kalerkantho


তনু হত্যাকাণ্ড ও কয়েকটি প্রশ্ন

ফারজানা হুসেইন

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তনু হত্যাকাণ্ড ও কয়েকটি প্রশ্ন

উনিশ বছরের মেয়েটি বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল টিউশনি করতে। রাত ১০টা পর্যন্তও সে বাড়ি না ফিরলে বাবা বের হন মেয়েকে খুঁজতে। বাড়ি থেকে কিছু দূরেই মেয়ের একপাটি জুতা, এক গোছা চুল, মোবাইল ফোন ও সবশেষে মৃত অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়। মুখে, শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল তার; রক্তাক্ত জখম। মেয়েটির রক্তাক্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। মেয়েটির নাম সোহাগী জাহান তনু। দেশজুড়ে এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে মানববন্ধন হচ্ছে; রাস্তায়, পত্রিকায়, অনলাইনে তর্কের ঝড় উঠেছে। অনেক অনেক প্রশ্ন সবার মনে। প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। মৃত ব্যক্তি কথা বলতে পারে না, তাই সে বলতে পারেনি সেদিন কী হয়েছিল, কিভাবে হয়েছিল, কে বা কারা করেছিল।

এখনো প্রশাসন রহস্যের জট খুলতে পারেনি। সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়নি, ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও নেই। শুধু আছে প্রশ্ন আর আছে অনুমাননির্ভর উত্তর। ঘটনার এই অবস্থানে কয়েকটি সাদাসিধে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয় না। তবু কেন যেন আমরা উত্তর পাই না, জল ঘোলা করি অকারণে।

কেন থানায় হত্যা মামলা হয়েছে? কেন ধর্ষণ মামলা হয়নি? তনুকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে, শরীরে আঘাতের চিহ্ন, ক্ষত, রক্তাক্ত। এ কথা প্রশ্নাতীত, তাকে হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং হত্যা মামলা যৌক্তিক। এখন প্রশ্ন, ধর্ষণ মামলা নয় কেন? তনুকে যে অবস্থায় পাওয়া গেছে তাতে ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হতে পারে বা ধর্ষণের চেষ্টা করা হতে পারে। কিন্তু এখনো সে বিষয়ে সুনিশ্চিত নয় কেউই। ময়নাতদন্ত শেষে রিপোর্টের জন্য সবাই অপেক্ষমাণ। অপরাধ আইন বলে পুরুষাঙ্গ ব্যতীত আর কোনো কিছু প্রবেশে ধর্ষণ হবে না, খুব বেশি হলে শারীরিক নির্যাতন বলে গণ্য হতে পারে। তনুর ময়নাতদন্ত শেষে তার যৌনাঙ্গে পুরুষাঙ্গের উপস্থিতির প্রমাণ না পাওয়া গেলে তা শারীরিক নির্যাতন বলে গণ্য হতে পারে; ধর্ষণ হবে না কোনোভাবেই। যতক্ষণ শারীরিক পরীক্ষা করে তদন্তের রিপোর্ট না পাওয়া যায় ততক্ষণ তাই ধর্ষণ মামলা দায়ের করা যাচ্ছে না।

দুই.

সেনানিবাস এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে সুরক্ষিত সেনা এলাকায় মৃতদেহ পাওয়া নিঃসন্দেহে ভাবিয়ে তোলে আমাদের। আমাদের সুরক্ষিত সেনা এলাকা আসলে কতটা নিশ্ছিদ্র তা খতিয়ে দেখার বিষয়।

ইমরান চৌধুরী নামের এক ব্লগারের সাম্প্রতিক লেখা থেকে কোট করছি, ‘সেনাবাহিনী এই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কি না, সেটা নিয়ে কিছু বলা অর্থহীন। তবে সেনানিবাসের নিরাপত্তা বিধানে সেনাবাহিনীর ওপর ঢালাও অভিযোগ আরোপ করার আগে আমাদের জানতে হবে কুমিল্লা সেনানিবাস ও এর প্রকৃতি সম্পর্কে। এই সেনানিবাসের সঙ্গে অন্য সেনানিবাসের মূল পার্থক্য হচ্ছে, এর বুক চিরে চলে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেট-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। সিলেট অভিমুখী সড়কটি সেনানিবাসের ভেতরেই চট্টগ্রাম অভিমুখী গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। স্টেশন সদর দপ্তর থেকে শুরু করে বেশ কিছু স্থাপনার অবস্থান একেবারেই মহাসড়কের লাগোয়া। সেনানিবাসের মধ্যে অথবা গা ঘেঁষেই রয়েছে বেসামরিক বাজার, আবাসিক এলাকা; যা সেনানিবাসের নিরাপত্তায় বাড়তি ঝুঁকি আরোপ করে। এমন স্থানে বিশেষ নিরাপত্তা প্রদান করা যেমন দুরূহ, তেমনি তা নিশ্চিত করতে গেলেও বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সেনা প্রশাসনের টানাপড়েন শুরু হয়ে যায়। মোট কথা, এই সেনানিবাসে গেট দিয়ে চেকপোস্ট বসিয়ে যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যাওয়া হয়, তবে মহাসড়কগুলো যানজটে ফেঁসে থাকবে সর্বদা। যারা এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত, তারা নিরাপত্তার শৈথিল্যের জন্য সেনাবাহিনীকে দায়ী করার আগে দুবার ভাববে। ’ পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, ঘন গাছপালার মধ্যে কালভার্টের কাছে যে স্থানে তনুর মৃতদেহ পাওয়া গেছে তা কুমিল্লা সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকা এবং এখানে সেনানিবাসের কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই। এই রাস্তা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। সেনানিবাসের অভ্যন্তরের কেউ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এমন কোনো প্রমাণ এখনো নেই; তেমনি হত্যাকারী সেনাবাহিনীর কেউ নয় সে প্রমাণও কিন্তু নেই। সুতরাং প্রশাসন এই হত্যাকাণ্ডের দোষী বা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার আগ পর্যন্ত আবারও ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। কারণ আইনের প্রথম সবক : দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত আইনের চোখে প্রত্যেকেই নির্দোষ।

