেছে (কালের কণ্ঠ ০৭-০৯-২০১৫ তারিখ)। ঢাকা উত্তর-দক্ষিণে উঁচু আর পূর্ব-পশ্চিম পাশে ঢালু। তাই বলে পশ্চিম-পূর্বে বেড়িবাঁধের প্রয়োজন পড়েছে। সে সূত্রে নদীর পানির উচ্চতা যত বৃদ্ধি পাবে বাঁধের উচ্চতাও সেই মতে বাড়াতে প্রয়োজন পড়তে পারে। এমনটি চলতে পারে না। অচিরে এর একটা পথ করতেই হবে বলে মনে করছি।

আমি বিশ্বাস করি, এ সমস্যা আমাদের মেয়রদ্বয়ই সমাধান করবেন। তাহলে অকূল পাথারে ভাসমান ঢাকাও আগের মতো করে চলতে শুরু করতে পারে।

 

লেখক : সাবেক পরিচালক, প্রকৌশল বিভাগ,

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন


মন্তব্য