kalerkantho


সাদাকালো

ওবামা-রাউল সমাচার রাজনৈতিক ভাষ্য

আহমদ রফিক

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ওবামা-রাউল সমাচার রাজনৈতিক ভাষ্য

একটি বিরাট মহাদেশ নিয়ে গঠিত একটি রাষ্ট্র, নাম তার ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’, বাংলায় বলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর সুযোগ-সুবিধা বিশ্বের সবাইকে ছাড়িয়ে।

যেমন খনিজ সম্পদ, কৃষি সম্পদ, পরে শিল্প-কারখানা, বিশেষ করে অস্ত্র তৈরির কারখানা এবং অস্ত্র ব্যবহার ও অস্ত্র বিক্রি—এ সব কিছু মিলে যুক্তরাষ্ট্র সম্পদে, শক্তিতে, অর্থে বিশ্বে সবার সেরা।

কে তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জিতবে? এ অহমবোধ আসলে মার্কিনি শাসকদের মধ্যে তৈরি হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ের পর থেকে। যুদ্ধে দুর্বল শরিকদের পেছনে ফেলে সেই প্রথম রাষ্ট্রিক শক্তিমত্তায় দুইবার স্বাদ অনুভব করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিচারে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রশক্তি। কে তার সঙ্গে পাল্লায় জিতবে?

তাই যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে যুদ্ধজয়ের পিঠেভাগে সবচেয়ে বড় দাবি যুক্তরাষ্ট্রের। এই টানে কোরিয়া ভাগ, জার্মানি ভাগ, চীনের তাইওয়ান কবজায় রাখা, সব কিছুই ঘটেছে শক্তির জোরে। শক্তি অর্থ ও অস্ত্রের। সেই শুরু চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে ওয়াশিংটনের শক্তির অহমবোধ, আভিজাত্যাভিমান।

তাদের আরো একটি অহংকার গণতন্ত্র নিয়ে। মার্কিনি গৃহযুদ্ধের আমলে প্রেসিডেন্ট লিংকনের ভাষ্যে গণতন্ত্রের যে চরিত্র রেখা সূচিত হয়েছিল, মূলত বিদেশনীতির ক্ষেত্রে তা যে কবে আটলান্টিক মহাসাগরে ভেসে অদৃশ্য হয়ে গেছে তার হিসাব তাদের ঠিকুজিতে নেই।

বিদেশি ভূখণ্ড আগ্রাসনের একের পর এক ঘটনায় তেমন প্রমাণ মেলে।

এ মানসিকতা যে আদৌ গণতন্ত্রের নয়, সে কথা তাদের কে বোঝাতে যাবে। ঘরের কাছে ক্যারিরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে তো তারা খামারবাড়ি বা প্রজারাষ্ট্র হিসেবে দেখে। কেউ একটু এদিক-ওদিক ঘাড় ফেরালে ঘাড় সোজা করে দেওয়ার দায়িত্ব তারা কর্তব্যজ্ঞানে পালন করে থাকে। তা না হলে তাদেরই একদা বশংবদ পানামার রাষ্ট্রপ্রধানকে ধরে এনে জেলে পুরে দেওয়া যায়? গণতন্ত্রের কোন বিধানে এসব লেখা আছে? কিন্তু আমরা শক্তির কাছে সর্বদা মাথা নুইয়ে রাখি। তাই প্রতিবাদ করি না।

দুই.

ক্বচিৎ কোনো রাষ্ট্র মাথা নুইয়ে চলতে অস্বীকার করে। কখনো আত্মমর্যাদাবোধের টানে, কখনো আদর্শ সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষায়। যেমন কফি, চিনি ও হাভানা চুরুটের দেশ নব্য কিউবা। প্রায় ছয় দশক আগে স্বৈরাচারী শাসক বাতিস্তার একনায়কী বর্বরতার বিরুদ্ধে বিপ্লবী রাজনীতির উত্থান ঘটে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে। বাতিস্তার পতন ও শাসনব্যবস্থার নীতি পরিবর্তন কিউবায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় এমন মতাদর্শগত রাষ্ট্রিক পরিবর্তন মার্কিন আধিপত্যবাদী মানসিকতার ওপর এক ধরনের আঘাত বলেই মনে করে ওয়াশিংটন। বৈরিতার সূচনা তখন থেকে। বিশেষ করে বাতিস্তা এবং ওয়াশিংটন-অনুসারী বিশিষ্ট কিউবানরা যখন দলে দলে ফ্লোরিডায় স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে। তাতে সহায়তা ওয়াশিংটনের। এদের সাহায্যে কাস্ত্রোবিরোধী অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালানোও সহজ হয়ে ওঠে।