যত ধর্ষণের ঘটনার কথা আমরা জানতে পারি, তার চেয়ে আরো বেশি ঘটনা আমাদের নজরে পড়ে না, খবরের কাগজে আসে না, আমরা লুকিয়ে যাই। কারণ বিচার চাইতে গেলে ধর্ষণের শিকার নারীকে মিডিয়ার সামনে, সমাজের সামনে, আইনের সামনে বারবার ধর্ষিত হতে হয়। সে নারী থানায় গেলে কিছু চকচকে চোখের সামনে তার রগরগে ধর্ষণ গল্প শোনাতে হয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। প্রথম পরীক্ষা ধর্ষকের নয়, বরং ধর্ষণের শিকার ওই নারীর।

হাইমেন বা সতিচ্ছেদ পর্দা আছে তো? আর আছে সাক্ষ্য আইন, যেখানে ভিকটিমের পূর্ববর্তী ক্যারেক্টার এভিডেন্স আদালতে হাজির করে প্রমাণ করে দেওয়ার চেষ্টা চলে যে ধর্ষণের ঘটনার জন্য ধর্ষকের চেয়ে ভিকটিম বেশি দায়ী। টু ফিঙ্গার টেস্টের নামে ধর্ষণের শিকার নারীকে ডাক্তারের কাছে প্রমাণ করতে হয় তার যৌন-অনভিজ্ঞতা, তার সতীত্ব। আমাদের নারী ডাক্তারের অপ্রতুলতার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষ ডাক্তার আর ওয়ার্ড বয়ই এই পরীক্ষা করেন। কোনো বিধান নেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ভিকটিমের জন্য কোনো সাইকিয়াট্রিস্টের সেখানে উপস্থিত থাকার। এ ধরনের ক্যারেক্টার এভিডেন্স বা সতীত্বের প্রমাণ ধর্ষণ মামলা ছাড়া আর অন্য কোনো ক্রিমিনাল কেসে বিচারপ্রার্থীকে প্রমাণ করতে হয় না।

১৯৭২ সালের মাথুরা রেপ কেস ভারতীয় ধর্ষণ আইনেই পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছিল সরকারকে। আদিবাসী মেয়ে মাথুরাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করা হয় মহারাষ্ট্রের এক পুলিশ স্টেশনে। ডাক্তারি পরীক্ষায় সতীত্বের বৈতরণী পার হতে পারেনি মাথুরা, সতিচ্ছেদ আগেই খুইয়ে বসেছিল মেয়েটি। সার্টিফিকেটে লেখা হয়, হ্যাবিচুয়েটেড টু সেক্স বা যৌনসম্পর্কে অভ্যস্ত। অবিবাহিত মেয়ের যৌনসম্পর্কের ট্যাবু থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি ভারতীয় আদালত। যৌনাচারে অভ্যস্ত মাথুরা নিজেই মদ্যপ পুলিশ অফিসারদের প্রলুব্ধ করেছে বলে রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত। ফলে অভিযুক্ত পুলিশ কনস্টেবলরা খালাস পেয়ে যায়। সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের জের ধরে প্রায় ১১ বছর পর ভারতীয় সরকার ধর্ষণ আইনে পরিবর্তন আনে। আমাদের আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে সময়োপযোগী একটা পরিবর্তনের জন্য? ধর্ষণের শিকার হতে পারে শিশু, বৃদ্ধা, যৌন-অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অবিবাহিতা, বিবাহিতা, যৌনকর্মী যে কেউ। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে সবাই যেন আইনের চোখে সমান পরিলক্ষিত হয়, ন্যায়বিচার পায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাদম্বিনী মরে প্রমাণ করেছিল সে মরেনি, আমাদের তনুকে মরেই বাঁচতে হয়েছে আমাদের ধর্ষকামী সমাজের কাছ থেকে।

লেখক : আইনজীবী ও জ্যেষ্ঠ প্রভাষক      আইন বিভাগ

নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

farzana.shumona@yahoo.co.uk


মন্তব্য