kalerkantho


পাকিস্তানি পতাকার সাদা রঙে রক্তের দাগ

মোশাররাফ জায়িদী   

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পাকিস্তানি পতাকার সাদা রঙে রক্তের দাগ

লাহোরে ইস্টার সানডের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার নেপথ্য উদ্দেশ্য অনেক। তার একটি হচ্ছে খ্রিস্টানদের হত্যা করা।

পাকিস্তানে অস্ত্রবাজি বা দস্যুপনা কিংবা বড় মাপের জালিয়াতি করলেও শাস্তি পেতে হয় না। আপনি পিটিভির সদর দপ্তরে হামলা চালাতে পারেন, আঘাত হানতে পারেন পার্লামেন্ট ভবন এবং সুপ্রিম কোর্ট ভবনেও (হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রী, আমরা ভুলিনি)। দোকানপাট গুঁড়িয়ে দিতে পারেন, জ্বালিয়ে দিতে পারেন গাড়ি। মেট্রো স্টেশনও আপনি ছাই করে দিতে পারেন। কিচ্ছুটি হবে না। কিন্তু আপনি যদি খ্রিস্টান হন? সে বড় অপরাধ। তাই শাস্তি থেকেও রেহাই নেই।

খ্রিস্টানদের উপাসনালয়, খ্রিস্টান নারী-পুরুষ-শিশুর অস্তিত্ব, খ্রিস্টানদের ব্যবসা-বাণিজ্য—এ সব কিছুই অবহেলা করে যে অপরাধ করেছেন তার দায় নেওয়ার নৈতিক সাহস যদি না থাকে, তবে জাতির নিরাপত্তা নিয়ে বড় বড় বুলি আওড়ানো থামান। নৈতিক বিভ্রান্তি সরল কোনো সমস্যা নয়।

এ হচ্ছে আত্মার অপরাধ। আর বুল্লেহ শাহ, রেহমান বাবা, আবদুল্লাহ শাহ গাজি, বাহাউদ্দিন জাকারিয়া ও হজরত দাতা গনজে বকশের এ দেশে এ ধরনের অপরাধ করে কেউ মাফ পেতে পারে না। কখনো না। পাকিস্তানের আজ যদি কোনো বেদনা ও যন্ত্রণা থাকে, অন্তত তার জন্য কিছুটা হলেও পাকিস্তানি খ্রিস্টানদের প্রতি আমাদের দায়িত্বে অবহেলা দায়ী।

প্রশ্ন হতে পারে, শুধুই কি খ্রিস্টান সম্প্রদায়? অবশ্যই না। আজ দেশের সব সম্প্রদায়ই অবিচারের শিকার। ইস্টার সানডের দিনে এই লেখাটি যখন লিখছি, সর্বশেষ খবর হচ্ছে, লাহোর হামলায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের চেয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি মারা গেছে। এও বড় বিভ্রান্তি। হামলার দায়-দায়িত্ব যারা স্বীকার করেছে, তারা বলেছে, যিশুর পুনরুত্থান দিবস যেসব খ্রিস্টান পালন করছিল তাদের রক্তই তারা ঝরাতে চেয়েছিল।

কিন্তু কেন খ্রিস্টানদের মারা হবে? মারতে হবে কারণ তারা আমাদের চাঁদ-তারাখচিত পতাকার সাদা রংটি জুড়ে রয়েছে। তাদের হত্যা করতে হবে, কারণ পাকিস্তানের গির্জাগুলো থেকে দেশপ্রেমের যে বার্তা আসে তা অতুলনীয়, অসাধারণ। আমাদের এই ইসলামী প্রজাতন্ত্রটির জন্য সেসিল চৌধুরীর মতো আর কেউ ওভাবে জঙ্গি বিমান নিয়ে উড়ে যায়নি। আমাদের ইসলামী প্রজাতন্ত্রে আলভিন রবার্ট করনেলিয়াসের মতো আর  কেউ ন্যায়বিচারের পরাকাষ্ঠা দেখায়নি। নেরিসা, সীমা ও শাবানা বেনজামিনের মতো কেউ দেশের গান গায়নি। শহীদ শাহবাজ ভাট্টির মতো আর কেউ নিপীড়িত, বাকহীন মানুষের হয়ে লড়াই করেনি।

এ ধরনের ঘৃণ্য হামলার পরও পাকিস্তানের কোনো কোনো মহল নির্বিকার থাকে। আবার তারাই নিজেদের সন্তানদের ভালো মানের পড়ালেখার জন্য কনভেন্ট অন জেসাস অ্যানন্ড মেরি, সেন্ট জোসেফ কিংবা সেন্ট প্যাট্রিকের পেছনে দৌড়ায়। চিকিৎসক ও রোগীদের জন্য ভালো সেবিকার কথা হাসপাতালগুলো যখন ভাবে, তখন তাদের খ্রিস্টান নার্সের কথাই ভাবতে হয়। ময়লা, কালিঝুলি সাফ করাতে হবে দ্রুত, এবারও আমরা খ্রিস্টানদের কাছেই ছুটি। আর এই যে জাতীয় পতাকার সাদা রং যে লাল হলো রক্তে, তা ধুয়ে দেবে কে? খ্রিস্টানরাই, আর কেউ না।

