kalerkantho

রবিবার। ২২ জানুয়ারি ২০১৭ । ৯ মাঘ ১৪২৩। ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮।


এপার-ওপার

মমতাকে হারাতে মরিয়া সোনিয়া

অমিত বসু

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জোর কোথায় প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর। চলাফেরা হুইলচেয়ারে। হাত অবশ। খাইয়ে দিতে হয়। জমা কথা ঠোঁট দিয়ে ঠিকরে বেরোতে গিয়েও থামে। চোখে সবই অচেনা। স্ত্রী দীপা চুলে বিলি কাটলে নির্নিমেষে তাকান। সে চাহনিও শূন্য। কিছুই মনে নেই। আপনপর-জ্ঞান লুপ্ত। তবু অন্তরের গভীরে কোনো এক সুপ্ত চেতনা জেগে থাকে ভবিষ্যতের প্রেরণায়। ডাক্তাররা বলেন, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। বিশ্বাস আছে। তিনি একদিন শক্ত জমির ওপর পা রেখে মাথা তুলে দাঁড়াবেন। প্রথম জিতে সংসদে যাওয়ার পর ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে সম্ভাষণ করেছিলেন নতুন নেতাজি বলে। প্রিয়রঞ্জনের ভাষণে আগুন ছিল। সেই তেজে তিনি পশ্চিমবঙ্গের সূর্য হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন। যখন তাঁকে কংগ্রেসের খুব দরকার, তিনি মৌন হলেন সেরিব্রাম অ্যাটাকে। শেষের দিকে পা রেখেও তিনি থমকেছেন। দিল্লির হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে সাড়া দিচ্ছেন। প্রিয়র দায়িত্ব দীপার কাঁধে। তাঁর লোকসভা আসন রায়গঞ্জে দাঁড়িয়ে বারবার জিতেছেন দীপা। জয় থেকে বঞ্চিত ২০১৪-এর নির্বাচনে। সিপিএম নেতা মোহাম্মদ সেলিমের কাছে তিনি পরাজিত। এবার রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস-সিপিএম এক। দীপাকে মমতার বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি অধীরঞ্জন চৌধুরী মমতার কেন্দ্র কলকাতার দক্ষিণে ভবানীপুরে প্রার্থী করেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ওমপ্রকাশ মিশ্রকে। ওমপ্রকাশ প্রচারও শুরু করেছিলেন। দেয়াললিখনে তাঁর নাম জ্বলজ্বল করছিল। রোড শোতে সাড়াও পাচ্ছিলেন। আচমকা দিল্লির ১০ জনপথে নিজের বাসভবনে দীপাকে ডাকলেন সোনিয়া। দীর্ঘক্ষণ আলোচনা চলল। দীপার মুখ থেকে সোনিয়া শুনলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তারপর বললেন, তোমায় বিধানসভা নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে। দীপার প্রশ্ন, কোথায়। সোনিয়ার জবাব, ভবানীপুরে মমতার বিরুদ্ধে। তাঁকে হারিয়ে তোমার ক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। মমতাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুছে দেওয়াটাই হবে তোমার চ্যালেঞ্জ। দীপা এক মুহূর্ত না ভেবে জানিয়ে দিলেন, তিনি রাজি। সাফল্য  কামনা করলেন সোনিয়া।

দীপা ছুটলেন প্রিয়রঞ্জনের কাছে। প্রিয় দীপার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। দীপা, তাঁর নিথর হাত দুটি নিজের মাথায় তুলে নিয়ে বললেন, দোয়া করো যেন জিতে ফিরতে পারি। কলকাতা বিমানবন্দরে নেমে সোজা চলে গেলেন ভবানীপুরে। কংগ্রেস অফিসে না গিয়ে পা রাখলেন সিপিএম দপ্তরে। শাড়িতে ঘাম মুছে চেয়ারে বসলেন। তার আগে দেয়ালে চোখ বুলিয়ে দেখলেন, স্টালিন, লেনিন, মার্ক্স, এঙ্গেলসের ছবি। তাঁরা তো গণতন্ত্রের পথে হাঁটেননি। সিপিএম তবু কেন তাঁদের মাথায় করে রেখেছে। না, এসব প্রশ্ন করে সম্পর্ক নষ্ট করতে তিনি নারাজ। তিনি এসেছেন আন্তরিক সহযোগিতা চাইতে। সিপিএমও যেন তাঁকে জেতানোর জন্য ঝাঁপায়। সিপিএম তাঁকে স্বাগত জানাল। সব রকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দিল। নিশ্চিন্ত হলেন দীপা।

