kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


সময়ের প্রতিধ্বনি

তনু আজ প্রতিবাদের প্রতীক

মোস্তফা কামাল

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তনু আজ প্রতিবাদের প্রতীক

 

২০ মার্চ রাত প্রায় ১০টা। তনু বাসায় ফেরেননি। মা-বাবা উদ্বিগ্ন। কেন ফিরছে না! কোনো অঘটন ঘটেনি তো! নানা দুর্ভাবনা তাঁদের মনে ঘুরপাক খায়। কী করবেন, কোথায় খোঁজ নেবেন কিছুই বুঝতে পারেন না। সময় যতই গড়িয়ে যায় টেনশন ততই বাড়তে থাকে। উদ্বিগ্ন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের কাছে জানতে চান, কী হলো, মেয়েটা এখনো ফিরছে না কেন!

তনুর মা কী জবাব দেবেন! তিনি উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, এত দেরি তো কখনো করে না! আজ কেন দেরি হচ্ছে?

ইয়ার হোসেন মেয়েকে খুঁজতে বাইরে বের হন। অনেকটা পথ এগিয়ে গিয়ে দেখেন, তনুর রক্তাক্ত লাশ রাস্তায় পড়ে আছে। তখন তনুর বাবার মনের অবস্থা কী হয়েছিল তা ভাবতেও পাঁজরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। চোখের পানি ধরে রাখতে পারছি না। নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে পানি পড়ে। একজন বাবার কাছে এর চেয়ে বড় কষ্টের বিষয় আর কী হতে পারে! কতটা অসহায় তিনি! বলা হয়ে থাকে, মেয়েরা মায়ের জাত। আর সেই মায়ের জাতের এই অবস্থা!

আমিও এক কন্যাসন্তানের বাবা। আমার ক্ষেত্রে এ রকম ঘটনা ঘটলে কী অবস্থা হতো আমার!  জানি না কী হতো! আসলে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন! আমার এখন প্রতিদিনের দুশ্চিন্তা আমার মেয়েকে নিয়ে। চারদিকে হায়েনাদের লোলুপদৃষ্টি! মনের মধ্যে সংশয় আমার মেয়েটা নিরাপদ থাকতে পারবে তো! আমার মনে হয়, এ দেশের প্রতিটি মা-বাবা তাঁর কন্যাসন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। দেশ-বিদেশের অসংখ্য উদ্বিগ্ন মা-বাবা অফিসে ফোন করে বলছেন, ভাই, এসব কী হচ্ছে? আপনারা একটু ভালো করে লিখুন! কিছু একটা করুন!

 মানুষের এ দুশ্চিন্তা যে নতুন করে তৈরি হয়েছে তা নয়। সব সময়ই দুশ্চিন্তা ছিল এবং দুশ্চিন্তা নিয়েই মা-বাবাদের দিন কাটাতে হয়। তার পরও কিছু কিছু সময় আছে, যখন দুশ্চিন্তার পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। ইদানীং আজব আজব কিছু ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে, মানুষ পশুর চেয়ে অধম হয়ে গেছে। মায়া-মমতা বলতে কিছু নেই। নিষ্ঠুরতাও চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা দেখলে আমাদের অবাক হতে হয়। আর কিছুই যেন করার নেই আমাদের।

কিছুদিন আগে একটি খবর সবাইকে আলোড়িত করেছিল। দুই বাড়ির মধ্যে ঝগড়া। তাই এক পরিবার অন্য পরিবারের চারটি শিশুকে হত্যা করে মাটিতে পুঁতে রেখেছে। আরেকটি খবর দেখলাম, দুই বাড়ির মধ্যে ঝগড়ার একপর্যায়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষের বাড়িতে এসে মা-বাবাকে না পেয়ে ছোট একটি মেয়েকে কুপিয়ে ঝাল মিটিয়েছে। এত নিষ্ঠুর কেন মানুষ! যারা এটা করছে তারা কি নিজের ছেলেমেয়ে কিংবা ভাইবোনের কথা একবারও ভাবে না!

আবার এমনও ঘটনা ঘটে, বাবা-মায়ের কাছেও যেন সন্তানরা নিরাপদ নয়! এটা কী করে সম্ভব? কিছুদিন আগে একটি খবর দেখলাম, বাবা ও খালু দুই শিশুসন্তানকে হত্যা করেছে। এরা কি আদৌ মানুষ! এই নরপশুদের উপযুক্ত শাস্তি কেন হয় না? কেন এরা ধরা পড়ে না? কেন এরা পার পেয়ে যায়? এসব অপরাধীকে দ্রুত শাস্তি দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করা উচিত, যাতে মানুষ বুঝতে পারে অন্যায় করলে শাস্তি হয়।

প্রিয় পাঠক, তনুর প্রসঙ্গে ফিরে আসি। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। তনুদের পরিবারে সচ্ছলতা নেই। বাবা ইয়ার হোসেন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সামান্য একজন কর্মচারী। তাঁর বেতন দিয়ে সংসারই ঠিকমতো চলছিল না! তার ওপর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচের বোঝা! রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিলেন ইয়ার হোসেন। বাবার কষ্ট বুঝি মেয়েই বোঝে! বাবার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ বুঝি মেয়েই দেখতে পায়! তনু তাই দেখেছিলেন। তিনি বাবার কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে টিউশনি শুরু করলেন। টিউশনির পয়সায় নিজের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়ে পরিবারকেও কিছু দিতেন।

এ দেশে নিম্নমধ্যবিত্তের যে কষ্ট, সেই কষ্টের বোঝা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তনু। তিনি বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। পড়াশোনা শেষ করবেন। ভালো একটা চাকরি করবেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল সেনানিবাসের স্কুলগুলোয় নাচ-গানের শিক্ষক হবেন। নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। সেই সঙ্গে বাবার কষ্টও লাঘব করবেন। কিন্তু নরপিশাচের থাবায় সবই শেষ হয়ে গেল!

