kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


তা হলে কি এখন ‘মোরা একটি খুনিকে বাঁচাব বলে ফন্দি খুঁজি...’

মোফাজ্জল করিম

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



তা হলে কি এখন ‘মোরা একটি খুনিকে বাঁচাব বলে ফন্দি খুঁজি...’

‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি/মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি...। ’ আজ থেকে ৪৫ বছর আগে  এই গানটি গাইতে গাইতে বাঙালি এক নারকীয় শক্তির বিরুদ্ধে পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম অসমযুদ্ধে ঝাঁঁপিয়ে পড়েছিল, দানবের করাল থাবা থেকে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার রক্তলাল সূর্য। সেদিন শুধু একটিমাত্র ফুলই নয়, একটিমাত্র মুখের হাসিই নয়—লক্ষ কোটি ফুল এবং অযুত মুখের হাসিকে বুকের রক্ত দিয়ে রক্ষা করেছিল এ দেশের মানুষ। নির্যাতিতা মা-বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠনকারীদের, নিপীড়িত, বঞ্চিত, অসহায় মানুষের হন্তারকদের দিয়েছিল চরম শাস্তি। বাঙালির বুকের রক্তে সেদিন লেখা হয়েছিল এ জাতির সবচেয়ে গৌরবের, সবচেয়ে বীরত্বের, আত্মত্যাগের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস। ...স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর স্বপ্নের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে আমার মতো অনেকেই নিশ্চয়ই রোমাঞ্চিত বোধ করেন। বাঙালি ওই একবারই বাঁচার মতো বাঁচতে শিখেছিল, একটি ফুলকে বাঁচাবে বলে, একটি মুখের হাসির জন্য নিজেকে উত্সর্গ করেছিল।

এখন স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর মার্চ এসেছিল বাঙালিরই হাতে একটি ফুল দলিতমথিত, নির্যাতিত ও নিহত হওয়ার, একটি নিষ্পাপ মুখের হাসি চিরতরে বিলীন হওয়ার বার্তা নিয়ে। বাঙালি শিল্প-সংস্কৃতিকে সমগ্র চেতনায় ধারণ করে, এ দেশের  ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বুকের ভেতর আগলে রেখে যে কুসুমকলিটি ফুটে উঠছিল কুমিল্লার একটি নামগোত্রহীন হতদরিদ্র পরিবারে, সেই নিষ্পাপ সহজ-সরল কলেজপড়ুয়া মেয়েটিকে অকালে ঝরে পড়তে হলো আততায়ীর কালো থাবার আঘাতে। তনু নামের সেই নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকর্মীটি আর কখনোই ফিরে আসবে না তার বন্ধুদের নতুন কোনো নাটকের সংলাপ শোনাতে, মা-বাবাকে তাদের দুঃখদিনের অবসানের কথা, অনাগত কালের স্বপ্নের কথা, সুখের কথা বলতে।

২.