মমতাকে ঠেকানোর সাধ্য নেই একা কংগ্রেসের। সিপিএম সঙ্গে থাকলে জোর বাড়বেই। দুর্নীতির আগুনে পুড়ছে মমতার ইমেজ। সারদা থেকে নারদ কলঙ্কে, আকণ্ঠ ডোবে তাঁর দল তৃণমূল। এসবের পরোয়া না করে নির্বাচনী সভায় চিত্কারে গলা ফাটাচ্ছেন মততা। বলছেন, কংগ্রেস-সিপিএম জোট অনৈতিক, আদর্শহীন। আগেও দুটি দলে অলিখিত জোট ছিল। কংগ্রেস তখন সিপিএমের ‘বি’ টিম। এখন কংগ্রেস ‘এ’, সিপিএম ‘বি’। ওদের একটা ভোটও নয়। ভেতরে ভেতরে মমতা যে ভাঙছেন, কাউকে বুঝতে দিতে চান না। সব সময় গলা চড়িয়ে কথা বলছেন। মিছিলে এত জোরে হাঁটছেন, তাঁর দলের অন্য নেতাকর্মীরা অনেক পিছিয়ে পড়ছে। সঙ্গীদের দুর্বলতার কথা স্মরণে রেখেই মমতা ঘোষণা করেছেন, বিধানসভার ২৯৪টি আসনেই তৃণমূলের কেউ না কেউ প্রার্থী হয়েছেন। তাঁদের কথা ভুলে যান। মনে রাখবেন, সব আসনেই আমি। ওঁদের ডামি হিসেবে খাড়া করা হয়েছে।

মমতার কথায় স্বৈরতন্ত্র যথেষ্ট। তাঁর চালচলন অ্যাডলফ হিটলারের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৩৩-এ ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা হিটলার চ্যান্সেলর হন। সে সময় ফেডারেল ডায়েট বা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য হিটলারের দলের হয়ে যাঁরা লড়েছিলেন, হিটলার তাঁদের উদ্দেশে জনসাধারণকে বলেছিলেন, ওঁদের ভোট দিন আমাকেই ভোট দিচ্ছেন ভেবে। ওঁরা কেউ নয়, আমিই সব।

তৃণমূল মানেই মমতা, মমতা মানেই তৃণমূল। ১৯৯৮-এ দলটির জন্ম থেকেই সেই ধারা চলে আসছে। মমতার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করার মতো দলে কেউ নেই। দলের সবাই তাঁর আজ্ঞাবহ দাস। স্টিং কেলেঙ্কারিতে দলের ১২ জন নেতা-মন্ত্রী জড়িয়ে পড়ার পর মমতা বুঝেছেন, দলের আর কারো ওপর ভরসা করা যাবে না। নিজের যেটুকু ইমেজ অবশিষ্ট, সেটাই কাজে লাগাতে হবে।

ভবানীপুরেই মমতার জন্ম-কর্ম সব। ১৯৮৪-তে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে তাঁর প্রথম নির্বাচনী জয়। ওই কেন্দ্রের মধ্যেই ছিল ভবানীপুর। তাঁর জিত সিপিএম নেতা লোকসভার সাবেক অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে। সেটা কিন্তু নিজের ক্ষমতায় নয়। ইন্দিরা গান্ধীর মতে তো কংগ্রেসের পক্ষে যে সহানুভূতির হাওয়া বয়েছিল, তাতেই জিতেছেন এখানকার তরুণ কংগ্রেস নেত্রী মমতা। সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র মিলিয়ে একটি লোকসভা কেন্দ্র। যাবদপুর লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যেই ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র থাকায় মস্ত সুবিধা হয়েছিল মমতার। অ্যাকশননির্ভর রাজনীতি করায় এলাকায় তাঁর পরিচিতির অভাব ছিল না।

মুখ্যমন্ত্রী হতে হলে দিল্লির সংসদীয় আসনে নয়, রাজ্যের বিধানসভা কেন্দ্রে জিততে হবে। ২০১১-তে মমতা সাংসদ পদ ত্যাগ করে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে জিতে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। এবারও তিনি সেই কেন্দ্রের প্রার্থী। পাঁচ বছর আগের পরিস্থিতি আর নেই। তখন তিনি লড়েছেন বামফ্রন্ট সরকারকে হটাতে বিরোধী নেত্রী হিসেবে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী ভোটটা পুরোপুরি ঘরে তুলেছিলেন। এবার তিনি সরকারপ্রধান। তাঁর দল শাসকদল। প্রতিষ্ঠানবিরোধী ভোট এবার কংগ্রেস-সিপিএম জোটের ঝুলিতে পড়ার কথা।

মমতা সেটা জেনেই মুখ্যমন্ত্রী নয়, বিরোধী নেত্রীর মতো আচরণ করছেন। হিটলারের  সাগরেদ গোয়েবলস মনে করতেন, একটা মিথ্যা তিনবার বললে সেটা সত্যি হয়ে যায়। অনেকবার বলার দরুন লোকে মিথ্যাটাকে সত্যি বলে মনে করে। মমতা তাই করছেন। তাঁর সরকারের ব্যর্থতাকে সাফল্য বলে চালাতে চাইছেন। নিজের ঢাক নিজে পিটিয়ে বলছেন, আমি পাঁচ বছরে যা করেছি, চল্লিশ বছরে কেউ তা করতে পারেনি। ডাহা মিথ্যাটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মমতার নেতাকর্মীদের কণ্ঠে। নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরেই জয় নিয়ে মমতার সংশয়। ভয় দীপাকে। চিন্তা সোনিয়া-রাহুলকে নিয়ে। তাঁরাও কলকাতায় দীপার হয়ে প্রচারে।

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য