আমরা যেন আমাদের বোধ না হারাই, একচোখা না হয়ে পড়ি। অ্যান্থনি পারমাল ফেসবুকে লিখেছেন : লাহোরে ইস্টার সানডে হামলার পর খ্রিস্টানদের ধমনি দিয়ে এখন যে রক্ত বইছে তা মুসলমানদেরই শিরার রক্ত। খবর পেয়ে লাহোরের মুসলমানরা হাসপাতালে ছুটে গেছে। জনে জনে রক্ত দিয়েছে। সত্যিকারের মুসলমানরা এমনই। মানবিক। দানশীল। যেখানে, যে ব্যক্তি বিপন্নবোধ করবে, তার পাশে দাঁড়াবে। ধর্মের ভেদবিচার করবে না। ইস্টার সানডের দিন লাহোরের হাসপাতালগুলোতে, ডিসপেনসারিগুলোতে এমন দৃশ্য আমরা অনেক দেখেছি।

একেকটি মর্মান্তিক হামলার পর আমরা খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করি। আমাদের কেউ কেউ প্রত্যাশা করে, বিশ্ববাসীও আমাদের সঙ্গে শোকগ্রস্ত হোক। কেউ কেউ মরিয়া হয়ে প্রমাণ করতে চায় পাকিস্তান ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। এমন নয় যে আমরা পাকিস্তানিরা মন্দ জাতি। আমাদের মধ্যেও বহু ভালো মানুষ রয়েছে। অনেক পাকিস্তানিই সহিষ্ণু, সংবেদনশীল, দেশপ্রেমিক। তারা প্রতিটি হামলার পরই বলতে চায় নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় নয়, এ আঘাত সব পাকিস্তানের ওপরই এসেছে। কিন্তু ভালো মানুষ হওয়াই তো যথেষ্ট নয়। পাকিস্তানে আজ এমন কোনো গোষ্ঠী, ধর্ম, সম্প্রদায়, ভাষাভাষী নেই যারা নিজেদের সুখী দাবি করতে পারবে। সবাই ক্ষুব্ধ, হতাশ। কারো কারো বঞ্চনা তো এমন, জরুরি ভিত্তিতে যার সমাধান হওয়া উচিত। পাকিস্তানে আজ একজন পুরুষ তুলা রপ্তানিকারক হওয়ার চেয়ে একজন খ্রিস্টান হওয়া বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

আজ পাকিস্তানিদের বলব, কান পাতুন। পাকিস্তানে অন্তত ৩০ লাখ খ্রিস্টান রয়েছে। এর দ্বিগুণও হতে পারে (ঠিকঠাক জরিপ হলে)। তাদের আরো কাছে যান। শুনুন। কিন্তু  নৈঃশব্দ্য শুধু? হ্যাঁ, কেবলই নীরবতা। কারণ তারা কেউ অভিযোগ করছে না। এ কারণেই তাদের হয়ে পাকিস্তানি মুসলিমদের আজ কথা বলতে হবে।

টিটিপি জামায়াতুল আহরার গ্রুপও অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর মতোই, যাদের পেছনে এমনকি অনেক বুদ্ধিমান ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষও আছে। তারা সবাই পাকিস্তানকে দুর্বল করে দিতে, ধ্বংস করে দিতে চায়। আর আপনি যখন কিছু ধ্বংস করে দিতে চান, সর্বশক্তিই প্রয়োগ করে থাকেন।

পাকিস্তান শিক্ষা ক্লাসে যাই শিখে থাকুন না কেন, আসলে আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ডাইভারসিটি, বহু জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের মিশ্রণ। রঙের এই বৈচিত্র্য, প্রাণের এই মিলনমেলাকেই কেউ কেউ ধ্বংস করে দিতে চায়। তারাই আমাদের জাতীয় পতাকায় রক্তের দাগ বসিয়ে দেয়। কারণ স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আমরা এত দিনেও বেশি দূর এগোতে পারিনি। ইস্টার সানডের এই হামলা সম্প্রদায়বিশেষ নয়, পাকিস্তানের ওপরই হামলা। আর আমরা আরো একবার তা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছি। বেশি কিছু করতে পারি বা না পারি, আমরা যেন এই ব্যর্থতার কথা ভুলে না যাই।

লেখক: পাকিস্তানের কলামিস্ট, সমাজ বিশ্লেষক। ওয়েবসাইট : mosharrafzaidi.com ।

সূত্র: ডেইলি দ্য নিউজ।

সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস


মন্তব্য