kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন প্রথম ও দ্বিতীয় দফা

এ এম এম শওকত আলী

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন প্রথম ও দ্বিতীয় দফা

প্রথম দফার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর ৩১ মার্চ দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী প্রথম দফার নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পর থেকে ভোটগ্রহণের দিন পর্যন্ত কমপক্ষে ২১ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা বলা হয়েছে কয়েক হাজার। এ দফার নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছিল যে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে অনিয়ম ও সহিংসতা রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু এর সপক্ষে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়। প্রথম দফার নির্বাচনে ৬৫টি ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের কারণে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও কমিশন দিয়েছিল। আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম দুর্বল দিক হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনিয়ম ও সহিংসতার জন্য নির্দেশ দিয়েই মনে করে যে তার কাজ বা দায়িত্ব শেষ। নির্দেশটি পালন করা হলো কি না সে বিষয়ে আর কোনো কিছু করণীয় আছে কি না তা ভেবে দেখা হয় না। এর ফলে যে বা যারা অনিয়ম ও সহিংসতার জন্য দায়ী, তারা আবার এ ধরনের কাজ করতে উৎসাহ বোধ করে। প্রথম দফার নির্বাচনের সহিংসতার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের এক উচ্চপদস্থ ব্যক্তি বলেছিলেন যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায় কমিশনের নয়। বরং এ দায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এ কথা সঠিক যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রত্যক্ষ দায় কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু এর ফলে নির্বাচন কমিশনের দায় একেবারেই নেই সে কথা গ্রহণযোগ্য নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি তা নয়। চিরাচরিত প্রথায় বদলি বা ক্লোজ ও কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার মূল দায়িত্ব কমিশনের। অন্য কারো নয়। এ জন্য যেকোনো নির্বাচনের কিছু দিন আগে থেকেই নির্বাহী বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কমিশনের অধীনস্থ করা হয়। এর পরও যে কমিশনের কোনো দায় নেই, তা গ্রহণযোগ্য নয়। জানা যায়, দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে ১৩ জন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। এর সঙ্গে রয়েছে অন্য একটি সমস্যা। রাঙামাটি জেলার ৪৯টি ইউনিয়নের নির্বাচন কমিশন স্থগিত করেছে। কারণ প্রধান দুই দল থেকে কোনো মনোনীত প্রার্থী পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই। কমিশনের এ সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের কিছু কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন। তবে কমিশনের এ সিদ্ধান্তের ভিত্তি হলো ওই জেলায় কোনো এক স্থানীয় সংগঠনের সশস্ত্র তত্পরতা। জানা যায়, জেলা প্রশাসক এ তথ্য কমিশনকে দিয়েছেন। এ নির্বাচন আগামী ২৩ এপ্রিল হবে। কমিশনের সপক্ষে এ কথা বলা যায় যে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। তবে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের নয়। সব দলের অংশ গ্রহণ করার জন্য নির্বাচন সহায়ক পরিবেশ প্রয়োজন। সে পরিবেশ এখন রাঙামাটিতে নেই বলেই প্রধান দুই দল কোনো প্রার্থী দিতে পারেনি। উল্লেখ্য, প্রথম দফার নির্বাচনেও এ পরিবেশ সর্বত্র ছিল না। প্রধান এক দলের অভিযোগ ছিল দলীয় প্রার্থী ও সমর্থকদের বাধা দেওয়ার কারণেই ক্ষমতাসীন দলের ৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হিসেবে গণ্য হন। এ ক্ষেত্রে কমিশন সময়মতো চেষ্টা করলে হয়তো এমনটি হতো না। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ভয়ভীতি থাকলে সব দলের প্রার্থীরা অংশগ্রহণে বিরত থাকবেন—এটাই স্বাভাবিক। ৩০ মার্চ প্রকাশিত এক দৈনিকে দেখা যায় যে দ্বিতীয় ধাপে ৬৪২টি ইউনিয়নে নির্বাচন হবে। জানা যায়, চিরাচরিত প্রথায় কমিশনের এক কমিশনার বলেছেন, অনিয়ম ও সহিংসতা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর উক্তি ছিল, ‘অনিয়ম দেখে আঙুল চুষলে ছাড় নয়। ’ উল্লেখ্য, এ ধরনের উক্তি বাস্তবে কোনো কাজে না এলে বিশ্বাসযোগ্য হবে না।

জানা যায়, ৬৪২টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে দুই হাজার ৬৮৪ জন প্রার্থী রয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীর এ পদে সংখ্যা হলো ৬৪১ জন। ৫৬৩ চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী। অর্থাৎ ৭৯ চেয়ারম্যান পদে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই। স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা হলো এক হাজার ১৭৭ জন। তবে এর এক উল্লেখযোগ্য অংশ হলো দুই প্রধান দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। প্রথম ধাপের অনুরূপ ভোটের দিনের আগেই বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের খবর রয়েছে। প্রার্থী, এজেন্ট ও সমর্থকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করার অভিযোগও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রায় পৌনে দুই লাখ সদস্য নিয়োজিত থাকার কথা শোনা যায়। উচ্চ আদালতে মামলার কারণে ৪১টি ইউনিয়নে ভোট হবে না। সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধির ফলে একমাত্র সাবেক বিরোধীদলীয় প্রার্থী ও সমর্থকরা যে আক্রান্ত হয়েছেন তা নয়। এক প্রতিবেদকের মূল্যায়নে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণেও সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এর অন্তত দুটি ঘটনা ৩১ মার্চ একটি দৈনিকে প্রকাশ করা হয়। এক, শেরপুর জেলার নকলা ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী ও সমর্থকদের সঙ্গে একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। এর ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীসহ দুই প্রার্থীর ১৫ জন আহত হন। দুই, কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলায় অবস্থিত বনগ্রাম ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে বর্তমান চেয়ারম্যান (স্বতন্ত্র) প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। অভিযোগ রয়েছে, এর ফলে বর্তমান চেয়ারম্যানের দুজন সমর্থক ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছে। এ অভিযোগ বিদ্রোহী প্রার্থী স্বীকার করেননি। এ প্রতিবেদনে বর্তমান চেয়ারম্যানকে ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ তথ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে অনুমান করা যায় যে বর্তমান চেয়ারম্যান ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন লাভ করেননি। এখানে একই দলের ত্রিমুখী নির্বাচনী লড়াই চলছিল।