সোহাগী জাহান তনু যে কলেজের শিক্ষার্থী ছিল, আজ থেকে ৬০ বছর আগে আমিও সেই কলেজের ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের ছাত্র ছিলাম। তখন ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ঠিকানা ছিল কান্দিরপাড়ের বর্তমান পূবালী চত্বর থেকে মাত্র মিনিট দুয়েকের পথ রানির দীঘি নামক সরসীতীরে। সে আমলে গোটা বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে কলেজ ছিল মাত্র ৭০/৭৫টি। এর মধ্যে হাতে গোনা যে পাঁচ-সাতটি বেসরকারি কলেজ শিক্ষার্থীসংখ্যা, শিক্ষার মান, শিক্ষকের মান, সংস্কৃতিচর্চা, প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতি, খেলাধুলা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে ছিল অগ্রগামী, আমাদের কলেজ ছিল তার একটি। রানির দীঘির পাড়ের ওই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষলগ্নে নির্মিত কলেজ ভবনটিতে এখন শুধু উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর ক্লাস হয়; বহুকাল আগে শহরের ধর্মপুর এলাকায় স্থাপিত বিশাল অট্টালিকাই এখন মূল ভবন। তনু ছিল ওই ভবনেরই ছাত্রী। ওর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের একজন ছোট কর্মচারী। তনুদের নিয়ে থাকেন বোর্ডের কোয়ার্টারে। তনুর জন্মও নাকি হয়েছিল ওই কোয়ার্টারেই। গরীবের ঘরের মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়া, নাচ-গান, অভিনয় ইত্যাদিতে বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিল। তার মধুর ব্যবহার, শালীনতাবোধ ও সংস্কৃতিসেবার জন্য ক্যাম্পাসে নিবেদিতপ্রাণ সংস্কৃতিকর্মী তনু ছিল খুবই জনপ্রিয়। মা-বাবার অভাবের সংসারে কিছুটা হলেও অর্থকষ্ট লাঘবের জন্য বাংলাদেশের আরও অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তানের মতো সেও রোজ সন্ধ্যায় দু’টি ছাত্রীকে পড়াতে যেত। সুরক্ষিত, সাধারণের জন্য অগম্য এলাকায় সন্ধ্যাবেলা বাসার কাছেই ওই এলাকারই একটি কলেজপড়ুয়া মেয়ের টিউশনি করতে যাওয়া কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু ২০ মার্চের সন্ধ্যাবেলাটা যে তনুর জন্য ছিল কালবেলা; রোজ ছাত্রী পড়িয়ে সহি-সালামতে রাত বাড়ার আগেই ঘরে ফিরে এলেও সেদিন সে ফিরে আসেনি, তার প্রাণহীন দেহটির সন্ধান পান তার বাবা রাত ১০টার দিকে, বাসার কাছেই একটি কালভার্টের পাশে ঝোপের ভেতর। ...তখন আমাদের রেডিও-টিভিগুলোতে হয়তো স্বাধীনতার মাসের অনুষ্ঠানে গান বাজছিল—‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি!’

৩.

হাঁ, অবশ্যই ১৯৭১-এ একটি ফুলকে বাঁচাতে বাঙালি যুদ্ধ করেছিল। সেদিন বাঙালির সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে ছিল মায়ের জন্য, মাতৃভূমির জন্য অন্তহীন ভালোবাসা, ফুলের মতো নিষ্পাপ বোনটির জন্য, ভাইটির জন্য হূদয় নিংড়ানো মায়া-মমতা-দরদ। সেদিন বোনের সামান্যতম সম্ভ্রমহানির জন্য ভাই নিজের জীবন উত্সর্গ করেছে। আর আজ? আজ তনু হত্যার পরপরই আরও চার চারটি ধর্ষণ ও হত্যার সংবাদ ছাপা হয় সংবাদপত্রে। (সূত্র : দৈনিক কালের কণ্ঠে জনাব ফরিদুর রহমানের উপসম্পাদকীয় : তারিখ ২৭.০৩.১৬)। আর ধর্ষণকারী কে? হত্যাকারী কে? নিশ্চয়ই একাত্তরের নরপিশাচ কোনো খানসেনা? জ্বী না, দুঃখিত, ধর্ষক-হন্তারক এই বাংলাদেশেরই কিছু কুলাঙ্গার সন্তান। একাত্তরে মায়ের-বোনের সম্ভ্রমহানি হতে দেখে যে বাঙালি জীবনের বিন্দুমাত্র মায়া না করে অস্ত্র হাতে ছুটে গিয়েছিল রণাঙ্গনে শত্রুনিধনে, সেই বাঙালি আজ নিজেই তার না-ফোটা ফুলের কলির মতো বোনটিকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলে পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠতে মোটেই ইতস্তত করে না। ...একাত্তর, তুমি হাজার বছর বেঁচে থাকবে আমাদের জীবনে, আমাদের সেদিনের গৌরব-গাথা অবশ্যই আমরা হাজার বীণার তারে তারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শুনিয়ে যাব আগামী দিনের মানুষকে; কিন্তু একটি ফুলকে বাঁচাবার জন্য, একটি মুখের হাসির জন্য একদিন সত্যি সত্যি আমরা অস্ত্র ধরেছিলাম, সে কথা কি বিশ্বাস করবে সেই মানুষেরা? তারা কি কোনো দিন ক্ষমা করবে আজকের এই পৈশাচিকতা, আমাদের এই জাতিগত ক্লীবত্ব? না, কোনো দিনও না। এ ক্ষমার অযোগ্য এক অপরাধ, যা জাতির গৌরবদীপ্ত ললাটে অমোচনীয় কালিতে চিরকালের জন্য এঁকে দিয়েছে কলঙ্কতিলক। ভবিষ্যত্ প্রজন্ম যদি বলে, ২০১৬-তে তোমাদের পরিচিতি সঙ্গীত হওয়া উচিত ছিল ‘মোরা একটি খুনিকে বাঁচাব বলে ফন্দি খুঁজি/করি একটি বোনের মৃত্যু নিয়ে ধান্দাবাজি’, তা হলে?