ঘটনাটি ঘটে ২০ মার্চ রাতে। মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক এ ঘটনা সম্পর্কে আমরা জানতে পারি ২১ মার্চ। তাও আবার ফেসবুকের মাধ্যমে। কোনো সংবাদমাধ্যম কিন্তু খবরটি আগে দিতে পারেনি বা দেয়নি। আসলে সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমটি এখন সংবাদপ্রাপ্তির একটি বড় জায়গা হয়ে গেছে। অনেক খবর সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টাল এবং টিভি মাধ্যমের আগে ফেসবুক থেকে জানতে পারি।

তনুর রক্তমাখা ছবিটা দেখলে যে কেউ চমকে উঠবেন। আমিও চমকে উঠেছিলাম। তারপর আর দ্বিতীয়বার তাকাতে পারিনি। ওই ছবির দিকে চোখ পড়লেই বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। এসব কী হচ্ছে! কোথায় চলেছে এই প্রিয় স্বদেশ!

সারা দেশেই শিশু-কিশোর, তরুণী-যুবতী মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। অনেককে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই নির্মমতা-নিষ্ঠুরতার কারণ কী? এই নরপশুদের রুখে দেওয়া যায় না? নিশ্চয়ই যায়। তার জন্য যে আন্তরিকতা দরকার তা কি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আছে? এ প্রশ্ন আমার একার নয়, দেশের আপামর মানুষের।

তনু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন পার হলেও কোনো কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। অথচ সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। এখনো পুলিশ বলছে, আমরা দেখছি। হাস্যকর সব কাণ্ড করছে। তনুর মা-বাবাকে ডেকে নিয়ে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করছে। মেয়ে গেল যাঁর, তাঁকেই এখন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। মেয়ে জন্ম দিয়ে তাঁরা যেন অপরাধ করে ফেলেছেন! পুলিশ মা-বাবার কাছে জানতে চায়, তনুর সঙ্গে কোনো ছেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল কি না? হায়রে পুলিশ!

একটা নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে থেকেও একজন কলেজ ছাত্রী তনু নিরাপদ থাকতে পারলেন না। তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? এ প্রশ্ন দেশের লক্ষ-কোটি মানুষের। তারা নিরাপত্তাহীন। তাদের ঘরে যে মেয়েটি বেড়ে উঠছে তার নিরাপত্তা নিয়ে তারা উত্কণ্ঠিত। কে দেবে তাদের নিরাপত্তা? যেখানে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়! যেখানে মানুষের কোনো মনুষ্যত্ব নেই; মায়া-মমতা নেই। যেখানে নিষ্ঠুরতার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে সেখানে কে কার নিরাপত্তা দেবে?

আজ অসহায় মানুষের কাছে তনু এক প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সব মা-বাবা তনুকে নিজের সন্তান মনে করছেন। প্রত্যেকেই ভাবছেন, তাঁর মেয়ের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটতে পারত! তাই তাঁরা ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। সারা দেশের ঘরে ঘরে আজ প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। এই দৃশ্য দেখে বারবার মনে হচ্ছে, তনু মরেনি। তনু বেঁচে আছে প্রতিটি মা-বাবার হৃদয়ে। মা-বাবাকে সে প্রতিবাদী করে তুলেছে। যাঁরা প্রতিবাদ কাকে বলে জানতেন না, তাঁরাও আজ রাস্তায়। মানুষের ভেতরে ক্ষোভের এই আগুন নেভাতে না পারলে দেশের পরিণতি ভয়াবহ রূপ নেবে।

অপরাধী খোঁজার নামে বাহানা না করে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। অপরাধীর উপযুক্ত বিচার করুন। কানাডাপ্রবাসী বন্ধুবর সাংবাদিক সওগাত আলী সাগর প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে যেমন বললেন, ‘আমাদের একটাই দাবি, প্রকৃত অপরাধীর বিচার চাই। ’ আমার দাবিও তাই। এ ক্ষেত্রে কাউকে যেন বলির পাঁঠা বানানো না হয়! নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন। তনুর প্রেমিক সাজিয়ে কাউকে যেন শাস্তি না দেওয়া হয়! তাহলে আইনের প্রতি মানুষের কোনো আস্থা থাকবে না।

দেশের সাধারণ মানুষ তাকিয়ে আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে। তাদের কর্মকাণ্ড তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা যদি প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করতে চায়, তাহলে তা সামাল দেওয়ার সাধ্য কারো নেই। সারা দেশে যে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে তাতে যেন আর ঘি ঢালা না হয়। কালক্ষেপণও কিন্তু বিচার থেকে বঞ্চিত করার একটা প্রক্রিয়া। এটা মানুষ বুঝতে পারে।

আমরা জানি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী অধিকারের ব্যাপারে খুবই সচেতন। নারীর সম্ভ্রম হরণকারীর বিরুদ্ধে তিনি সব সময় লড়েছেন। ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি একসময় রাস্তায় নেমেছিলেন। আমরা আশা করি, তনুর ব্যাপারেও তিনি কোনো ছাড় দেবেন না। তিনি নিশ্চয়ই তনু হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন আছেন। তিনি নিশ্চয়ই প্রকৃত অপরাধীকে শাস্তি দেবেন। তনুকে নিজের সন্তান মনে করে প্রয়োজনে তিনিও রাস্তায় নামবেন।

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

mostofakamalbd@yahoo.com 


মন্তব্য