এবং তারা তা করেছেও। কিউবার আত্মরক্ষার্থে রুশি মিসাইল স্থাপনকে কেন্দ্র করে যে সংকট তৈরি হয়েছিল তা তো এক ঐতিহাসিক ঘটনা। কেনেডি বনাম ক্রুশ্চেভ এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। গোটা বিশ্ব আণবিক যুদ্ধের ভয়ে থরথর করে কেঁপেছে। ভাবনা-বিশ্বসভ্যতা কি তাহলে ধ্বংস হওয়ার মুখে? শেষ পর্যন্ত সুবুদ্ধি বা শুভবুদ্ধির জয়। সংকট শান্তিপূর্ণভাবে কেটে গেছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বনাম কিউবান সমস্যার ইতিহাস সময়ের বিচারে কিছুটা পুরনো। ছোট্ট সমুদ্রকন্যা কিউবাকে গ্রাস করার ইচ্ছা যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আগে থেকেই। ভাবনা যদিও ১৮২০ সাল থেকে, বস্তুত ১৮৯৮ সাল নাগাদ তাদের ইচ্ছাপূরণ খুব একটা কম নয়। স্পেন-কিউবা সংঘাতের সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার গুয়ানতানামো দখল করে সেখানে নৌঘাঁটি স্থাপন করে।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের কতবার যে নানা অজুহাতে কিউবায় হানা, তাদের শাসনব্যবস্থায়, তাদের বাণিজ্যে হস্তক্ষেপ, তার হিসাব সত্যি ইতিহাসে স্থায়ী স্থান পাওয়ার মতো। এর উদাহরণ মিলবে গোটা ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে এমনকি দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে মার্কিনি করপোরেট পুঁজির আগ্রাসনে। এদের সহায়ক শক্তি ফেউ হিসেবে কাজ করেছে সিআইএ দেশটির রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে হস্তক্ষেপ করে।

বিশাল এই অঞ্চলের কৃষিপণ্যের শিল্পগুলোর অধিকার চলে আসে মার্কিন পুঁজিপতিদের হাতে। কফি, চিনি, তামাক ও কলা থেকে খনিজ শিল্প, সর্বত্র নিশ্চিত হয় মার্কিন করপোরেট পুঁজির স্বার্থ। সে স্বার্থ রক্ষায় দরকার পড়ে রাজনৈতিক রাষ্ট্রনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। স্বার্থবাদী, পুতুল সরকারের মাধ্যমে মার্কিন স্বার্থসিদ্ধি। স্বভাবতই সে শাসক যত অত্যাচারী হোক, যত নিষ্ঠুর হোক, যত দুর্নীতিবাজ হোক, স্বৈরতন্ত্রী বা একনায়কী হোক, তাতে মার্কিনি গণতন্ত্রের কিছু যায় আসে না।

কাস্ত্রো শাসনে কিউবান বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হতে না হতে দেখা দেয় সমস্যা। কৃষি সংস্কার ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্প জাতীয়করণের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিনি পুঁজির স্বার্থে আঘাত লাগে। দেখা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। কিউবা থেকে আমদানির পরিমাণ কমতে থাকে। অন্যদিকে মার্কিনি রপ্তানির ওপর আরোপ করা হয় নিষেধাজ্ঞা।

মার্কিনি গণতন্ত্রের এমনই মহিমা যে সামরিক প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ার কিউবার কাস্ত্রো সরকারকে উত্খাতের গোপন নির্দেশ দেন। ইতিহাস পাঠকের মনে থাকতে পারে একই রকম ঘটনার কথা আফ্রিকার কঙ্গোতে। শেষ পর্যন্ত তো সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে নিহত হলেন প্যাট্রিস লুমুম্বা।

কিউবার ওপর মার্কিন অবরোধ যত কঠিন হয়, কিউবার শাসক ও জনগণ আশ্চর্য কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে তা মোকাবিলার চেষ্টা চালায়। তাদের শ্রম, কষ্ট, দেশপ্রেম ও ত্যাগ কিউবাকে আপন শক্তিতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে। দেশ গড়ার এ আদর্শ অনুসরণযোগ্য। কিউবা কিছুতেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথা বিক্রি করেনি।

বাণিজ্য অবরোধের অর্থনৈতিক প্রভাব সত্ত্বেও দেখা গেছে যে শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কিউবা অবিশ্বাস্য রকম সাফল্য অর্জন করেছে। তেমনি করেছে চিকিৎসাক্ষেত্রে।

এ সাফল্যগুলোর কথা মুক্তকণ্ঠে প্রকাশ করেছেন ভেনিজুয়েলার প্রয়াত নেতা হুগো শাভেজ। অসুস্থ শাভেজ উন্নতমানের চিকিৎসা নিতে বারবার গেছেন হাভানায়—লন্ডন বা আমেরিকায় নয়। এই দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উভয়েরই উন্নতির সহায়ক হয়েছে। কিউবার হয়েছে কিছুটা বেশি। অবরোধে ক্লিষ্ট কিউবা সস্তায় তেলজ্বালানি পেয়েছে সমাজবাদী পথে হাঁটা ভেনিজুয়েলার কাছ থেকে। স্তস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন ফিদেল কাস্ত্রো।

তিন.