এবার আসুন দেখি আমরা যারা এই ধর্ষণ, এই হত্যার অপরাধে অপরাধী নই, বরং সমাজপতি হিসেবে, ১৬ কোটি মানুষের ভাগ্যবিধাতা হিসেবে, অহর্নিশ পেশী সঞ্চালন করছি, তারা কতটুকু দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছি এই কলঙ্কজনক ঘটনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ভাবতে অবাক লাগে, চারদিকে এত শিশুহত্যা, নারীহত্যা, ধর্ষণ, খুন, গুমের প্রাদুর্ভাবের পরও কর্তৃপক্ষ তদন্তকার্যে দ্রুততা, আসামী গ্রেপ্তারে তত্পরতা, আসামীকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো, দ্রুত বিচারকার্য সম্পাদন ইত্যাদি বিষয়ে তাদের দায়িত্বপালন শুধু ‘অপরাধী অচিরেই ধরা পড়বে,’ ‘তদন্ত এগিয়ে চলেছে,’ ‘অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে ধরা হবে’ ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ ইত্যাদি পুরনো রেকর্ড, তাও আবার ভাঙা, বাজানোতেই সীমাবদ্ধ রাখছেন। আর আজকাল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে যেহেতু অনেক সংস্থাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত, কাজেই তদন্তকার্যের ভার সকালে পুলিশকে, তো বিকেলে ডিবিকে, তো পরদিন সিআইডি অথবা র্যাবকে দিয়ে সব সন্ন্যাসীকে সম্পৃক্ত করা হয় তদন্তবত্ গাজন উত্সবে। ফলে তদন্তকার্য বিলম্বিত হওয়া ছাড়াও নানাবিধ প্রশ্নের জন্ম হয়। তনু মার্ডার কেসে কুমিল্লার পুলিশ প্রধান তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ার কারণ হিসেবে কিছু ‘টেকনিক্যাল’ অসুবিধার কথা বলেছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, কুমিল্লা শহর বা শহরতলীর সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকায় একটি মেয়ে খুন হলো, আর তার তদন্তকাজে ‘টেকনিক্যাল’ অসুবিধা বা বাধা-বিপত্তির কথা তোলা কি যুক্তিসঙ্গত? মানুষের জীবনের চেয়ে ওই সব তথাকথিত ‘টেকনিক্যাল’ অসুবিধা কি বড়? নাকি ওই এলাকাটিতে বাংলাদেশের আইন প্রযোজ্য নয়? যদি তাই হয়, তাহলে কর্তৃপক্ষের উচিত, জনগণকে তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া, বলা উচিত এই এই কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মামলাটির তদন্তকাজ ব্যাহত হচ্ছে।

