kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়

মো. মইনুল ইসলাম

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়

বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন হয়ে গেল কিছুদিন আগে। বিএনপি দেশের বড় দুটি দলের একটি। সংসদে না থাকলেও কার্যত তারাই বিরোধী দল। তিনবার তারা ক্ষমতায় ছিল এবং ভবিষ্যতেও ক্ষমতায় আসার আশা পোষণ করে। বিরোধী দলকে ছায়া সরকারও বলা হয়। ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন ঘিরে যেমন উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল দলের, তেমনি কিছু প্রত্যাশা ছিল দেশবাসীর। দলকে গোছানো, নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চার এবং নতুন আদর্শ-উদ্দেশ্য প্রণয়নের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সূচনা করবে সম্মেলন—এটাই প্রত্যাশা ছিল বিএনপি সমর্থক ও সাধারণ মানুষের।

একটি রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য হবে জাতিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করাকেই জাতীয় অগ্রগতি বোঝায়। বিএনপির সম্মেলনে গণতান্ত্রিকতার তেমন কোনো আলামত দেখা যায়নি। দেখা গেল, সভানেত্রী খালেদা জিয়া (এরপর শুধু খালেদা জিয়া) একটি লিখিত বক্তব্য সভায় পাঠ করলেন। তাতে যে কয়টি বিষয় প্রাধান্য পেতে দেখা গেল তা হলো—(১) প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, (২) দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, (৩) জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোট গ্রহণের বিধি সংবিধানে পুনঃপ্রবর্তন, (৪) সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের জন্য গণশুনানির ব্যবস্থাকরণ এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ২০৩০ নামের একটি রূপকল্প প্রদর্শন। তা ছাড়া সুনীতি, সুশাসন, দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন, সুষ্ঠু নির্বাচন প্রভৃতি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করতে দেখা গেল।

খালেদা জিয়ার উপরোক্ত বক্তব্যগুলো তাত্ত্বিকভাবে বেশ সুন্দর এবং শুনতে ভালোই শোনায়। একটি কথা আছে—‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাই’। তিন তিনবার ক্ষমতায় থাকাকালীন এসব বিষয়ে খালেদা জিয়ার আচরণ ও অবস্থান কী ছিল তা জনগণ জানতে চায়। এসব বিষয় বাস্তবায়নে তাঁর সরকারের আদৌ কোনো উদ্যোগ ছিল কি? এ ব্যাপারে ওয়ার্কার্স পার্টির চেয়ারম্যান ও মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন যথার্থই বলেছেন, সম্মেলনে খালেদা জিয়ার উল্লিখিত বিষয়গুলোর কথা নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিন দলীয় জোটের রূপরেখায়ই ছিল। এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়াই ক্ষমতাসীন হন। তখন এসব বিষয় তাঁকে বিন্দুমাত্র আমলে নিতে দেখা গেল না। যা দেখা গেল, তা হলো—দলীয়করণ, দুঃশাসন, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের রমরমা কাজ-কারবার। টিভির পর্দায় আলোচ্য সম্মেলনে এমন কয়েকজন ছাত্রনেতার মুখ দেখলাম, যাঁরা ডাকসুর নেতা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ ঢাকার বিভিন্ন অফিসে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও তদবিরবাজির রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। এই পাণ্ডাদের একজন দুঃখজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন। আর কয়েকজন দলে দায়িত্বশীল পদ পাচ্ছেন বলেও শোনা যাচ্ছে। দুর্নীতি ও দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন এবং সুশাসনের কথা যখন বিএনপি নেত্রীর মুখে শুনি, তখন মনে হয়, ‘ভূতের মুখে রাম নাম শুনছি। ’

গণতন্ত্র, জনগণ ও নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি বেজায় সোচ্চার। সম্মেলনেও এ ব্যাপারে জোরালো দাবি তুলেছেন এবং হাসিনামুক্ত নির্বাচন চেয়েছেন। বিশ্বাস করার কারণ আছে, তাঁর কাছে গণতন্ত্র একটি লোক ভোলানো বুলি মাত্র। প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক দর্শন, যা প্রতিফলিত হয় জনগণের শাসনে। এর মূল ভিত্তি হচ্ছে, একগুচ্ছ মূল্যবোধ, বিধিবিধান ও বিশ্বাস। জনগণের সম্মতি নিয়ে শাসন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, ভিন্ন মত, ভিন্ন পথ, বিরোধী দল, তথা বহুত্ববাদিতাকে গ্রহণ এবং সম্মান প্রদর্শন গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আইনের শাসন ও সুশাসন গণতন্ত্রের অপরিহার্য অঙ্গ। ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্র জীবনের সর্বক্ষেত্রে জনগণের ক্ষমতায়ন না হলে গণতন্ত্র অর্থপূর্ণ হয় না। খালেদা জিয়ার গণতন্ত্র হলো শুধু নির্বাচন। সেটা ক্ষমতায় যাওয়ার একটি সিঁড়ি মাত্র। সে সিঁড়িটিও হতে হবে তাঁর মন মতো, যা তাঁকে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করে দেবে। মাগুরার কালো নির্বাচন, তেজগাঁও-রমনা এলাকায় ফালুর নির্বাচন এবং ২০০৬-এ তাদের বিরাট ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনী কারসাজি মানুষ ভুলে যায়নি। তাদের উপরোক্ত রেকর্ডগুলো তারা সত্যিকার নির্বাচনে বিশ্বাসী বলে সাক্ষ্য দেয় না। সম্মেলনের ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে আওয়াজ তারা তুলেছে সেটা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে তুলেছে। জনগণের স্বার্থে নয়।

সম্মেলনে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার কথা বলেছেন এবং সে উদ্দেশ্যে সংবিধানে সংশোধনী আনার কথাও বলেছেন। এটা সত্য যে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বেজায় বেশি। সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে অনেকটা প্রধানমন্ত্রীর একনায়কসুলভ শাসন দেশে বর্তমানে চালু আছে। এ ধরনের একনায়কত্ব খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ও চালু ছিল। তিন তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি এ ব্যাপারে সংবিধান সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেননি। এমনকি এ ব্যাপারে টুঁ শব্দটিও করেননি। বরং দেখা গেল, আলোচ্য জাতীয় সম্মেলনে তিনি এককভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দল সংগঠন ও পরিচালনার জন্য তাঁকে একক ক্ষমতা দিয়ে দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হয়েছে। দলের ভেতরে যিনি গণতন্ত্র চর্চা করেন না, তিনি দেশে কিভাবে গণতন্ত্র চালু করবেন—সেটাও ভাবার বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার কথা বলে দলে একক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার কাজটি যে একেবারেই বিপরীতধর্মী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথাও বলেছেন। তবে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি উপজেলা ব্যবস্থা, যেটি স্থানীয় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, তা স্থগিত করে দেন। তিনি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সুশাসনের কথা বলেছেন। অথচ তাঁর আমলে (২০০১-০৬) বাংলাদেশ পরপর চারবার বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ দেশের খেতাব লাভ করে। তাঁর শেষ মেয়াদে তদীয় গুণধর পুত্রের নেতৃত্বে ‘হাওয়া ভবন’ যে সারা দেশের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের দুর্গ ছিল, তা কে না জানে!

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 


মন্তব্য