 

 

প্রথম ধাপের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল করে ব্যালট বাক্স ভরার ঘটনার বিষয়ও প্রকাশ করা হয়েছে। গত ২২ মার্চ ভোটগ্রহণের আগের রাতে সাতক্ষীরার ১১টি ভোটকেন্দ্রে কে বা কারা পুলিশের পোশাক পরে এ কাজটি করে। অভিযোগ রয়েছে যে অন্য ভোটকেন্দ্রের কর্তব্যরত পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এর ফলে দুষ্কৃতকারীরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনার জন্য সাতক্ষীরার এমপিসহ পাঁচ ওসিকে কমিশন তলব করে তিরস্কার করেছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে মামলা করতে হবে। এ ঘটনাপ্রসূত দুটি বিষয়ের কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয়। তিরস্কারের বিষয়ে বলা যায় যে সরকারি নিয়মে বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে তিরস্কার না করলে তার কোনো প্রভাব হবে না। অন্যদিকে কেন্দ্রে কর্তব্যরত পুলিশ থাকা সত্ত্বেও কিভাবে ও কারা ব্যালট বাক্সে সিল দিয়ে ব্যালট পেপার রাখল তার জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি আইন অনুযায়ী এ ঘটনাটি কর্তব্যে চরম অবহেলার দৃষ্টান্ত। এ প্রসঙ্গে তৃতীয় বিষয়টি হলো, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ ঘটনার পুলিশি তদন্ত শেষ করা। ফৌজদারি আইন অনুযায়ী এটাই নিয়ম। কিন্তু এ নিয়ম সঠিকভাবে কখনো পালিত হয়নি। এ ক্ষেত্রেও যে হবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায়। তবে যেটা হবে তা হলো, কমিশনের চাপের মুখে একাধিক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রাথমিক মামলা হবে। এর জন্য আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ পেশ করা সম্ভব হবে না। কিছু নির্দোষ ব্যক্তিও এর ফলে হয়রানির শিকার হতে পারেন।

এপ্রিল ২ তারিখের এক সংবাদ অনুযায়ী দুই দফা ভোটের পর আট জেলায় সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১১০ জন। নিহতের সংখ্যা ৩২ জন। প্রকাশিত অন্য একটি খবরে এ তথ্যও রয়েছে যে ২০১১ সালের ইউপি নির্বাচনে নিহতের সংখ্যা ছিল চারজন। তুলনামূলক এ পরিসংখ্যান যদি সঠিক হয়, তাহলে বলা যায় এ বছরের নির্বাচনে সহিংস ঘটনার সংখ্যাজনিত মৃত্যু আগের তুলনায় প্রায় আট গুণ। এ তথ্যও এক প্রতিবেদক দিয়েছেন যে নিহত ৩২ জনের অধিকাংশ নিরীহ, ঘটনার শিকার। এসব ঘটনার মামলায় শাস্তি প্রদানের সম্ভাবনা খুবই কম। সহিংস ঘটনার ফলে ভোটার অথবা পথচারীরা মারা যাবে, তার কোনো শাস্তি হবে না—এমন ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে যে এ ধরনের সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পাবে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। এ প্রসঙ্গে ঘর পোড়ানোর ঘটনার কথাও জানা গেছে। নাটোরের লালপুরে এক নিরীহ নারীর ঘরসহ আরো দুটি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। তবে এটাই শেষ নয়। ওই জায়গায় দুটি গ্রামে প্রায় ২০টি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এসব ঘটনারও কি কোনো শাস্তি হবে না। এসব ঘটনার দায় কার, তা নিয়েও অহেতুক বিতর্ক হচ্ছে। জননিরাপত্তা বিধানের দায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তাদের মাধ্যমেই রাষ্ট্র এ বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। তবে নির্বাচনের সময় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দায় নির্বাচন কমিশনের। এ কারণেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তাদের এ সময় নির্বাচন কমিশনের অধীনস্থ করা হয়। এ দৃষ্টিকোণে বিচার করলে বলা যায় যে নির্বাচন কমিশন এ দায় অস্বীকার করতে পারে না। এসব ঘটনাকে অনেকেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চিহ্নিত করেছেন। এ নিয়েও জনমনে সংশয় রয়েছে। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় পৌনে দুই লাখ সদস্য এ সময় মোতায়েন করা হয়েছিল। তারা সবাই নির্বাচন কমিশনের অধীনস্থ ছিল। যা নিশ্চিত করে বলা যায় তা হলো, অহেতুক বিতর্কের মধ্যে দায়সংক্রান্ত বিষয়টির কোনো সঠিক সদুত্তর পাওয়া যাবে না।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

 


মন্তব্য