আর থানায় মামলার যে এজাহার (এফআইআর) লিপিবদ্ধ হয়েছে তাতে নাকি শুধু হত্যার কথা বলা হয়েছে, মৃত্যুর আগে তনু ধর্ষিত হয়েছিল কি না তার কোনো উল্লেখ নেই এজাহারে। কেন? না, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট তখন পর্যন্ত থানায় পৌঁছেনি, তাই থানা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেনি এজাহারে। এটা হত্যাকাণ্ডের পরদিনের—অর্থাত্ ২১ মার্চের কথা। সেই থেকে আজ ১০/১২ দিন পার হতে চলল, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নাকি কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ এখনও পাঠায়নি। আবার প্রশ্ন, কেন? উত্তর : কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, ময়নাতদন্তের সময় লাশের দেহে যেসব ছোটখাট আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে, সেসব আঘাতের কারণে তনুর মৃত্যু হয়েছে বলে মনে হয় না। শ্বাসরোধ করে মারারও কোনো বাহ্যিক আলামত পাওয়া যায়নি। তাহলে লাশের পাকস্থলীতে যেসব পদার্থ বিদ্যমান ছিল তা এবং অন্যান্য ‘ভিসেরা’ (লাংস্, লিভার ইত্যাদি) পরীক্ষা করতে হবে। অতএব, সময় লাগবে আরও ৮/১০ দিন। কারণ ওটা নাকি কুমিল্লাতে হয় না, ‘ভিসেরা’ পাঠাতে হবে চট্টগ্রামে। ফলে ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সক তাঁর রিপোর্ট না লিখে কলম গুটিয়ে বসে থাকবেন আরও কয়েক দিন। তা না হয় হলো, কিন্তু একটি সুন্দরী তরুণী রাতের অন্ধকারে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্ত বা দুর্বৃত্তদের হাতে একটি নির্জন স্থানে নিহত হয়েছে, এ ক্ষেত্রে অবধারিতভাবেই সন্দেহ জাগবে, হত্যা করার আগে নিশ্চয়ই তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। তা বিজ্ঞ ময়নাতদন্তকারী সেই পরীক্ষাটি কি করেননি? মৃতার পোশাক-পরিচ্ছদও তো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার কথা তাঁর। নাকি ‘ভিসেরা’ রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত ধর্ষণের ব্যাপারে (যার সঙ্গে ‘ভিসেরার’ কোনো সম্পর্ক নেই) কিছু বলা যাবে না—এরূপ কোনো থিওরি সম্বন্ধে জ্ঞাত আছেন তিনি! সোজা কথা, তনু ধর্ষিত হয়েছিল কি না সেই অত্যন্ত সহজ তথ্যটিও আজ দুই সপ্তাহ পর্যন্ত জানা গেল না। এখন আবার পুলিশ কর্তৃপক্ষ আদালতের অনুমতি নিয়ে কবর থেকে লাশ উত্তোলন করবে (৩০ মার্চ) দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের জন্য। আবার প্রশ্ন : কেন? এটা যদি ধর্ষণের আলামত সংগ্রহের জন্য হয়, তাহলে এই চৈত্রের গরমে তা কি এখনো অবশিষ্ট আছে মনে করেন? এত দিনে লাশে নিশ্চয়ই পচন ধরেছে। ফলে ধর্ষণ সংঘটিত হয়ে থাকলে যথাশীঘ্র সম্ভব বিশেষ অঙ্গে কোনো লেডি ডাক্তার দ্বারা ‘সিম্পল টেস্ট’ করিয়ে যে রেজাল্ট পাওয়া যেত এত দিন পরে এই গলিত শবদেহে তা আর পাওয়া যাবে না। বরং ধর্ষিতার চরিত্রে কলঙ্ক আরোপকারী কিছু মন্তব্য প্রদানের সুযোগ এসে যাবে। সত্যি বলতে কি, দ্বিতীয়বার এই ময়নাতদন্ত কেন করা হচ্ছে তা আমার মতো ‘গঙ্গারাম কি সমঝেম না আয়ি’। (বহুকাল আগে শোনা একটি হাস্যোদ্দীপক হিন্দি গানের কলি। ) তবে ময়নাতদন্ত নিয়ে যেহেতু আমাদের দেশে অনেক সময় নানা কথা শোনা যায়, সে জন্য কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি স্পষ্টীকরণ করা।

আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, লাশের সুরতহাল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অপঘাতে বা অপরাধজনিত কারণে মৃত লাশের সুরতহাল (অর্থাত্ লাশটি যে অবস্থায় যেখানে থাকবে, সেখান থেকে সেটিকে একচুলও না সরিয়ে লাশের বিস্তারিত বিবরণ) লিপিবদ্ধ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ হচ্ছে পুলিশ। অথচ পুলিশ বলছে, এ ক্ষেত্রে তনুর লাশের সুরতহাল, যা অকুস্থলে—অর্থাত্ সেই কালভার্টের পাশে, তাদের করার কথা ছিল, তা তারা করেনি। বস্তুতপক্ষে তারা লাশ ‘রিসিভ’ করেছে সিএমএইচে। তার মানে সেনানিবাস কর্তৃপক্ষ অকুস্থল থেকে নিজেরাই লাশটি সরিয়ে সিএমএইচে নিয়ে আসে। আদালতে মামলা ওঠলে এটা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। বিবাদীপক্ষ নিশ্চয়ই এই ব্যত্যয়ের সুযোগ নেবে। অবশ্য এখানে একটা কথা আছে। সেনাবাহিনীর আইনে যদি এসব ক্ষেত্রে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো সেনা কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে অন্য কথা। এদিকে ৩০ মার্চের কালের কণ্ঠের রিপোর্টে দেখলাম, র্যাব কর্তৃপক্ষ নাকি তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির অগোচরে ঘটনাস্থলের অন্তত ছয় ফুট জায়গার মাটি ও ঘাস কেটে নিয়ে গেছে ‘তদন্তের অংশ হিসেবে’। আর এতে নাকি কুমিল্লা জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা ‘বিস্মিত, ক্ষুব্ধ ও হতাশ’। ... মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন!

তবে আমার কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর মনে হয়েছে তদন্তকারী পুলিশ ও র্যাব কর্তৃপক্ষের একজন রেডিমেড প্রেমিক দাঁড় করানোর চেষ্টা। সেই নিমিত্তে মনে হচ্ছে, তারা লণ্ঠন হাতে প্রেমিক খুঁজতে বের হয়েছে। যেন তনুর একজন প্রেমিকের সন্ধান পাওয়া গেলেই কেল্লা ফতে হয়ে যাবে। সে ধরনের চিত্রনাট্যও বোধ হয় লেখা হয়ে আছে। একজন পিয়ার না পেয়ার (উর্দু শব্দ, অর্থ : প্রেম, ভালোবাসা) নামের কাকে যেন ধরাও হয়, কিন্তু ওই মাকাল ফল দিয়ে কাজ না হওয়ায় তাকে ছেড়েও দিয়েছে পুলিশ। আসল খুনিকে ধরার চেষ্টায় আরও গতি সঞ্চার না করে দুপুর রাতে তনুর মাকে ৩০/৩৫ মাইল দূরের বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে এসে রাতভর জেরা (‘এক কথা আশিবার জিগাইছে’) করা হয়। সেই সঙ্গে তনুদের ‘সেনানিবাসের বাসা থেকে পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতিতে তনুর ব্যবহূত ডায়েরি, ছবির অ্যালবাম, ওষুধপত্র ও কাপড়চোপড় নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ’  (দৈনিক কালের কণ্ঠ : মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ)। শেষোক্ত কাজটি যে সম্পূর্ণ বেআইনি তা কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানে না? এভাবে জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, সঠিক সার্চ ওয়ারেন্ট ব্যতীত কারো বাড়িতে তল্লাশিও চালানো যায় না। পুলিশ এই মামলায় কেন যে এ ধরনের ত্রুটি (আমি অবশ্যই ভাবতে চাই না এগুলো ইচ্ছাকৃত) করছে, আমি বুঝতে পারি না। এতে করে অহেতুক জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দেবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সুকীর্তিও সাধারণ মানুষের স্বীকৃতি পেতে ব্যর্থ হবে। অথচ অহরহ নানা অপবাদের কথা শুনতে অভ্যস্ত পুলিশ বাহিনী সাম্প্রতিককালে বেশ কিছু প্রশংসনীয় কাজও করেছে। তবে মনে রাখতে হবে, সাগর-রুনি বা ত্বকী হত্যা মামলায় মানুষের মনে যে সন্দেহের মেঘ জমে আছে, তা না সরে যাওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষ পুলিশের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে দশবার চিন্তা করবে। কারণ হাত বাড়ানো মানেই তো হাত ছুঁয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। আর কে না জানে, ‘পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা’!

৪.

