kalerkantho

26th march banner

তনুর খুনিরাও কি পার পেয়ে যাবে?

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তনুর খুনিরাও কি পার পেয়ে যাবে?

গত ২০ মার্চ কুমিল্লায় নিজের বাসার কাছে রাতে খুন হন ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনু। হত্যার আগে তাঁকে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ এসেছে। এরই মধ্যে তনু হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ বিভিন্ন স্থানে ক্ষোভ-বিক্ষোভ করছে। তনুকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে (ধর্ষণের পর হত্যা), এভাবে হত্যা করার প্রবণতা ইদানীং অতিমাত্রায় দেখা যাচ্ছে।   বিশেষ করে নারী ও শিশু ধর্ষণ, অতঃপর হত্যার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের নারীদের এমন নির্মমতা ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। শিশু ও নারীদের পাশাপাশি শারীরিক প্রতিবন্ধীরাও যৌন কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অহরহ, যা আমাদের ক্রমেই আতঙ্কিত করে তুলছে। গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত এ ধরনের খবর প্রকাশ হচ্ছে। আবার প্রকাশিত খবরের বাইরেও এমন ঘটনা রয়েছে অনেক। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই হয়তো ধর্ষণের বিষয়টি নিয়ে উচ্চবাচ্য করছে না বা করতে চায় না। অবশ্য এ কারণেই দেশে কত নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তার প্রকৃত হিসাব পাওয়া যায় না। তবে এ মাত্রা যে ক্রমেই বাড়ছে তা বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণেই আমরা দেখতে পাই। প্রতিনিয়ত ধর্ষণ ও নির্যাতনের প্রভাব হিসেবে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেড়েছে অনেক।

ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের অভিন্ন প্রবণতার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র বুঝতে হলে কয়েকটি সংগঠনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, এ বছরের শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে ৬৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হন সাতজন। ১৩ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে ৬৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে পাঁচজন গণধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় দুই শিশুকে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৫ সালে সারা দেশে ৮৪৬ জন নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে ধর্ষণ-পরবর্তী সময়ে ৬০ জনকে হত্যা করা হয়। আত্মহত্যা করেন দুজন। এর ঠিক আগের বছর ২০১৪ সালে ৭০৭ জন ধর্ষণের শিকার হন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে সারা দেশে এক হাজার ৯২ জন নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হন। এর আগের বছর যে সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৬৬ জন। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩৫ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী ২০১৫ সালে সারা দেশে ২১ হাজার ২২০ নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ধর্ষণ নিয়ে হাজার হাজার মামলা থাকলেও বেশির ভাগেরই সুরাহা হয়নি। গত এক যুগে ৪৮ হাজারের বেশি ধর্ষণ মামলা হলেও দুর্বল তদন্ত আর বিচারকাজ বিলম্বিত হওয়ায় সাজা পাচ্ছে না অপরাধীরা। আবার তদন্তে গড়িমসির কারণে মামলার নিষ্পত্তিও হয় না। এতে বছরের পর বছর ধরে আদালতে ঝুলতে থাকে হাজার হাজার মামলা। বিচার না পেয়ে ভুক্তভোগীরা হতাশ হয়ে একসময় মামলা পরিচালনা থেকেও সরে পড়ে। বিচারকাজ বিলম্ব, ধর্ষকদের শাস্তি না হওয়া ইত্যাদি ধর্ষণ বাড়ার অন্যতম কারণ।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী তনু যে বর্বরোচিত নির্যাতন ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তার বিচারও কি যথাযথ হবে—তা এখন সবার প্রশ্ন। ২০ মার্চ রাতের পর থেকে এরই মধ্যে বেশ কিছুদিন পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটন ও খুনি শনাক্ত না হওয়ার ঘটনাও আমাদের হতাশ করছে। অন্যদের মতো তনুর খুনিরাও পার পেয়ে যেতে পারে, এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

যে দেশে বেশির ভাগ মানুষ মুসলমান, সেই দেশের আত্মস্বীকৃত ধর্ষণকারীরও যথাযথ বিচার কিংবা শাস্তি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ধর্ষণের সেঞ্চুরি অনুষ্ঠান হয়। বিচার হয় না। তাহলে কিভাবে বন্ধ হবে ধর্ষণ ও হত্যার সংস্কৃতি? অথচ দেশের সরকার ও প্রধান বিরোধী দলসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের অবস্থান। তা সত্ত্বেও ধর্ষণকারীদের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। তাহলে কিভাবে নারী-শিশু ধর্ষণ অতঃপর হত্যা থেকে রেহাই পাবে? নারীদের ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পেতে অনেক ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কর্তৃক নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনায় তাদের ওপর আস্থার জায়গাটিও অনেক ক্ষয়ে গেছে। ২৯ মে ২০১২ তারিখে আদালতপাড়ায় পুলিশ কর্তৃক এক নারী শ্লীলতাহানির শিকার হওয়ার পর আক্রান্ত নারীর কাছ থেকে তথ্য গ্রহণকালে গণমাধ্যম কর্মীদেরও পুলিশ শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। অনেক সময় ধর্ষিতার পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা পেতে হয়রানির শিকার হতে হয়। নানা কটূক্তি ও ভয় প্রদর্শন করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেই। তাহলে কিভাবে জনগণের আস্থা অর্জন করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী?

ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশু সঠিক বিচার পাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় পুলিশি সহায়তা না পাওয়ায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক থেকেই যাচ্ছে। বিভিন্ন কারণে আসামিরাও উৎসাহী হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতনকারী অপরাধী যেন কোনোভাবেই শাস্তির আওতার বাইরে না থাকে, সে বিষয়ে সজাগ হওয়ার সময় এসেছে।

কয়েক বছর আগে সারা দেশে ইভ টিজিংয়ের বিপক্ষে সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল। প্রচণ্ড সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ইভ টিজিংয়ের মাত্রা অনেকটাই কমে গেছে। ইভ টিজিং ও ধর্ষণের মতো একসময় এসিড নিক্ষেপের ঘটনাও বেশি ছিল। এখন সেগুলো অনেকাংশে কমে গেছে। সেটিও সামাজিক আন্দোলনের ফলে। মূলত সরকার ও জনগণের কঠোর পদক্ষেপেই তা সম্ভব হয়েছে। যেভাবে ইভ টিজিং ও এসিড নিক্ষেপের বিরুদ্ধে গোটা জাতি সোচ্চার হয়েছিল, সেভাবেই ধর্ষণের বিরুদ্ধেও সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণকে সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে যেসব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল তাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করবে না, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। আইন দ্রুত প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে যদি সমাজের সর্বস্তরে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলা না যায়, তাহলে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকবে।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com


মন্তব্য