কিউবাকে কবজা করতে, তার সমাজবাদী শাসন উচ্ছেদ করতে নিষেধাজ্ঞাসহ ওয়াশিংটনের সব চেষ্টা, এমনকি ফিদেলকে হত্যার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। কষ্টকর হলেও কিউবা তার নিজস্ব পথ ধরে চলা অব্যাহত রাখতে পেরেছে। উদাহরণ তৈরি করেছে স্বাধীনভাবে চলার, বিশেষভাবে ক্যারিবীয় ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর জন্য।

কিউবাকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখতে শুধু বাণিজ্যিক অবরোধই ওয়াশিংটনের একমাত্র অস্ত্র ছিল না। এত কাছের দুটি রাষ্ট্র, তবু দীর্ঘ কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম শাসনক্ষমতায় আসীন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিউবা সফরে এলেন অনেক বাধা পেরিয়ে স্বশাসনের প্রতিকূল পরিবেশে। নাম তার বারাক ওবামা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। বলতে হয় ৫৫ বছরের বাণিজ্যিক অবরোধের মধ্যে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মার্চ ২০১৫ সালে ১৯১ সদস্যের সমর্থনে প্রস্তাব গৃহীত হয় যে কিউবার ওপর থেকে যুক্তিহীন অমানবিক অবরোধ তুলে নেওয়া হোক। সম্ভবত রাজনৈতিক বাস্তবতা বিচার করেই প্রেসিডেন্ট ওবামা একাধিকবার মার্কিনি শাসনব্যবস্থার কাছে আবেদন জানান কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে, অবরোধ তুলে নিতে। কিন্তু মার্কিনি প্রশাসনের সমাজতন্ত্রবিরোধী শিলা এত কঠিন যে তা সহজে গলে না, গলার প্রক্রিয়া শুরু হতে অনেক কাঠখড় পোড়ানোর প্রয়োজন হয়।

হয়তো তেমন ভাবনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার ঐতিহাসিক হাভানা সফর। এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা আর আলোচনা, কী হতে পারে এই অভাবিত সফরের পরিণাম?

অবশ্য আমরা দেখছি দুই প্রেসিডেন্টের বক্তব্যেই ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। কিন্তু কাজটা মোটেই সহজ নয়। বিশেষ করে মার্কিন কংগ্রেসে কট্টর রিপাবলিকানদের প্রবল বিরোধিতার কারণে।

এ সফরে ওবামার ভাষণে যেমন রয়েছে কিউবার সার্বভৌমত্বের প্রতি স্বীকৃতি, তেমনি এমন কথাও রয়েছে যে কিউবা এ পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে অসাধারণ উন্নতি করেছে। দুই দেশের স্বাভাবিক সম্পর্ক উভয় দেশের জন্যই সুফল বয়ে আনবে। তাতে কিউবার পর্যটনশিল্প যেমন লাভবান হবে তেমনি এর অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক বুনিয়াদও দৃঢ় হতে পারবে। অজস্র মার্কিন ডলার আমেরিকায় অপেক্ষা করে আছে কিউবায় আসার জন্য।

আর এখানেই যত বিপদ। বিলাসবহুল মার্কিনি হোটেল, ক্যাসিনো, তাদের বিপুল ব্যবসায়িক উদ্যোগ, শিল্প উদ্যোগের প্রচেষ্টা ইত্যাদি সমাজতন্ত্রী কিউবার রাষ্ট্রনীতি ও আদর্শের ওপর কি কোনো প্রভাব ফেলবে না। সচ্ছল মধ্যবিত্ত কিউবানদের মধ্যে কি স্বাভাবিক নিয়মে ভোগবাদী জীবনযাপনের ইচ্ছা গভীর হয়ে উঠবে না, যে ইচ্ছা সোভিয়েত ইউনিয়নের পৌনে ১০০ বছরের সমাজবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছে?

হ্যাঁ, এ-জাতীয় ভবিষ্যৎই কিউবার জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন ভাবনা কি অর্বাচীন যে বিচক্ষণ ওবামা মানবিক তাড়নায় নয়, মার্কিন স্বার্থের প্রতি লক্ষ রেখেই কিউবা সফরে এসেছেন, অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। চেয়েছেন মার্কিনি নীতি-নৈতিকতার প্রসার ঘটুক কিউবায়। কিউবান সমাজবাদকে ধীরে ধীরে অপসারিত করুক মার্কিনি গণতন্ত্র।

এমনটা খুব স্বাভাবিক। এখন প্রশ্ন, রাউল কাস্ত্রোর কিউবা সেসব ভগ্নদূতকে কতটা সামাল দিতে পারবে। কারণ মার্কিনি ভোগবাদ নিয়ে, কথিত গণতন্ত্র নিয়ে বিশ্বনাগরিকদের আকর্ষণ যথেষ্ট প্রবল। এ তাড়না থেকে বাদ পড়ে না মেধাবী সমাজও। এ পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা যেমন উভয় দেশের জন্য প্রয়োজনীয়, বিশেষভাবে দরকার কিউবার জন্য, তেমনি কিউবার জন্য সতর্কতার বিষয়টি অতীব জরুরি। তা না হলে তাদের দীর্ঘ সময়ের আদর্শবাদী সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। সেটা যে ওয়াশিংটন চাইবে বা চাইছে তা বলাই বাহুল্য।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী


মন্তব্য