kalerkantho


কিউবায় ওবামা : ডেভিডের কাছে গোলিয়াথ!

বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মাঝে মাত্র ৯০ মাইল। তাও পেরোতে সময় লাগল প্রায় ৯০ বছর।

১৯২৮ সালের জানুয়ারিতে কালভিন কোলেজের পর এই প্রথম কিউবা দ্বীপরাষ্ট্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা। সংবাদপত্র প্রেন্সা লাতিনায় বিশেষ প্রতিবেদন—ডেভিডের কাছে গোলিয়াথ!

হাভানায় ওবামার সঙ্গে সফরে ছিলেন মার্কিন কংগ্রেসের আরো ৪০ জন সদস্য, যা ইঙ্গিত করে এই সফর কূটনীতিগতভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হাভানার রেভল্যুশন স্কয়ারে কিউবার জাতীয় নায়ক হোশে মারতির মূর্তিতে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন মার্কিন প্রেসিডেন্টের। হাভানার এই স্কয়ারে রয়েছে আরো একজনের মূর্ত ভাস্কর্য, যিনি চল্লিশ বছর আগে সিআইএর হাতেই শহীদ হয়েছিলেন, শেষ শতাব্দীর সেরা বিপ্লবী চের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বের চিত্র সাংবাদিকদের ওবামা দিলেন এক মহার্ঘ ছবি, যা একদিকে বিচার করলে আমেরিকার ‘প্রায়শ্চিত্ত’।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিয়ে রাউল কাস্ত্রো এবং বারাক ওবামার ঐতিহাসিক ঘোষণা হয়েছিল। পরে ২০১৫-র এপ্রিলে পানামায় সামিট অব দি আমেরিকাস এবং সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠক। জুলাইয়ে কূটনৈতিক সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দীর্ঘ ৫৪ বছর বৈরী সম্পর্কের পর জুলাইয়ের ২০ তারিখ দুই দেশের দূতাবাস চালু; যদিও এখনো জারি রয়েছে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ।

মার্কিন মদদপুষ্ট বাতিস্তা সরকারকে উত্খাত করেই ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার নেতৃত্বে বিপ্লব হয় কিউবায়।

১৯৫৯ সালের জানুয়ারির সেই যুগান্তকারী আলোড়নের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ার নতুন সরকারকে স্বীকৃতিও দিয়েছিলেন। সে বছরের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান ফিদেল। ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে তাঁর একপ্রস্থ কথাও হয়। ফিদেল স্পষ্টই বলেন—কী তাঁরা করতে চলেছেন, কিভাবে কৃষি সংস্কার করবেন, কিভাবে সামন্তবাদ উচ্ছেদ করবেন। তখনই প্রমাদ গোনে ওয়াশিংটন। এরপর ফিদেল সরকার মার্কিন বহুজাতিকদের অন্যায়ভাবে দখল করা জমি কেড়ে নিতে থাকে, জাতীয়করণ হয় মার্কিন পুঁজি নিয়ন্ত্রিত সংস্থা। মার্কিন আঘাত শুরু হয়। ১৯৬০ সালের কিউবার বিপ্লবে অন্তর্ঘাত করার জন্য প্রতিবিপ্লবী বাহিনী পাঠায় আমেরিকা। তারা পরাস্ত হয় রক্তাক্ত সংঘর্ষে। ১৯৬১ সালে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে আমেরিকা।

সে-ই শুরু। ১৯৬১ সালে বে অব পিগসে প্রায় দেড় হাজার সিআইএ-প্রশিক্ষিত বাহিনী পাঠায় আমেরিকা। সেই সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধ করে কিউবা। ষাটের দশক থেকেই কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন, অন্তর্ঘাত, গুপ্তহত্যা ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলতে থাকে। কখনো অপারেশন মঙ্গুজ, কখনো অপারেশন নর্থউডস নামে অভিযান চালানো হয়। ব্যর্থ হয় সব কটিই। কিউবা তখনো জাতিসংঘে গিয়ে স্বাভাবিক সম্পর্ক চেয়েছে, সাম্রাজ্যবাদ যে কোনো দিনও জিতবে না সে কথা স্পষ্ট করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বলে চলেন চে গুয়েভারা। ১৯৬৪ সালেও মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন ফিদেল। উল্টো তাঁকে হত্যার প্রায় ১০০টির বেশি ষড়যন্ত্র করেছে মার্কিন প্রশাসন।

