kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


সুষ্ঠু নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন সম্ভব

শাহনেওয়াজ চৌধুরী

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



সুষ্ঠু নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন সম্ভব

কিছু কিছু বা কারো কারো ক্ষেত্রে রাজনীতি লাভজনক ব্যবসা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনোক্রমেই একে সংঘাতহীন বলা যাবে না। তৃণমূলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনে যদি সংঘাতের রূপ এত ভয়াবহ হয়, তাহলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়া দূরে থাক, ঘর থেকে মানুষজন বাইরেই নামবে না। আর যথারীতি নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দেবে—‘ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক ছিল। ’

হ্যাঁ, মেনে নেওয়া যায়, ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম ধাপের ৭১২টি ইউনিয়নের ভোট গ্রহণের দিনে ভোটার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল। নিজ এলাকার উদাহরণ দিতে পারি, শুধু ভোট দেওয়ার জন্য আমার মা ঢাকা থেকে সুদূর পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে পৌঁছেছিলেন ২২ মার্চের তিন দিন আগে। এত দূরের যাত্রাক্লান্তির কথা মাথায় থাকা সত্ত্বেও ভোট দেওয়া চাই!

জনগণ ভোট দিতে চায়। নির্বাচনকে এখনো জনগণ উত্সব মনে করে। জনগণের এমন মানসিকতাকে কয়জন রাজনীতিক সম্মান করতে পারেন? বুকে হাত রেখে কয়জন রাজনীতিক বলতে পারবেন, ‘আমার এলাকার জনগণকে আমি বিশ্বাস করি। ’  অবিশ্বাস মানেই জনগণকে অসম্মান করা। আর এই অবিশ্বাসই রাজনৈতিক সংঘাতের জন্ম দেয়।

জনগণকে অবিশ্বাস করে যেকোনোভাবে ভোটে জেতার আশা করেন পদপ্রার্থীরা। যেকোনোভাবে ভোটে জেতার চেষ্টা করলে স্বাভাবিকভাবেই সংঘাত লাগবে। আর সংঘাত মানেই হতাহত!

অবাক ব্যাপার, যে সাধারণ মানুষটি প্রিয় প্রার্থীর জন্য মরতে প্রস্তুত, সে এমন কী পায়! বরং কেউ কেউ পরিবারকে অকূলে ভাসিয়ে যায়। হায়, রাজনীতি! হায়, জনগণ!

এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোনো কোনো প্রার্থীকে কর্মীদের উদ্দেশে বলতে শুনেছি, ‘প্রয়োজনে ভোটে হারব। তবু আমার জন্য কেউ বিপদের মুখে পড়তে যাবে না। ’ বাহ্, এমন নেতাই তো চাই। এমন নেতা ভোটে হেরে গেলেও কি কোনো দিনই অন্তত তাঁর এলাকার জনগণের মন থেকে হারিয়ে যাবেন? না যেতে পারবেন? এমন জনবন্ধু নেতাদের স্যালুট জানাই। আর প্রত্যাশা করব, ওপরওয়ালা দিনে দিনে এমন নেতায় দেশটা ভরিয়ে দিন! এমন নেতারা নিশ্চয়ই জনগণকে অবিশ্বাস করে সবার সামনে ব্যালটে সিল দিতে বলবেন না! আর তাঁর মানসিকতা কর্মীরা নিজের ভেতরে গেঁথে স্লোগানও দেবে না, ‘চেয়ারম্যান ভোট ওপেনে/অন্যদের ভোট গোপনে!’ অন্যরা মানে ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বাররাই তো। তাঁদের পদটি কি এতই নগণ্য যে কেউ নির্বাচিত হলেই হলো! বাংলাদেশের নির্বাচন কি এতটাই মূল্যহীন আর দুর্বল হয়ে পড়েছে যে জনসম্মুখে ভোট দিতে হবে! এমন বেহায়া কায়দায় নির্বাচিত হওয়ার মধ্যে কোনো গৌরব আছে কি?

অনেকে বলেছেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন সংঘাত বাড়িয়েছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপির প্রার্থী তা কি জনগণের অজানা থাকে? তবে বিগত কয়েক বছরের নির্বাচনে একটি বিষয় প্রতীয়মান হয়েছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে কিছু কোন্দল-সংঘাত তৈরি হচ্ছে! কারণ বিদ্রোহীরা সাধারণত বড় দলগুলোরই হয়ে থাকেন। দীর্ঘদিন দলের হয়ে কাজ করার কারণে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদেরও কিছু অনুসারী তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রার্থীদের নিজেদের চেনাজানা লোকজনের মধ্যে যে কোন্দল বেধে যায়, তার তীব্রতা ব্যাপক হয়।

নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাতে হতাহতের শিকার হয় সাধারণ মানুষই। কতজন প্রার্থীকে খুঁজে পাওয়া যাবে, যাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন! তাহলে জনগণের নিজের ভালো নিজেকেই বুঝতে হবে। ভোটের আগে প্রার্থীরা যখন জনগণের দ্বারস্থ হন, তখনই স্পষ্ট করতে হবে, সংঘাত রুখতে হবে। তা না হলে আমরা ভোটকেন্দ্রে যাব না।