তবে পুলিশ ও পাবলিক পরস্পরের বন্ধু হতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আপনার বাড়িতে চুরি হলে, কেউ উড়ো চিঠি দিয়ে আপনাকে হুমকি দিলে, চান্দা চাইলে আপনি পুলিশের কাছে যাবেন না তো কার কাছে যাবেন? কিন্তু দায়িত্ব পালন না করে পুলিশ যদি প্রকৃত ঘটনা চাপা দেওয়ার জন্য ধামা খুঁজতে কাওরানবাজার-ঠাটারীবাজার-মৌলবীবাজার চষে ফেলতে থাকে, অথবা হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্ট-জজকোর্ট দেখিয়ে অসহায় পাবলিককে ‘দোহন’ করতে থাকে, তাহলে সম্পর্কের উন্নতি হয় কী করে? আর আবহমানকাল থেকে যে ইমেজ-সঙ্কটে পুলিশ ভুগছে তা আরও ঘনীভূত হয়, যখন দেশে গণতান্ত্রিক শাসন থাকে না, যখন সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর আস্থা না রেখে সর্বাংশে—তা বিরোধী দলকে খাঁচায় পোরাই হোক কিংবা ভোটকেন্দ্র দখলই হোক—নির্ভরশীল হয়ে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। তনু মার্ডার এক অর্থে একটা টেস্ট কেস। অত্যন্ত ন্যায্যভাবে আজ বাংলাদেশের সর্বত্র, এমনকি আনাচে-কানাচে, তরুণসমাজ এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে। এ রকম স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ—যার পেছনে কোনো রাজনৈতিক মদদ নেই, নেই কোনো অর্থবিত্তপ্রাপ্তির আশা—মানুষ বহু দিন দেখেনি। এটা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বঞ্চনা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ কি না জানি না, তবে আগ্নেয়গিরির উদগিরণ মনে হওয়া বিচিত্র নয়। তনু হত্যার আগে এ ধরনের অনেক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ইত্যাদি ঘটেছে; কিন্তু এবার স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় নিয়েই যে তরুণসমাজ পথে নেমেছে তাতে সন্দেহ নেই। আর এ ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যায়, তারা ‘ট্রুথ অ্যান্ড নাথিং বাট দ্য ট্রুথ, অনলি দ্য হউল ট্রুথই’ প্রত্যাশা করবে। কর্তৃপক্ষের উচিত অতি দ্রুত সেই সত্য উদ্ঘাটিত করে তাদের তথা দেশবাসীর সামনে নিয়ে আসা।

এ প্রসঙ্গে একটা কথা জোর দিয়ে বলতে চাই, বর্তমান বাংলাদেশে নানা ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে আমাদের প্রচুর অর্জন আছে। তবে যেসব বিষয় সেসব অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে তার অন্যতম হচ্ছে, দেশে সুশাসনের অভাব ও বিচারহীনতা। এ দুটোই হচ্ছে একটি টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। আমাদের খুব ভালো ভালো সোনা দিয়ে মোড়ানো আইন আছে, দুঃখের বিষয়, তার প্রয়োগ নেই। প্রয়োগের বেলায় আমরা বিবেচনায় আনি—সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি কি কাল্লু, না কালা মিয়া হাজী, না আলহাজ মৌলবী কালা মিয়া সাহেব। এসব ডবল, ট্রিপল, কোয়াড্রুপল স্ট্যান্ডার্ড থেকে যত তাড়াতাড়ি আমরা বেরিয়ে আসতে পারব ততই মঙ্গল। আমরা মুখে বলি, আইনের চোখে সবাই সমান, আর বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখার জন্য যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করতে হয় একজন এস কে সিনহার জন্য।

৫.

টিভির পর্দায় আন্দোলনকারীদের একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা আছে দেখলাম : বেড়ায় যদি ক্ষেত খায়, গেরস্ত তবে কোথায় যায়? আশা করি, দ্য মেসেজ ইজ লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার। তরুণদের মনে এ ধরনের প্রশ্নের জন্ম হোক—এটা নিশ্চয়ই কাম্য নয়।

৬.

একটি সংবাদপত্রে পড়লাম, কুমিল্লার ডিসি সাহেব নাকি ২০ হাজার টাকা ও এক খণ্ড জমির প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তনুর পরিবারের কাছে। খবরটি পড়ে বিশ্বাস হচ্ছিল না। একটি প্রতিভাময়ী মেধাবী মেয়ের জীবনের দাম কি মাত্র ২০ হাজারটি টাকা ও এক টুকরো জমি?

হায়, আর কত নিচে নামানো হবে আমাদের দরিদ্র অসহায় মানুষগুলোকে!

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com


মন্তব্য