জিমি কার্টারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু হলেও তা পরিণতি পায়নি। রোনাল্ড রিগ্যান ক্ষমতায় আসার পর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা কঠোর করা হয়। মার্কিন নাগরিকরা কিউবায় যেতে পারবে না বলে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। মিয়ামিতে কিউবান দেশত্যাগীদের নিয়ে বাহিনী তৈরি করে অন্তর্ঘাতের লাগাতার চেষ্টাও চলেছে। ১৯৯২ সালে টরিসেল্লি আইনের মাধ্যমে কিউবার বিরুদ্ধে অবরোধ আরো জোরদার করা হয়। কিউবার অর্থনীতিকে ভাঙতে ১৯৯৬ সালে হয় হেমস-বার্টন আইন। অ-মার্কিন কম্পানিও কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য করলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়বে এসব আইনের মাধ্যমে। জাতিসংঘে বারবার এই অবরোধের বিরুদ্ধে প্রায় সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। ইসরায়েল ছাড়া প্রায় কেউই মার্কিনদের সমর্থন করেনি। মার্কিন সংস্থা ইউএস এইডের মাধ্যমে অন্তর্ঘাতের জন্য বহু গুপ্তচরও পাঠানো হয়। তাঁদেরই একজন ছিলেন অ্যালান গ্রস। ২০০১ সালে কিউবা তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ২০০৬ সালেও মার্কিন আইন কঠোরতর করে কিউবার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

কিউবায় অবরোধ সাম্প্রতিক সময়ে সাম্রাজ্যবাদী সুপারপাওয়ার আমেরিকাকেই একঘরে করেছে। পশ্চিম গোলার্ধে আজ এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। ইদানীং লাতিন আমেরিকায় মার্কিনদের চেয়ে বন্ধু বেশি কিউবার। নিজেদের খিড়কির উঠোনেই আমেরিকা একঘরে। সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে যুক্তরাষ্ট্রই যে বাধ্য হয়েছে, তা নিয়ে তেমন দ্বিমত নেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহলে। কেন এই পশ্চাদপসরণ? পর্যবেক্ষকদের অভিমত, লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক শক্তিবিন্যাসের পরিবর্তন অন্যতম বড় কারণ। ‘আমেরিকার উঠোন’ বলে পরিচিত এই মহাদেশে একের পর এক দেশে বামমুখী, মার্কিনবিরোধী সরকার তৈরি হয়েছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো বলেছেন, ‘এই জয় কিউবার, এই জয় ফিদেলের। ’

সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা মানে সম্পর্ক একেবারে স্বাভাবিক হয়েছে এমন নয়। অবশ্যই গত ১৫ মাসে সুনির্দিষ্ট কিছু অগ্রগতি হয়েছে। যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে দুই দেশের যৌথ সাফল্য এসেছে। এবোলা ও জিকা ভাইরাস মোকাবিলায়ও দুই দেশ যৌথভাবে সাফল্য অর্জন করেছে। তবে শেষ সাফল্য তখনই আসবে, যখন কিউবার ওপর থেকে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ রদ করা হবে। রাউল তাই যথার্থই বলেছেন, সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক হলেও যথেষ্ট নয়। আর ওবামা বলেছেন, তিনি আশাবাদী অবরোধ উঠে যাওয়ার ব্যাপারে, তবে সেটি তাঁর মেয়াদকালে হবে কি না তিনি নিশ্চিত নন। ওবামা এটাও বলেছেন, ঠাণ্ডাযুদ্ধের অবশেষকে তিনি কবর দিয়ে গেলেন। ফলে এবার থেকে তারা আর অতীত ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামাবেন না, শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যাবেন। আর রাউল বলেছেন, ‘মানবাধিকার, বিদেশনীতি, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দুই দেশের গভীর পার্থক্য রয়ে গেল। কিন্তু আমরা বরাবরই বলেছি, পার্থক্য সত্ত্বেও সভ্য পদ্ধতিতে সহাবস্থানের কায়দা রপ্ত করতেই হবে। তাই এক আউন্স নীতিও পরিত্যাগ না করেই এই সম্পর্ক স্থাপন। ’

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনীতিবিদ


মন্তব্য