kalerkantho


এই নৃশংসতা এখনই রুখতে হবে

ফারুকউদ্দিন আহমেদ

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



এই নৃশংসতা এখনই রুখতে হবে

অতি সম্প্রতি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনুকে নৃশংস নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এ রকম আরো অনেক ঘটনাই প্রতিদিন ঘটছে দেশের আনাচকানাচে। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীদের পুলিশ শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করছে, কোথাও কোথাও পারছে না প্রভাবশালীদের অন্যায় তৎপরতার জন্য। তনুকে শুধু হত্যা করাই হয়নি, তাকে নাকি ধর্ষণ করে পরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করছে। দেখা যাক, সত্যিকারের অপরাধী ও তার সহযোগীরা ধরা পড়ে কি না। সংবাদ তথ্য মতে, বখাটেরা তনুকে রাস্তাঘাটে উত্ত্যক্ত করত। উত্ত্যক্তকারীর মোবাইল ফোন (যা নাকি পাওয়া গেছে) ট্র্যাক করে তাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে হয় না। এ ব্যাপারে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করবেন না—এটাই আশা করা যায়। মনে রাখতে হবে, যখনই কোনো একটা ব্যাপারে শৈথিল্য দেখানো হয় তখন এ রকম আরো ঘটনা ঘটে এবং অপরাধীদের স্পর্ধা বেড়ে যায়।

পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন যখনই কোনো নারী নির্যাতন, ছাত্রী হত্যা বা আত্মহত্যায় বাধ্য করার খবর পড়ি, তখনই মনটা খারাপ হয় এই ভেবে যে এ রকম হয়তো আরো অনেক জায়গায় হচ্ছে এবং ধামাচাপা দিয়ে খবর ঠেকানো হয়েছে। মোবাইল সংস্কৃতির কারণে এ ধরনের অপরাধ (টিজিং-অশ্লীল ছবি ধারণ, প্রকাশ ও প্রকাশ করার ভয় দেখানো) মনে হয় আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে এই সংস্কৃতির কারণেই আবার এসব খবরও দ্রুত কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। তবু স্কুল ও কলেজগামী মেয়েরা যে সাধারণভাবে নিরাপদ নয়, তা মফস্বলের যেকোনো স্কুল-কলেজের সামনে ও আশপাশে বখাটে ছেলেদের সাইকেল, মোটরসাইকেল নিয়ে অবস্থান নেওয়া ও ঘোরাফেরা দেখলেই বোঝা যায়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সব এলাকায় ওসি ও এসপি সাহেবরা যথেষ্ট সতর্ক ও শক্ত হলে বখাটের বাড়াবাড়ি কমতে বাধ্য। তবে ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের যে অনেক সময়ই ভিআইপিদের খেদমতে হাজির থাকতে হয়, ওই সব ভিআইপি যাঁরা সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিধানের চেয়ে নিজেদের শান-শওকত ও বুজুর্গি বজায় রাখতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন প্রায় সব সময়। আমাদের দেশ অনেক ব্যাপারেই এগিয়ে গেছে; কিন্তু এসব হীনম্মন্যতা থেকে অনেকেই মুক্তি পাননি। আমি হলফ করে বলতে পারি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে একাধিকবার না বললে আমাদের তথাকথিত ভিআইপিরা এই চৈত্র-বৈশাখের খরতাপেও স্যুট-কোট-টাই পরে ঘুরে বেড়াতেন।

সম্প্রতি ইউপি নির্বাচনের আগে ও পরে দেশে অনেক সহিংসতা ঘটে গেল। পুলিশ-বিজিবি গুলিতেও বেশ কয়েকজন (ছয়-সাতজন) মারা গেল, আহত হলো হয়তো কয়েক ডজন মানুষ। কিন্তু এত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকার পরও নির্বাচন সার্বিকভাবে সুষ্ঠু করা গেল না কেন? নির্বাচন কমিশন পুলিশ-বিজিবিকে দোষারোপ করল অথচ তাদের ডাকেই তাদের নিয়ন্ত্রণেই কাজ করতে গেল। সাধারণত ভোটের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ অন্য সংশ্লিষ্ট সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণেই থাকে এবং ওই কমিশনকে দেশের আইন সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে রেখেছে। তারা তো নির্বাচনের আগে ঢাকায় ৬৪ জেলার সব এসপি-ডিসিকে ডেকে এনে অনেক ব্রিফিংও দিল। কিন্তু দু-চারটি জায়গা ছাড়া প্রায় সব জাগয়াতেই ভোট ছিনতাই, বাধাদান ও অন্যান্য সহিংতা ঘটল কেন—এটা সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাস্য। আসলে নির্বাচন কমিশন নিজেই যথেষ্ট দক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ হয়ে অন্যদের দোষারোপ করছে। আমরা আশা করব, এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অন্যান্য ধাপের নির্বাচনগুলোকে আরো স্বচ্ছ, নিরাপদ ও সুষ্ঠু করার চেষ্টা করা হবে। নিজেরাই সব সুষ্ঠু হয়েছে বললে হবে না, জনগণকে সেটা বিশ্বাস করাতে ও স্বীকার করাতে হবে, কাজের মধ্য দিয়ে, কথায় নয়।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বেশ কয়টি তদন্ত কমিটি বা কমিশন গঠন করা হয়েছে। তারা নিবিড়ভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। দেখা যাক ফল কী দাঁড়ায়। তবে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকের আগে ঘটে যাওয়া কেলেঙ্কারিগুলোর সঠিক ও শক্ত বিচার হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে হানা দেওয়ার সাহস হয়তো পেত না ওই অপরাধীরা। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা যে কিছুটা হলেও দায়ী ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তা না হলে CCTV ও Firewall অবশ্যই সক্রিয় থাকত! শ্রীলঙ্কায় পাচার হওয়া টাকা হয়তো পাওয়া যাবে; কিন্তু ফিলিপাইনে পাচার হওয়া টাকা পেসোতে পরিবর্তিত হয়ে কত হাত বদল হয়েছে তার হদিস মিলবে কি? দেখা যাক, সংশ্লিষ্ট সবার মনে রাখা উচিত, রিজার্ভের টাকা মূলত আমাদের গরিব শ্রমিকদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশের গার্মেন্টের এবং বিদেশে কর্মরত লাখো শ্রমিক-কর্মচারীর পাঠানো টাকা কোনো গভর্নর বা মন্ত্রী-মিনিস্টারের এতে কোনো অবদান নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তব্য ছিল, এই রিজার্ভকে সর্বাত্মক সংরক্ষণ করা। তা তারা এত দিন করেছে, এখন হঠাৎ কাদের শৈথিল্যে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটল—এটাই দেশের মানুষ জানতে চায়। আশা করা যায়, সঠিক তদন্তের পর শক্ত ও সঠিক বিচার হবে এবং দ্রুত! মনে রাখা উচিত, বিচার বিলম্বিত হলে এটা না হওয়ারই শামিল, যা বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই হচ্ছে। এই অবাঞ্ছিত সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতেই হবে।

 

লেখক : সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংক


মন্তব্য