জনগণের উপস্থিতি ছাড়া কি কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে পারে? একমাত্র এই একটি সূত্রেই জনগণের কাছে রাজনীতি আজন্ম নতজানু থাকবে, থাকতে হবে। তবে জনগণকেও তাদের এই ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। সাধারণ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জনগণ তার মূল্যবান জীবন বলি দেবে কি না, তা তাকেই বুঝতে হবে। জনগণই পারে রাষ্ট্রে সুস্থ ধারার নির্বাচন নিশ্চিত করতে। তেমনি জনগণকে অসুস্থ ধারার রাজনীতি পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। কোন্দল বা সংঘাতহীন রাজনীতি বা নির্বাচনের গ্যারান্টি না পেলে নেতার প্রতি আগ্রহ দেখানো থেকে জনগণকে বিরত থাকতে হবে।

প্রতিটি জীবনের মূল্য আছে। জীবনই যদি না বাঁচে, তাহলে কিসের রাজনীতি, কিসের ভোট? প্র্রার্থীর কর্মীরা ভোটারদের ওপর আস্থা রাখতে না পেরে যদি ওপেনে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে পারে, তাহলে ভোটাররা কেন সেই নেতার ওপর আস্থা রাখবে?

প্রথম ধাপে ৭১২টি ও দ্বিতীয় ধাপে ৬৩৯টি ইউনিয়নে ভোট হয়েছে। এতেই যে সংঘাতের নজির মিলল, আগামীতে বাকি ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নির্বাচনে যেন এমন পরিস্থিতি না ঘটে, তার প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই। যেকোনো মূল্যে নির্বাচনবিষয়ক বিশ্বাস-আস্থা অটুট রাখতে হবে সরকারকে।

প্রথম ধাপের নির্বাচনে বিচ্ছিন্নভাবে সারা দেশে নিহতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এক পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ধানীসাফা ইউনিয়নের সাফায় একসঙ্গে কেন এতজন নিহত হলো, তার সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক সরকারের নিজস্ব কৌশল নির্ধারণের জন্য এই হতাহতের কারণ সুনির্দিষ্টভাবে নিরূপণ প্রয়োজন। কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ব্যবহার হলো না; সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মতো এমন কী ঘটনা ঘটেছে ও এমন অরাজক ঘটনা ঘটানোর পেছনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যোগসাজশ আছে কি না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কেননা এই ইউনিয়নে সরকারপন্থী প্রার্থী জয়লাভ করেননি এবং নিহতদের বেশির ভাগ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। তাহলে কেন সহিংসতা ঘটবে? পরিস্থিতি কতটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা জানা দরকার।

প্রথম ধাপের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ৬৫টি কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত করেছে। এটি ভালো দৃষ্টান্ত। তবে স্থগিত করেই ক্ষান্ত হলে চলবে না। পরে ওই কেন্দ্রগুলোর নির্বাচনের সুষ্ঠু সুরাহা করতে হবে। কোনোভাবেই যেন নির্বাচন কমিশনের ওপর থেকে জনগণ আস্থা না হারায়।

বিএনপি দাবি করেছে, অন্তত ৫০টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন বাতিল করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হোক। নির্বাচন বাতিলের নজির বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন দেখিয়েছে কখনো? ২০০১ সালে ঢাকা-১০ (তেজগাঁও-রমনা) আসনে উপনির্বাচনে মোসাদ্দেক আলী ফালুকে নির্বাচিত করতে বিএনপি যেভাবে ওই আসনের জনগণের ভোটাধিকার ভূলুণ্ঠিত করেছিল, তা আজও বাংলাদেশের মানুষ ভোলেনি। তবে বিএনপির আমলে সুষ্ঠু নির্বাচনের নজির সৃষ্টি হয়নি বলে আওয়ামী লীগ আমলে হতে পারবে না এমন নয়!

প্রথম পর্বে অনেক এলাকায় চরম সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। আমার নিজের ইউনিয়নে পুরো নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। জনগণের ভোটেই চেয়ারম্যান-মেম্বাররা নির্বাচিত হয়েছেন। তাতে কোনো দলের কোনো আপত্তি শোনা যায়নি।

এমন অনেক এলাকা খুঁজে পাওয়া যাবে, যেখানে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানকে জনগণ স্বেচ্ছায় ভোট দিয়েছে। এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় কেন? কারণ অনেক ইউনিয়নে নির্বাচনে কোনো কেন্দ্র দখল, পেশিশক্তি প্রদর্শনসহ কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

জনগণ কেন ভোট দিয়েছে? অকপটে এ কথা স্বীকার করা যায়, জনগণ যাঁকে সব সময় পাশে পায়, যাঁর আচরণ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশার ক্ষমতা অসাধারণ, এলাকার জনগণ তাঁকেই তো ভালো চিনবেন। অন্তত এলাকার সবাই চিনবে এমন নেতাই তো আমরা চাই। তাহলে তাঁদের হাত ধরেই সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করা সম্ভব। দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব।

তাহলে প্রশ্ন করা যায়, সুষ্ঠু নির্বাচনের উদাহরণ দেওয়া কি অসম্ভব? অন্তত আমার মায়ের মুখ থেকে শোনা—এবার আমার নিজ ইউনিয়নের সুষ্ঠু নির্বাচনের উদাহরণ তো অস্বীকার করা যাবে না।

লেখক : চিকিৎসক


মন্তব্য